বিশেষ প্রতিবেদক
অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর গ্রাফিক্স ডিজাইনার স্বর্ণময়ী বিশ্বাসের আত্মহত্যার ঘটনায় যৌন নিপীড়নের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ তার পত্রিকার ভাবমূর্তি রক্ষায় ভুক্তভোগীর পরিবারকে আপোষ করতে চাপ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, অভিযোগের মূলে বর্তমান বাংলা বিভাগের প্রধান আলতাফ শাহনেওয়াজকে রক্ষা করতে তার বন্ধুমহল, নারীবাদী এবং সহকর্মী সাংবাদিকরা একে ‘ভার্বাল হ্যারাসমেন্ট’ আখ্যায় শাহনেওয়াজের যৌন নিপীড়ন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায়কে লঘু করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্বর্ণময়ী বিশ্বাস (২৬) গত ১৮ই অক্টোবর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের একটি ফ্ল্যাটে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। এর আগে শুক্রবার তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, কর্মক্ষেত্রে চলমান যৌন নিপীড়নের চাপই এই আত্মহত্যার কারণ। স্বর্ণময়ীর বড় ভাই সৌরভ বিশ্বাস বলেন, “দুপুর থেকে সে রুমে দরজা বন্ধ করে রেখেছিল। দরজা ভেঙে দেখি, ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছে। সে আমাদের বলেছিল, অফিসে একজন সিনিয়র তাকে হেনস্তা করছেন।”
স্বর্ণময়ীসহ প্রতিষ্ঠানের ২৬ জন কর্মী গত ১৩ই জুলাই লিখিত অভিযোগ জমা দেন, যাতে আলতাফ শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, শাহনেওয়াজের কারণে প্রতিষ্ঠানে ‘বিষাক্ত সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে, যা নারী কর্মীদের মানসিক চাপ বাড়িয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের প্রধান সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ অভিযোগটিকে ‘পুরনো’ বলে উড়িয়ে দিয়ে শাহনেওয়াজকে শাস্তি না দিয়ে পুনর্বহাল করেন।
রোববার ‘ঢাকা স্ট্রিম’ এক বিবৃতিতে যৌন নিপীড়কের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছে, “অভিযোগের সঙ্গে স্বর্ণময়ীর মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক নেই। এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের ফল।”
ইফতেখার মাহমুদ স্বর্ণময়ীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে পত্রিকার ভাবমূর্তি ও সংবাদপত্রের মর্যাদা রক্ষার জন্য আপোষ করার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।
সৌরভ বিশ্বাস বলেন, “পত্রিকার কর্তারা পত্রিকার দোহাই দিয়ে আপোষ করতে চাইছেন, কিন্তু আমরা বিচার চাই। ময়নাতদন্ত হোক, তদন্ত কমিটি গঠন হোক।”
এদিকে, শাহনেওয়াজের বন্ধুমহল এবং কিছু নারীবাদী সাংবাদিকরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালিয়ে বলছেন, “এটি শুধুমাত্র ভার্বাল হ্যারাসমেন্ট, যৌন নিপীড়ন নয়। অভিযোগগুলো অতিরঞ্জিত।”
“২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানে তদন্ত কমিটি গঠন হয়নি কেন? এটি যৌন নিপীড়নের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে”, উল্লেখ করে নারী অধিকার কর্মীরা নিরপেক্ষ তদন্ত ও শাহনেওয়াজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দাবি করেন।
পাঁচ বিশিষ্ট নারী অধিকারকর্মী ইফতেখার মাহমুদকে খোলা চিঠি দিয়ে বলেছেন, “ঘটনার সুনির্দিষ্ট তদন্ত করুন এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায় নিন। স্বর্ণময়ীর মতো আরও নারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা প্রকাশ করুন।”
এ ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য সচেতন ব্যক্তি এ ঘটনার বিচারের দাবি জানাচ্ছেন।
নারী অধিকারকর্মীরা বলছেন, “কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ছাড়া নারীদের জন্য স্বপ্নের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। স্বর্ণময়ীর মৃত্যু অকারণ নয়, এটি একটি সিস্টেমের ব্যর্থতা।”
