ড. মামুনুর রশীদ
এই লেখায় আমরা দেখার চেষ্টা করবো: ১) বাংলাদেশের ৫৪ বছরের অর্থনৈতিক গতি পরিবর্তন, ২) আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক নীতি, সিদ্ধান্ত এবং বাস্তবায়নের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা, এবং, ৩) কী কারণে শেখ হাসিনার কাজগুলো মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি?
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি প্রকৃতি পরিবর্তন হয়েছে অনেক মাত্রায়। বঙ্গবন্ধুর অর্থনীতির “জাতীয়করণ” প্রক্রিয়া ভেঙ্গে যায় তাঁকে হত্যার মধ্যে দিয়ে। ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে দেশ এক ধরনের সাম্রাজ্যবাদী “এলিট গ্রুপের” আওতায় চলে যায়। এই গ্রুপের মধ্যে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অবস্থার পরিবর্তনের চেষ্টার পাশাপাশি নিজেদের গ্রুপের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জনকে কেন্দ্রীভূত করার চেষ্টা অব্যাহত ছিল ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। অর্থনীতির প্রক্রিয়াকে কলুষিত করে রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়ে দেশের অগ্রগতির পুরো পক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে বার বার।
আমরা দেখবো কেমন ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতি এবং শেখ হাসিনা গত ষোল বছরে কীভাবে ৭৫ পরবর্তী সময়ে গড়ে উঠা এলিট গ্রুপকে সরিয়ে বাংলাদেশেকে উন্নতির পথে ধরে রেখেছিলেন। শেষে আমরা ইউনূসের গত এক বছরের নীতির সাথে মিলিয়ে দেখবো। বুঝার চেষ্টা করবো কীভাবে আমাদের উন্নয়ন পক্রিয়াকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।
পর্ব এক
বাংলাদেশের চুয়ান্ন বছরের রাজনৈতিক ইতিহাসের “অর্থনৈতিক” বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ ৫৪ বছরে পা দিলো। চরম অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক বৈষম্যকে পিছনে ফেলে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর এলো কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা (কিছু বৈষম্য চিত্রায়িত হয়েছে চিত্র ১ এ)। অনেকে এটাকে রাজনৈতিক এবং ভৌগলিক স্বাধীনতা বলেন এই কারণে যে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশকে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে অনেক সময়। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন হয় এবং ১২ই জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন।
২০২৫ সালের খণ্ডকালীন সরকার নিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সর্বোচ্চ মোট ছয়বার সরকার গঠন করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনকের হত্যার মধ্য দিয়ে মুশতাক এবং পরে জিয়া বিভিন্ন প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বাংলাদেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ১৯৮১ সালে জিয়ার মৃত্যুর আগের সময় থেকে ২০০৬ সালের গণআন্দোলনে এবং পরে ২০০৮-০৯ সালের নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার আগ পর্যন্ত দ্বিতীয় বৃহত্তম দল বিএনপি তিনবার সরকার গঠন করেছিল। আর বাকি সময় বাংলাদেশে সামরিক শাসক (এরশাদ এবং জাতীয় পার্টি) এবং সাদা পোশাকে সামরিক বাহিনীর এজেন্টরা (মঈনুদ্দিন এবং ফখরুদ্দিন) ক্ষমতা চালিয়েছেন।
১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপির জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে কাগুজে গণতন্ত্র যাত্রা শুরু করে। টেবিল ১ এ অনেকগুলো অর্থনৈতিক নির্দেশক দেয়া আছে। এই অর্থনৈতিক নির্দেশকগুলোর ভিত্তিতে বাংলাদেশের ৫৪ বছরের অস্তিত্বকে দুইভাগে ভাগ করা যায় – ১৯৯০ এর আগে এবং ১৯৯০ এর পরে। ১৯৯০ এর পূর্ববর্তী সময়ে বাংলাদেশ বিভিন্ন রকমের অনিশ্চয়তার মধ্যে পার করেছে। বাংলাদেশ তার আজকের খ্যাতি এবং সক্ষমতার পরিচয় দিতে শুরু করে ১৯৯০ এর পর।
কিন্তু আজকের এই জগৎজোড়া সুনাম এবং সক্ষমতার পিছনে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব কেমন পার্থক্য তৈরি করেছিল? কীভাবে গত পাঁচ যুগে বৈশ্বিক প্রয়োজনীয়তার সাথে পরিবর্তন হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি? ভৌগোলিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার কতটুকু অর্জিত হয়েছে? কোথায় আরও উন্নতি করার সুযোগ আছে? আসুন কিছু তথ্য দিয়ে বুঝার চেষ্টা করি।
১৯৭২ সালে শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের প্রথম নথিভুক্ত বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি ছিলো ২৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এরশাদ সরকারের পতনের পর কাগুজে গণতন্ত্রের যাত্রার বছর বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চিতি প্রথম বারের মতো এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সীমা পার করে (সূত্র – TBS News)। শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম বারের শুরুতে ১৯৯৬ সালে এই সঞ্চিতি ছিলো ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যেটা আগস্ট ২০২১ এ দেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
চিত্র ২ এ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদের (কিছু চিহ্নিত সূচকের) ২০০৬ থেকে ২০২০ সালের (ডাটা সল্পতার কারণে ২০২৪ পর্যন্ত দেয়া সম্ভব হয়নি) তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো। প্রত্যেকটি সূচকে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে। শেখ হাসিনার ২০০৯-২০২০ সময়ে মাথাপিছু স্থানীয় এবং জাতীয় সম্পদ বেড়েছে প্রায় তিন গুণ করে, মোট মানব সম্পদ বেড়েছে ৩.৩৬ গুণ, নারী মানব সম্পদ বেড়েছে প্রায় ছয় গুণ, এবং পুরুষ মানব সম্পদ প্রায় তিন গুণ।
টেবিল ১ এ ফেরত যাই। বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য ছিলো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে একত্রিত করে সমন্বিত উন্নয়নে মনোযোগী হওয়া। এই ধরনের অর্থনীতির জন্য সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ধাঁচে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা, সরকারি সেবার খরচ কমানো, এবং সবার কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়াই থাকে মূল চালিকাশক্তি। ১৯৭২ সালের নিম্নমুখী অর্থনীতিকে এক বছরের মধ্যে তিনি ঠিক করেছিলেন।
শুনে আশ্চর্য হবে যে স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রবৃদ্ধির হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি + ৯.৬% অর্জিত হয়েছে ১৯৭৪ সালে, যা ১৯৭২ সালেও ছিলো (-)১৪%। অথচ সেই ১৯৭৪ সালেই বাংলাদেশের খাদ্য আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় দুর্ভিক্ষ শুরু হয়। তার পরের বছর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার বছরে দেশের অর্থনীতি আবার নিম্নগামী হয়।
১৯৭৬ থেকে ১৯৯০ এর সময়ে দেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের “রাজনৈতিক” পুনর্বাসন শুরু হয়। তাদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্চে শ্রমিক পাঠানো, ১৯৮৩ সাল থেকে ইসলামিক ব্যাঙ্কিং এবং অন্যান্য ব্যবসায় এই দেশগুলো থেকে লগ্নি আসতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধুর অস্বীকৃতির পর জিয়াউর রহমান বিদেশীদের কাছে বন্দর বিক্রির জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। অনেকে তার মৃত্যুর পিছনে তিন বাহিনীর ১১৪৩ জন (এবং পরবর্তীতে সব মিলিয়ে ৩০০০ এর কাছাকাছি) মুক্তিযুদ্ধ ফেরত সদস্যদের হত্যাকে দায়ী করলেও আমার অর্থনৈতিক অনুমান ভিন্ন।
জিয়া স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে রাজনৈতিক পুনর্বাসন করলেও তাদেরকে বড় আকারে “অর্থনৈতিক” পুনর্বাসন দিতে রাজি ছিলেন না। জিয়া জানতেন, এই দেশবিরোধী শক্তি অর্থনৈতিক সুবিধা পেলে তাকে আগে শেষ করবে। জিয়ার মৃত্যুর পর এরশাদ ১৯৮৩ সালে ইসলামিক ব্যাঙ্কিং (এবং গ্রামীণ ব্যাংক) থেকে শুরু করে ইসলামিক দলগুলোকে সকল ধরনের অথনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে দেন। আদম ব্যবসায়, হজ্জ কাফেলা, জাকাতের টাকা তোলা, মসজিদ মাদ্রাসার নামে নির্বিচারে চাঁদাবাজি শুরু হয়।
জিয়া যেখানে কোদাল নিয়ে ছবি তুলে ক্ষান্ত দিয়েছেন, এরশাদের সময়ে দেশের অবকাঠামোর উন্নয়ন কার্যক্রমের দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়। পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটে এবং প্রবাসী আয় বাড়তে থাকে। ১৯৯০ সালে কাগুজে গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটার পর দেশের পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয়, এবং বৈদেশিক ঋণে ভালো পরিবর্তন আসে। তবে খালেদা জিয়ার প্রথম সময়ই বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বড় পরিবর্তন আসে।
শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসেন। প্রথম থেকেই অর্থমন্ত্রী কিবরিয়ার নেতৃত্বে শুরু হয় বাংলাদেশের সমন্বিত দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি। এরমধ্যে ১৯৯৮ সালে দেশে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তাঁর সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। শেখ হাসিনার প্রথম সময়েই দেশে অল্পপরিসরে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার সূচনা হয়।
২০০১ সালে নির্বাচনে জিতে খালেদা জিয়া সরকার আবার তৈরি পোশাক এবং বৈদেশিক আয়ের উপর ভিত্তি করে অর্থনীতি সাজাতে থাকেন। স্থানীয় দারিদ্র্য উন্নয়ন কর্মসূচিতে কিছুটা ভাটা পড়ে। তবে এই সময়ে দেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার উৎপাদন সীমিত থাকে। একই সময়ে দেশে গণতন্ত্র হত্যার (২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলা, সিরিজ বোমা হামলা, এম এস কিবরিয়া এবং আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা, ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর গ্রেনেড হামলা, রেকর্ড সংখ্যক পাঁচবার বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন, এবং দশ ট্রাক অস্ত্র আমদানি) মিশন শুরু হয়। একতরফা নির্বাচন এবং দেশব্যাপী জঙ্গি হামলায় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আবির্ভাব হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার রেকর্ড বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেখে যান। প্রথমবারের মতো ডিজিটাল ভোটার আইডি প্রস্তুত হয়।
২০০৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেন শেখ হাসিনা। শুরু হয় বাংলাদেশের নতুন যাত্রা। ২০২৪ এর আগস্টে দেশি বিদেশি চক্রান্তে ক্ষমতা হারানোর আগ পর্যন্ত পৃথিবীতে বাংলাদেশকে পৌঁছে দিয়েছেন এক সম্মানজনক অবস্থায়। গড়ে ৬ – ৬.৫% হারে অর্থনীতি বাড়তে থাকে, যা আজও অনুকরণীয় উদাহরণ। দেশের জিডিপি মাত্র ৭৯ বিলিয়ন থেকে চড়েছে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে। মাথাপিছু জিডিপি ৬৭৯ ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫৯৩ ডলার। চোখের সামনে রেখে গেছেন অবকাঠামো, যা গড়ে তুলেছেন খুব কম ঋণ করে (ঋণ – জিডিপির অনুপাত ছিলো খুবই কম)। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন। এলডিসি উত্তরণে সকল প্রদক্ষেপ সম্পন্ন করেছেন।
কিন্তু এই উন্নয়নই দায় হলো। ২০০০ সালে শুরু হওয়া কোভিড এবং ২০২২ সাল থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের কারণে রপ্তানি কমে যায় এবং আমদানি খরচ বাড়তে থাকে। অনেক উন্নত দেশের আগে টিকার সংস্থান করতে পারলেও, কৃত্তিম ডলার সংকট এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ আটকে দিয়ে দেশকে বিপদে ফেলে দেয় একটা দেশবিরোধী গোষ্ঠী। এর মধ্যে একেরপর এক সরকারের বিরুদ্ধে চলতে থাকে বিদেশের টাকায় জঙ্গি হামলা – আজ নিরাপদ সড়ক নিয়ে তো কাল কোটা নিয়ে।
এরপরের ইতিহাস সবার জানা। গত ১৪ মাসে ইউনূস দেশের অর্থনীতিকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছেন যা দেখলে মনে হয় এইভাবেই একটা উন্নয়নশীল দেশকে একবছরে ধ্বংস করতে হয় বুঝি।
পর্ব দুই
শেখ হাসিনা এবং অন্যদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার পার্থক্য কী?
মোটা দাগে পাঁচটা জায়গায় শেখ হাসিনার সাথে অন্যদের পার্থক্য করা যায়। চিত্র ৫ এবং ৬ এ আমি শেখ হাসিনার অর্থনৈতিক ভিশনের একটা বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছি। এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ আমার নিজস্ব বিশ্লেষণ থেকে এসেছে। প্রায় হাজারের উপর প্রচার পত্র, বাজেট বক্তিতা, পত্রিকার রিপোর্ট, এবং মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে সফটওয়ারের মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ করে এই দুইটা চিত্র পাওয়া গেছে।
১) ভিশন
একটা দেশের উন্নয়নের প্রধান সূচক হচ্ছে পরিষ্কার ভিশন এবং মিশন। শেখ হাসিনার ভিশন বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে এগিয়ে দিয়েছে। তাঁর এই ভিশনে আমি তিনটা ধাপ পেয়েছি – ক) স্থানীয় উন্নয়ন, খ) উন্নয়নের মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস, এবং গ) উন্নয়নের মাধ্যমে সুনাম অর্জন। তাঁর ভিশন আমাদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে বিশ্বব্যাংকের মুখের উপর “না” বলতে, এবং পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প নিজেদের অর্থায়নে শুরু করতে। সে আত্মবিশ্বাস পৃথিবীর কাছে এক নতুন বাংলাদেশকে সুনামের সাথে পরিচিত করিয়ে দিয়েছে।
ইউনূসের দখলদার সরকার সবাইকে সুনামের কথা দেখিয়ে ক্ষমতা দখল করেছে ঠিকই কিন্তু এখন আমরা দেখছি কীভাবে পুরো পৃথিবী আমাদের “না” বলে দিচ্ছে। আমাদের শ্রমজীবী মানুষদের ভিসা রিজেক্ট হচ্ছে, কাজের সুযোগ কমছে, এবং বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায় গুটিয়ে নিচ্ছে। তার মানে শুধু মুখের কথায় সুনাম আসে না। একটা দেশের সুনাম আর একজন ব্যক্তির সুনামের মধ্যেও রয়েছে বিস্তর ফারাক।
পার্থক্যটা গড়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনা।
২) জনগণ বনাম এলিট গ্রুপ
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাকশালের মাধ্যমে জনগণকে একসাথ করে একটি সুষম দেশ গড়তে চেয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো পাকিস্তানের রেখে যাওয়া এলিট গ্রুপের দৌরাত্ম ভেঙে সাধারণ কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়া। পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া ইসলামিক মিলিট্যান্ট গ্রুপ, পাকিস্তান ফেরত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য, এবং বেসরকারি মাফিয়া গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গড়ে উঠা এলিট গ্রুপের হাতে যেনো বাংলাদেশের ক্ষমতা না যায়, সেটাই চেষ্টা করেছেন শেখ হাসিনা। ক) নারীর স্বাধীনতা এবং অংশগ্রহণ, এবং খ) দেশের অবকাঠামো এবং উন্নয়নে নিম্ন আয়ের (শ্রেণীতে নিচের দিকের ৪০%) মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন শেখ হাসিনা।
ইউনূস ক্ষমতা নিয়ে এলিট গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন বাংলাদেশকে। মাত্র এক বছরে ৫০% এর কাছাকাছি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ দারিদ্র্যসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে। ব্যাংক এবং আর্থিক খাত তুলে দেয়া হয়েছে বিদেশীদের হাতে। তিরিশ লাখের মতো মানুষ চাকুরি হারিয়েছে, যার মধ্যে চব্বিশ লাখ নারী। অথচ এমন দুরবস্থায় একবছরে দশ হাজারের মতো মানুষ নতুন করে কোটিপতি হয়েছে।
৩) হিসেবি ঝুঁকি
কী পরিমাণ ঝুঁকি নিয়েছেন শেখ হাসিনা তা তাঁর প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত দেখলেই বুঝা যায়। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিপরীত মেরুতে থাকা দেশগুলোর সবার সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে চলেছেন। কারো সাথে “চোখে চোখ রেখে” কথা বলার প্রয়োজন পড়েনি। ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি, দেশের জ্বালানি সমস্যার সমাধানে তৈরি করেছেন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। দেশের নাম উঠিয়েছেন মহাকাশে। আর এসকল উন্নয়নের জন্য করতে হয়নি খুব বেশি ঋণ। এরপরেও দেশকে বিক্রি করেননি। মানুষের অনুমতি ছাড়া গোপনে কোনও চুক্তি করেননি।
ইউনূস কি করেছে আপনারা দেখছেন। দেশ বিক্রি করেছে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে। আর এটার জন্য দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, নারীর উন্নয়ন, মুক্তিযুদ্ধ, এমনকি দেশের স্বাধীনতা ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে।
৪) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক (এবং যোগাযোগ)
যদিও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়েছিলো যে বাংলাদেশের বন্ধু দেশ কম যাচ্ছে, আমরা দেখেছি কীভাবে তিনি বিভিন্ন দেশের নিয়মনীতি মেনে, তাদের প্রাপ্য সম্মান দিয়ে বাংলাদেশের জন্য সম্মান আদায় করেছেন। দুই পাশে দুই বড় পরাশক্তি – ভারত এবং চীন – থাকা সত্ত্বেও দেশের প্রয়োজনে পৃথিবীর শেষ সীমা পর্যন্ত গেছেন। রোহিঙ্গাদের জন্য খুলে দিয়েছেন দেশের দরজা। শ্রীলঙ্কার বিপদের সময় টাকা ধার দিয়েছেন। মানবিক সাহায্য পৌঁছে দিয়েছেন বিভিন্ন দেশে। আর বঙ্গবন্ধুর মতো, শত বাধা উপেক্ষা করে, মনে প্রাণে থেকেছেন ফিলিস্তিনের মানুষের সাথে।
ইউনূস বাংলাদেশকে একঘরে করে রেখেছে। ভারতে সেভেন সিস্টার্স অনিরাপদ করা এবং চায়নার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের শক্তি বৃদ্ধিতে অন্য সব দেশের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নষ্ট করেছে। বহু বিপদের বন্ধু জাপানের সাথে সম্প্রতি টানাপোড়ন শুরু হয়েছে মেট্রোরেলের খরচ নিয়ে। এক পাকিস্তান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়াতে আমাদের কোনও বন্ধু নেই।
৫) প্রবৃদ্ধি-ভিত্তিক উন্নয়ন
শেখ হাসিনার উন্নয়ন পরিকল্পনা ছিলো প্রবৃদ্ধি-ভিত্তিক। দুই ধরনের অবকাঠামো – সামাজিক এবং যোগাযোগ – তৈরি করা হয়েছিল দেশীয় উন্নয়নকে সামনে রেখে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিমানবন্দরের টার্মিনাল সহ অন্যান্য অবকাঠামো করার পিছনে প্রধান কারণ ছিলো উন্নয়নকে ত্বরাণ্বিত করা।
ইউনূসের পলিসি হচ্ছে ধ্বংস করা। মব দিয়ে, আগুন দিয়ে দেশের মানুষ হত্যা করছে, মানুষের সম্পদ ধ্বংস করছে।
পর্ব ৩
তাহলে কেন শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে?
ক) শেখ হাসিনা সরকারে পতনের সাথে তাঁর কাজের কোনো সম্পর্ক নাই। জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ বিরোধী শক্তি বিদেশীদের সাহায্যে ক্ষমতা দখল করেছে। তবে সম্পর্ক এই অর্থে থাকতে পারে যে, শেখ হাসিনার তৈরি করা অবকাঠামো বিনা পয়সায় দখল করার জন্য দেশ দখল করা হয়েছে।
খ) শেখ হাসিনার কাজকে মানুষের কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব যাদের কাঁধে ছিলো, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি বা করেননি। যাদের মাধ্যমে মেসেজ জেন-জির কাছে পৌঁছানোর কথা ছিলো তাদের বেশিরভাগ ছিলো “হেলমেটের নীচের” দেশবিরোধী শক্তি।
গ) তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছে যাদের মাধ্যমে শেখ হাসিনার কাজগুলো মানুষের কাছে পৌঁছানোর কথা, তারা কখনোই শেখ হাসিনার ভিশন বুঝতে পারেনি, চেষ্টা করেনি বুঝার। আগে তাদের ট্রেনিং এর প্রয়োজন, যেন ভবিষ্যতে সকল কাজের গুরুত্ব বুঝে তা টার্গেট মার্কেটের কাছে পৌঁছানো সহজ হয়।
ড. মামুনুর রশীদ
অর্থনীতিবিদ এবং বিশ্লেষক







