❐ বিশেষ প্রতিবেদক
গত বছর আওয়ামী লীগ সরকারকে হটাতে জুলাই-আগস্টে আন্দোলনের নামে যে সুসংগঠিত দাঙ্গা এবং জঙ্গি হামলা ঘটানো হয়, তারই অংশ হিসেবে দেশের সব এলাকায় পরিকল্পিতভাবে দেয়াল, স্থাপনা, ফ্লাইওভার, রাস্তা, ফুটপাত, হাট-বাজার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীরসহ সর্বত্র এঁকে দেওয়া হয় গ্রাফিতি। এসব গ্রাফিতিতে ব্যঙ্গচিত্র থেকে শুরু করে দাঙ্গাবাজদের স্লোগান এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান ব্যক্ত করে উগ্রবাদীরা।
তথাকথিত জুলাই চেতনার নাম দিয়ে এসব গ্রাফিতি আঁকা হয়। এমনকি অনেক জায়গায় মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর ছবি, ম্যূরাল বিনষ্ট করে সেখানে আঁকা হয় এসব। বাদ যায়নি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তরও।
কিন্তু জনমনে যে পরিবর্তনের উচ্চাশা তৈরির উদ্দেশ্যে এই গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল, কয়েক মাসের ব্যবধানে তা ফিকে হতে শুরু করে। তাদের রাষ্ট্র ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস, দুর্নীতি-অনিয়ম এবং রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের কারণে জনমনে দেখা দেয় বিরক্তি। জুলাই ষড়যন্ত্রের স্বরূপ উন্মোচিত হওয়ার পর গ্রাফিতিগুলোও সাধারণ মানুষের মাঝে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করে।
ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষ তাদের বাড়িঘরের দেয়াল, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সীমানা প্রাচীরসহ বিভিন্ন স্থান গ্রাফিতিগুলো মুছে বা রঙ দিয়ে ঢেকে দিতে শুরু করেন। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রচার-প্রচারণার জন্য দেয়ালে পোস্টারিং ও রঙ দিয়ে ঢেকে দিতে দেখা গেছে। গ্রাফিতির প্রতি সাধারণ মানুষের কোনো আবেগ-অনুভূতি এখন আর কাজ করছে না বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আর এই পরিস্থিতি মেনে নিতে পারছেন না তথাকথিত জুলাই চেতনার ঝাণ্ডাধারীরা। গ্রাফিতিগুলো রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পোস্টার-ব্যানারে ঢেকে যাওয়ার কারণ হিসেবে দায়ী করছেন ইউনূস সরকারের উদাসীনতাকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাফিতিগুলোর সর্বশেষ পরিস্থিতির বিভিন্ন চিত্র। গ্রাফিতির সামনে মূত্রত্যাগ, গ্রাফিতি বিকৃত করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দৃশ্য।
মৌচাক মোড়ের ফ্লাইওভারের পিলারে আঁকা গ্রাফিতি মুছে সেখানে রাজারবাগ দরবার শরীফের ৯০ দিনের মাহফিলের প্রচারণা লেখা হয়েছে। ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডের দেয়াল বা শাহবাগমুখী কাঁটাবনের পাশের দেয়ালে পুরোনো লিখন মুছে ফেলে মাহফিলের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব জায়গায় রাজারবাগ দরবার শরীফের লেখা দেখা যাচ্ছে।
মগবাজারের দিলু রোডসংলগ্ন ফ্লাইওভারে জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় সমাবেশের পোস্টার এবং মগবাজার মোড়ে জুলাইয়ের গ্রাফিতির ওপর গণসংহতি আন্দোলনের গণসমাবেশের পোস্টার সাঁটা হয়েছে। আশপাশের আরও কিছু গ্রাফিতি ঢাকা পড়েছে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনে।
ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার জানান, জুলাইয়ের গ্রাফিতি কেবল স্মৃতি নয়, চেতনাও প্রকাশ। এগুলো সংরক্ষণ জরুরি। পোস্টার লাগানোর ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার।
গণসংহতি আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিষদ সদস্য মনির উদ্দিন বলেন, অসাবধানতাবশত কিছু জায়গায় গ্রাফিতির ওপর পোস্টারিং হয়ে থাকতে পারে। তবে গ্রাফিতি এবং দেয়াল লিখন দুটোই থাকা উচিত।
সচিবালয়ের পেছনের তোপখানা রোডের দেয়ালে লেখা ‘আমলাতন্ত্র দালাল খেদাও’, ‘দিল্লি থেকে কাশিমপুর’, ‘ছাত্র খুনের বিচার কই’—এসব স্লোগান কয়েক মাস আগে মুছে ফেলা হয়েছে। নিউ ইস্কাটন রোডে বিয়াম ফাউন্ডেশনের সামনে দেয়ালে লেখা ‘খুনি হাসিনা’ ঢেকে দেওয়া হয়েছে লাল রঙে। হাতিরঝিলের টিনের দেয়ালে লেখা ‘নো মোর ডিকটেটরশিপ’ ও ‘দিনে নাটক রাতে আটক’ও আর দেখা যায় না।
কারওয়ান বাজারের সোনারগাঁও হোটেলের দেয়াল থেকে ‘ছাত্র হত্যার বিচার কোথায়’, ‘খুনি হাসিনার বিচার চাই’, ‘১ ২ ৩ ৪ শেখ হাসিনা স্বৈরাচার’। এগুলোও মুছে ফেলা হয়েছে।
দেশের ১১টি জেলা ঘুরে প্রায় ১০ হাজার গ্রাফিতি ও দেয়াল লিখনের ছবি সংগ্রহ করে ‘জুলাই মেমোরিজ’ হিসেবে সংরক্ষণ করেছে জুলাই সাংস্কৃতিক আর্কাইভ। সহপ্রতিষ্ঠাতা সিলমী সাদিয়া বলেন, সরকার কিংবা নাগরিক কেউই যথাযথ দায়িত্ব নিচ্ছে না। গ্রাফিতি রক্ষায় সচেতনতা জরুরি।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব মনে করেন, সারা দেশে আঁকা গ্রাফিতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় জাদুঘরের পক্ষ থেকে এর মানচিত্রায়ণের চেষ্টা চলছে। আলোচনায় এর সমাধান মিলবে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ জানান, জুলাই স্মৃতি মুছে দেওয়া রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো অন্যায় করছে। ইতিমধ্যেই শতাধিক স্থানে ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার সরানো হয়েছে। সামনে এজন্য জরিমানা কার্যকর করা হবে।
তবে সাধারণ মানুষের মনে এসব গ্রাফিতি নিয়ে আর কোনো আবেগ কাজ করছেনা, এমনই দেখা গেছে গ্রাফিতি আঁকা স্থানগুলোতে মূত্রত্যাগ, ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপের দৃশ্যগুলো দেখে। আশপাশে থাকা অনেকের সাথে কথা বলে এর সত্যতা মিলেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকেই জানালেন, শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের নামে প্রতারণার মাধ্যমে দেশ ধ্বংসের জন্য যে নাশকতা চালিয়েছে, সেটা তখন বুঝতে না পারলেও মানুষ এখন বুঝতে পারছেন। তাই এসব গ্রাফিতি কিংবা শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের আর মমতা বা সহমর্মিতা কাজ করছে না। দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অবক্ষয় এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি দেখে মানুষ এখন এই পরিবর্তনের জন্য হতাশ। বরং সাধারণ মানুষ অনুশোচনা করছেন বলেও জানান অনেকেই।





