জুলাই মামলার নামে রাজনৈতিক নিপীড়ন: সাড়ে ৪ বছর আগে কবরবাসী কাউন্সিলর হলেন আসামি!

জুলাই মামলার নামে রাজনৈতিক নিপীড়ন: সাড়ে ৪ বছর আগে কবরবাসী কাউন্সিলর হলেন আসামি!
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

গত বছরের জুলাই-আগস্টে সরকারবিরোধী আন্দোলনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়ের করা মামলাগুলো শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

এবার এরই প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের নিউমার্কেটে গোলাগুলির ঘটনায় হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এই মামলায় আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের চকবাজার ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টুকে, যিনি ২০২১ সালের ১৮ই মার্চ মারা যান। এই ঘটনা জুলাইয়ের মামলাগুলোর স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি করেছে।

নিউমার্কেট গোলাগুলি ও মামলার বিবরণ

গত বছরের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট এলাকায় এক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনার এক বছর পর ১লা সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু বকর সিদ্দিকের আদালতে এই ঘটনায় হত্যাচেষ্টার একটি নালিশী মামলা দায়ের করেন আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এ কে এম নুরুল্লাহ। মামলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদসহ ১৮২ জনকে আসামি করা হয়। এই তালিকায় ১৫০ নম্বরে রয়েছেন সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টু, যিনি সাড়ে ৪ বছর আগে মৃত্যুবরণ করেছেন।

মামলার বাদী নুরুল্লাহর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা চট্টগ্রামে এসে পুলিশ ও কথিত ‘ভারতীয় বাহিনীর’ সঙ্গে মিলিত হয়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।

তিনি দাবি করেন, তিনি নিজে এবং বিশ্বস্ত সূত্র থেকে আসামিদের নাম যাচাই করেছেন। তবে মৃত মিন্টুর নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এছাড়াও মামলার আবেদনকারী একেএম নুরুল্লাহ জীবিত। কাউন্সিলর মিন্টুর নামের পাশে লেখা হয়েছে, ‘নুরুল্লাহ হত্যা মামলায় সরাসরি জড়িত।’ অথচ আবেদনে ধারা উল্লেখ করা হয়েছে হত্যাচেষ্টা মামলা ৩০৭সহ আরো কয়েকটি ধারা যুক্ত করা হয়।

বাদী পক্ষের আইনজীবী তাসনিম আক্তার নিশাতের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সিনিয়র আইনজীবী আবু বক্করের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

আইনজীবী আবু বক্কর বলেন, ‘মামলার ভিত্তি থাকায় আমি মামলা করে দিয়েছি। আসামিদের বিষয়ে তথ্য নিয়েছেন বাদী নিজেই। তার সঙ্গে কথা বললে বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারবেন।’

জুলাই মামলায় অযৌক্তিক আসামি তালিকা

জুলাই সংঘাতে দায়েরকৃত মামলাগুলোতে শুধু মৃত ব্যক্তিই নয়, শিশু, বৃদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক, শিক্ষক এমনকি আন্দোলনে সম্পৃক্ততা নেই—এমন ব্যক্তিদের নামও আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মাত্র ৩৪টি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৩টি হত্যা মামলা এবং ২১টি অন্যান্য ধারায়। সারাদেশে মোট মামলার সংখ্যা ২ হাজারের বেশি হলেও এখন অব্দি চার্জশিটভুক্ত আসামির সংখ্যা ১ হাজার ৮৩৫ জন এবং অজ্ঞাত আসামীর সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি। মামলা বাণিজ্যের শিকার নিরপরাধের সংখ্যা অসংখ্য। শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত অনেকের নাম নাম অযৌক্তিকভাবে যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এসব মামলায় শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারি আমলাসহ গ্রেপ্তার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সংখ্যা ৫,০৭৯ জন। এর বাইরে সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মী সন্দেহে গ্রেপ্তার আছেন ৩০ হাজারের বেশি। যদিও প্রকৃত সংখ্যা এর কয়েকগুণ বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র।

এই মামলায় এজাহারে আরো যারা

মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান জাবেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান, আইসিটি মন্ত্রী জোনায়েদ আহমেদ পলক, আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, সিএমপি কমিশনার সাইফুল ইসলাম, চসিক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন, রেজাউল করিম, শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের কর্ণধার মো. সাইফুল আলম, শেখ হাসিনার নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর (অব) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, সেনা কর্মকর্তা জেনারেল মুজিবুর রহমান, সিইসি নুরুল হুদা, কাজী হাবিবুল আউয়াল, প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, চবকের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম।

সংসদ সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, মাহবুবুর রহমান রুহেল, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, আবদুর রহমান বদি, দিদারুল আলম, আশেক উল্ল্যাহ রফিক, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সাইমুম সরওয়ার কমল, এসএম আল মামুন, এম এ লতিফ, মহিউদ্দিন বাচ্চু, আবু রেজা মো. নেজামুদ্দিন নদভী, ফজলে করিম চৌধুরী, মুজিবুর রহমান এবং মোস্তাফিজুর রহমান।

চসিকের কাউন্সিলরদের মধ্যে রয়েছেন: পুলক খাস্তগীর, হাজি নুরুল হক, মোরশেদ আলী, হাসান মুরাদ বিপ্লব, জহরলাল হাজারী, আতাউল্লাহ চৌধুরী, গোলাম মো. জোবায়ের, নজরুল বাহাদুর, নাজমুল হক ডিউক, শফিউল আজিম, নুরুল আমীন মামুন, হোসেন হিরণ, আব্দুর রহমান, আবুল হাসনাত বেলাল, এম আশরাফুল আলম, সলিমুল্লাহ বাচ্চু, শৈবাল দাশ সুমন, হাসান মাহমুদ হাসনী, নুরুল আলম, হারুনুর রশীদ, শহীদুল আলম, গিয়াস উদ্দিন ও মোরশেদ আলম।

গত বছরের ৪ঠা আগস্ট নগরের কোতোয়ালী থানায় দায়িত্বরত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পরিদর্শক (তদন্ত), সকল উপ-পরিদর্শক, সহকারী উপ-পরিদর্শককসহ ৩০ থেকে ৪০ জন অজ্ঞাত পুলিশ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গসহযোগী সংগঠনের অজ্ঞাত আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

রাজনৈতিক দমনের হাতিয়ার হিসেবে মামলা

বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইয়ের মামলাগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে এসব মামলায় অযৌক্তিকভাবে ব্যক্তিদের নাম যুক্ত করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, পল্লবীতে আন্দোলনে হামলার ঘটনায় দায়ের একটি মামলায় আওয়ামী লীগের পাঁচ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কেউ কেউ ঘটনার সময় এলাকায় ছিলেন না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্টে দেখা গেছে জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্তরাই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একজন লিখেছেন, “আন্দোলনে ছাত্ররা যারা পাশে দাঁড়িয়েছিল, তাদেরই এখন মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। এটা কি সেই বিচার, যার জন্য আন্দোলন হয়েছিল?” এই ধরনের পোস্টগুলো জনমনে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ ও আস্থার সংকটের প্রতিফলন ঘটায়।

জুলাই-আগস্টে দাঙ্গা ঘটাতে গিয়ে মৃতের সংখ্যা সরকারি হিসাবে ৮৩৪ জন, তবে জাতিসংঘ ও আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা এর দাবি, নিহতের সংখ্যা ১,৪০০-এর বেশি। এই আন্দোলনে আহত হয়েছেন ১১ হাজার ৫৫১ জন, যাদের মধ্যে ৪৯৩ জনকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই হতাহতদের ঘটনায় ন্যায় বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা রাজপথে নামেন। কিন্তু বর্তমানে মামলাগুলোর প্রকৃতি দেখে অনেকে আশঙ্কা করছেন, এই প্রক্রিয়া আন্দোলনের মূল লক্ষ্যকে ব্যাহত করছে।

মৃত ব্যক্তি, শিশু, বৃদ্ধ বা নিরপরাধীদের নাম মামলায় যুক্ত করা শুধু তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট করছে না, বরং জনমনে এই ধারণা তৈরি করছে যে, এই মামলাগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও দমনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

একজন বিশ্লেষক প্রশ্ন রাখেন, “যদি মৃত ব্যক্তিও আসামি হয়, তাহলে এই মামলাগুলোর বিচার কতটা নিরপেক্ষ হবে?”

জুলাই মামলাগুলোর মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পরিবর্তে রাজনৈতিক দমনের চেষ্টা চলছে বলে মনে হচ্ছে। মৃত কাউন্সিলর মিন্টুর নামে মামলা, শিশু-বৃদ্ধ-মুক্তিযোদ্ধাদের আসামি করা এবং অযৌক্তিক তালিকা তৈরি করে বিচার প্রক্রিয়াকে হাস্যকর ও অবিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে। যদি এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে, তবে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি অনিশ্চিত হবে যেমন, তেমনি নিরীহ মানুষের জীবনে নেমে আসবে দুর্ভোগ।

Visited 11 times, 1 visit(s) today