নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ২৩শে আগস্ট, ২০২৫, শনিবার।
গভীর শোক ও দুঃখের সঙ্গে জানানো যাচ্ছে যে, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মাহমুদ শরীফ (৮৫) ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আজ ২৩ আগস্ট, শনিবার ভোর ৩টায় লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তিনি দুই কন্যা, নাতি-নাতনি ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
১৯৪১ সালের ২৬ জানুয়ারি বরিশাল জেলার কোতোয়ালী থানার চানপুরা ইউনিয়নের সারুখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করা সুলতান মাহমুদ শরীফ ২০১১ সাল থেকে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তাঁর জানাজার নামাজ আগামীকাল ২৪ আগস্ট, রবিবার দুপুর ১:৩০টায় লন্ডনের ব্রিকলেইন জামে মসজিদে এবং সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য একই দিন দুপুর ১২টায় আলতাব আলী পার্কের শহীদ মিনারে আয়োজন করা হয়েছে।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন
সুলতান মাহমুদ শরীফ ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকবাল হল ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২-৬৩ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, হোসেন সোহরাওয়ার্দীর মুক্তি আন্দোলন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি আন্দোলন এবং শিক্ষা কমিশন বাতিলের আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৩ সালে লন্ডনে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি প্রবাসে একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাঙালিদের সংগঠিত করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেন এবং এপ্রিল ১৯৭১-এ স্বাধীনতা যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে বাংলাদেশে ফিরে যান।
১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলনের সময় তৎকালীন পাকিস্তান যুব ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি ছয় দফা সম্পর্কিত দলিল প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে কেন্দ্র করে প্রবাসী বাঙালিদের নিয়ে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৯৬৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তাঁর নেতৃত্বে ৭-৮ হাজার বাঙালি লন্ডনের হাইড পার্ক থেকে পাকিস্তান হাইকমিশনে মিছিল করে স্মারকলিপি পেশ করেন। এ সময় তিনি পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে কালো পতাকা উত্তোলন করেন, যা পরদিন লন্ডনের দি টাইমস পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়।
১৯৬৯ সালে আগরতলা মামলায় বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য তিনি ও তাঁর স্ত্রী ব্যারিস্টার নোরা শরীফ কিউসি পাঠানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের লন্ডন সফরের সময় তিনি বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেন এবং ইয়াহিয়াকে সরাসরি প্রশ্ন করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সরকার গঠনের বিষয়ে জবাবদিহি দাবি করেন। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে যুবলীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৭৩ সালে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজ করেছেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ও তাঁর স্ত্রী বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন এবং সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন ইউরোপে ছড়িয়ে দিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। যুক্তরাজ্যের বাঙালি কমিউনিটির অভিভাবক হিসেবে সুলতান মাহমুদ শরীফ সবসময় সামনের সারিতে ছিলেন। তাঁর অবদান বাংলাদেশ ও প্রবাসী বাঙালি সমাজে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
