মতামত || ১৯৯৬ ও ২০০১-এ নিজস্ব আদর্শহীনতা ও কর্তার ইচ্ছা-পরায়ণতা, এবার কোন পথে সেনাবাহিনী?

মতামত || ১৯৯৬ ও ২০০১-এ নিজস্ব আদর্শহীনতা ও কর্তার ইচ্ছা-পরায়ণতা, এবার কোন পথে সেনাবাহিনী?
শেয়ার করুন
এ,এস,এম শরিফুল হাসান
অনলাইন এক্টিভিস্ট।

ঢাকা, ২০ আগস্ট ২০২৫, বুধবারঃ

১৯৯৬ সালের একতরফা নির্বাচন এবং ২০০১ সালের নিরপেক্ষ নির্বাচন: নিজস্ব আদর্শহীনতা ও কর্তার ইচ্ছা-পরায়ণতা, এবার কোন পথে যাবে সেনাবাহিনী?

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনটি দেশের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে গণ্য হয়। এই নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশগ্রহণ বর্জন করায় ভোট গ্রহণ মাত্র ২১.৫% ছিল, এবং বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৭৮টি জয় লাভ করে। খালেদা জিয়া তখন বলেছিলেন, “কেউ আসুক আর না আসুক নির্বাচন হবেই,” এবং সেনাবাহিনী এই আদেশ অনুসরণ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কড়া ভূমিকা পালন করেছিল। তবে এর ফলে মারধর ও সংঘাতের ঘটনা বাড়ে, যা নির্বাচনকে একতরফা ও অবৈধ ঘোষণার কারণ হয়ে ওঠে। সে সংসদ টিকেছিল মাত্র ১২ দিন।

সেনাবাহিনীর এই ভূমিকা সরকারের পক্ষে পক্ষপাতমূলক ছিল, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী বলে সমালোচিত হয়। এমন একটা অগণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একচ্ছত্র সহযোগীতায়।

অপরদিকে, ২০০১ সালের নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতা ছাড়ার আগে সাংবিধানিকভাবে  সাবেক প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়ে যান। তিনি একটি সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে কাজ করেছিলেন, এবং সেনাবাহিনী এই প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষভাবে সহায়তা করেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের ভূমিকা কার্যকর হয়েছিল, যা নির্বাচনের সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়বিচারকে সমর্থন করেছিল। এই নির্বাচনে ভোট গ্রহণ ও প্রক্রিয়া সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল।

এই নির্বাচনেও একজন নিরপক্ষ বিচারপতির ইচ্ছায় সেনাবাহিনী যথাযথভাবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করার মাধ্যমে একটি সফল নির্বাচন সম্পন্ন করেছিল। কারন সেটা ছিল কর্তার ইচ্ছা।

দুটি নির্বাচনের তুলনায় সেনাবাহিনীর ভূমিকার দ্বিমুখী চরিত্র প্রকাশ পায়। ১৯৯৬-এ তারা কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা অনুসারে কাজ করতে গিয়ে সংঘাত ও মারধরে জড়িত হয়েছিল, বিভিন্ন দলকে বাধাপ্রাপ্ত করেছিল একপাক্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। অন্যদিকে, ২০০১-এ তাদের নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ পজেটিভ ভূমিকা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে উভয় ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনীর আদর্শ বা দেশাত্মবোধের পরিচয় পাওয়া যায়নি; তারা নিয়োগকর্তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করেছে, যা তাদের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার অভাব নির্দেশ করে।

বর্তমানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন মব, অরাজকতা, উশৃঙ্খলতার সরকার সেনাবাহিনীকে নির্বাচনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। ড. ইউনূসের উপর রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও প্রতিহিংসা পরায়ণতার অভিযোগ রয়েছে, যা তাকে একটি বিবাদিত নিয়োগকর্তা হিসেবে প্রকাশ করছে। তিনি জুলাই আন্দোলনের ছাত্র-ছাপড়িদের থেকে শুরু করে, তাদের নিয়ে গঠিত এনসিপি নামক দলের প্রতি অনুরক্ত। তাদের একচেটিয়া সুযোগ সুবিধা থেকে শুরু করে সামরিক প্রহরায় সারা দেশে রাজনৈতিক সমাবেশ করতে সহয়তা করেছেন। তিনি আদালত, বিচার ব্যাবস্থা, পুলিস কে আওয়ামীলীগ দমনের হাতিয়ার হিসাবে ব্যাবহার করেছেন। তিনি ক্ষমতায়িত করেছেন ধর্মভিত্তিক উগ্র মোলবাদী দলগুলোকে, বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীর দায়ে অভিযুক্ত জামাতে ইসলামকে তিনি দিয়েছেন একছত্র আধিপত্য। এমন একজন একপাক্ষিক নিয়োগকর্তার অধীনে যখন সেনাবাহিনী নির্বাচন পরিচালনা করবে, তখন এর ফলাফল কেমন হতে পারে তা উপরের দুই উদাহারন দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায়।

১৯৯৬-এর মতো সরকারের পক্ষে পক্ষপাতমূলক ভূমিকা বা ২০০১-এর মতো নিরপেক্ষতা—সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়োগকর্তার ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। ড. ইউনূসের অধীনে সেনাবাহিনী কি নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সুষ্ঠ নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে, তা ১৯৯৬-এর একতরফা অভিজ্ঞতা ও ২০০১-এর সুষ্ঠ পরিচালনার উদাহরণ থেকে সন্দেহজনক মনে হয়। কর্তার ইচ্ছা-পরায়ণতা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনের সার্বভৌমত্ব ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।

Visited 15 times, 1 visit(s) today