চট্টগ্রামে থানায় জুলাই-জঙ্গি হামলার এক বছর: পুলিশের ১৫৬ অস্ত্র এখনও অপরাধীদের হাতে

চট্টগ্রামে থানায় জুলাই-জঙ্গি হামলার এক বছর: পুলিশের ১৫৬ অস্ত্র এখনও অপরাধীদের হাতে
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত বছরের আগস্টে আন্দোলনের নামে সারাদেশে প্রায় ৫শ থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে জঙ্গি হামলা করে সরকারবিরোধীরা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় হয় অনেক থানা, নষ্ট করা হয় মামলার আলামাত ও নথিপত্র। সেইসাথে লুট করা হয় থানার অস্ত্র-গোলাবারুদ ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম। সবশেষে আগুন দিয়ে সব ভস্মীভূত করে দেওয়া হয়। অস্ত্রাগারের লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ১৫৬টির হদিস এক বছরেও মেলেনি।

মাঝে কিছু অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।

লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে চায়নিজ রাইফেল, এসএমজি, বিভিন্ন মডেলের পিস্তল, শটগান ও গ্যাসগান। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব অস্ত্র সম্পূর্ণভাবে উদ্ধার না হলে অপরাধ এবং প্রাণহানির ঘটনা কমানো সম্ভব হবে না।

তৎকালীন সংবাদসূত্র থেকে জানা যায়, ৫ই আগস্ট দুপুরের পর বিএনপি, জামায়াত-শিবির, বৈষম্যবিরোধীসহ সরকারবিরোধী সকল পক্ষ উন্মত্ত আচরণ শুরু করে। দুপুরের পর থেকেই পুলিশের ওপর চালানো হয় নৃশংস হামলা। কোতোয়ালি, ডবলমুরিং, পাহাড়তলী, পতেঙ্গা, আকবরশাহ, বায়েজিদ, সদরঘাট, ইপিজেড, বন্দর, হালিশহর, কর্ণফুলীসহ অনেক থানায় অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়। প্রথমেই ধ্বংস করা হয় সকল নথিপত্র। জিনিস লুটপাট, পুলিশের শত শত গাড়ি পোড়ানো, অস্ত্রাগার লুটের পর থানাগুলো ধ্বংসস্তুপে পরিণত করা হয়। প্রাণ বাঁচাতে পুলিশ সদস্যরা সরে পড়েন, অনেকেই নিখোঁজ আজ অব্দি।

সিএমপি সূত্র বলছে, নগরের থানাগুলো থেকে ৯৪৫টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে ৭.৬২ এমএম রাইফেল (চায়না) ১০৫টি, ৭.৬২ এমএম এসএমজি (চায়না) ৬২টি, ৭.৬২ এমএম এলএমজি একটি, ৭.৬২ এমএম পিস্তল (চায়না) ৪৫টি, ৯ এমএম পিস্তল (তরাস) ৯৫টি, ৯ এমএম পিস্তল (সি-জেড) ১৫টি, ১২ বোর শটগান ৪১৪টি, ৩৮ এমএম গ্যাসগান (সিঙ্গেল শট) ২০৩টি ও ৩৮ এমএম গ্যাসগান (৬ শট) ৫টি। অস্ত্রগুলোর মধ্যে এক বছরে উদ্ধার হয়েছে ৭৮৯টি।

গোলাবারুদ এবং পুলিশের ব্যবহৃত অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জামের সঠিক পরিসংখ্যান এখনো মেলেনি।

অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় মাত্র ৯টি থানায় মামলা করা হয়েছিল। এজাহার মোতাবেক, থানাগুলোর ২৫ কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলোর অবকাঠামোগত সংস্কার এখনো সম্পন্ন হয়নি। জনবল, অস্ত্র ও যানবাহন সংকটের বাইরে থানার আসবাবের চাহিদা পূরণ হয়নি পুরোপুরি।

লুট হওয়া অস্ত্র আন্দোলনকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে অপরাধীদের হাতে চলে গেছে। কেউ এখনো নিজের জিম্মায় রেখেছে, কেউ বিক্রি করে দিয়েছে বলে মনে করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

থানা থেকে লুটের অস্ত্র বিক্রির ঘটনায় গত ২১শে মার্চ পুলিশের এক কনস্টেবলসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে ২টি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

এর আগে, গত ৩রা মার্চ রাতে সাতকানিয়া উপজেলার এওচিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ কর্মীদের বাড়িতে হামলা চালাতে গিয়ে গণপিটুনিতে দুই জামায়াতকর্মী নিহত হয়। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল। গত ৬ই মার্চ চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম পিস্তলের সিরিয়াল নম্বর থেকে নিশ্চিত করেন, ‘উদ্ধারকৃত অস্ত্রটি সিএমপির কোতোয়ালি থানা পুলিশের।’

গত ১৮ই জুন নগরের পেশাদার ছিনতাইকারী সাইদুর রহমান মাসুম ওরফে ব্লেড মাসুমের কাছ থেকে থানার লুট হওয়া ৭.৬২ এমএম পিস্তল, ৪টি গুলিসহ ম্যাগাজিন ও একটি খালি ম্যাগাজিন উদ্ধার করে পুলিশ।

এ প্রসঙ্গে নগর পুলিশের উপকমিশনার (পশ্চিম) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া বলেন, এই অস্ত্র ও গুলি ব্যবহার করে ছিনতাই ও ডাকাতি করছিল ব্লেড মাসুম।

গত ২৬শে জুন নগরের পাহাড়তলী সিডিএ মার্কেট এলাকা থেকে এক ডজন মামলার আসামি মো. মিনহাজ উদ্দিন ওরফে নুরুন্নবী সাগরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার কাছ থেকে থানার লুট হওয়া ৬ রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশি রিভলবার উদ্ধার করা হয়।

এ অস্ত্র সম্পর্কে তৎকালীন পাহাড়তলী থানার ওসি এবং বর্তমানে ডবলমুরিং থানার ওসি বাবুল আজাদ বলেন, থানায় লুটকারীদের থেকে রিভলবারটি নুরুন্নবী সংগ্রহ করেছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানায়। অস্ত্রটি ব্যবহার করে নুরুন্নবী তার সহযোগীদের নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই করত। জিজ্ঞাসাবাদে নুরুন্নবী নিজেকে সমন্বয়ক পরিচয় দেন।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (জনসংযোগ) মাহমুদা বেগম বলেন, থানা লুটের অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।

Visited 10 times, 1 visit(s) today