নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই-আগস্টে জঙ্গি হামলার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানোর ঠিক পরদিন, অর্থাৎ গত বছরের ৬ই আগস্ট, ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজ আহমেদকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের পর ‘মৃত ভেবে’ নদীর পাড়ে ফেলে রেখে যায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। সেই দুর্বিষহ ও রোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে ফেরা ছাত্রলীগ নেতা রিয়াজ।
গতকাল বিকেলে ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে রিয়াজ গতবছরের এসময় নিজের সাথে ঘটা অমানবিক নির্যাতনের কথা স্মরণ করেন।
তিনি লিখেছেন, ৫ই আগস্ট দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে তিনি বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে বিদেশ সফরের ফ্লাইট থাকলেও তা একাধিকবার বিলম্বিত হয়। সকাল ১০টা নাগাদ ইমিগ্রেশন পেরোনোর পর তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। এরপর শুরু হয় তার জীবন থেকে এক ভয়ংকর অধ্যায়ের সূচনা।
বিমানবন্দরেই শনাক্ত, গোপনে তুলে নেওয়া
রিয়াজ জানান, ইমিগ্রেশনে এক এসবি কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, “আপনি কি ছাত্রলীগের কেউ?” এরপর তাকে একটি কক্ষে নেওয়া হয়, যেখানে তিনি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গেও ছিলেন কিছু সময়। পলককেও পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা অন্যত্র নিয়ে যায়।
কিছুক্ষণ পর রিয়াজকে জানানো হয়, তাকে যেতে হবে বাহিনীর সঙ্গে। তার সঙ্গী সৈকত ও এক মন্ত্রীর পিএসকেও একইভাবে আটক করা হয়। সৈকত রাজি হলেও রিয়াজ ও অপরজন রাজি না হওয়ায়, জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
নদীর পাড়ে রাতভর নির্যাতন, মৃত্যুর মুখোমুখি
রিয়াজের ভাষ্যমতে, “আমাকে লাইফ জ্যাকেট (বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট বোঝাতে চেয়েছেন) ও হেলমেট পরিয়ে গাড়িতে তোলা হয়। গাড়িটি ৩০০ ফিট সড়ক ধরে একটি নির্জন, অন্ধকার নদীপাড়ে গিয়ে থামে।”
তিন বলেন, আমি তাদের অনেক অনুরোধ করি আমার মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে এক মিনিট কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য। তারা ফোন থেকে নেট বন্ধ করে দেয়। আমি শেষবারের মতো একটি মেসেজ পাঠাই: ‘তোমরা সবাই ভালো থেকো, আমার জন্য দোয়া করো।’
এরপরই শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন।
রিয়াজ বলেন, “আমার শরীরে একের পর এক লাথি, ঘুষি, বুটের আঘাত—সবকিছু পড়তে থাকে। আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। পরে শুনেছি, আমাকে মৃত ভেবে নদীর ধারে ফেলে রেখে তারা চলে যায়। আমার দুটি মোবাইল ফোন ভেঙে ফেলা হয়, পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়।”
অলৌকিকভাবে উদ্ধার
রিয়াজ বলেন, কিছুক্ষণ পর স্থানীয় কয়েকজন নদীর ধারে তার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে মুখে টর্চ ফেলে চিনতে পারে। তারা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মৈনারটেকের একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়, পরে রাতেই এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
চিকিৎসকদের মতে, তার পাঁজরের ডান পাশের হাড় ভেঙে যায়, শরীরজুড়ে ক্ষতের চিহ্ন ছিল।
রিয়াজ বলেন, “জ্ঞান ফিরে আসে ৭ই আগস্ট সকালে। সেই রাতেই আমাকে জোর করে হাসপাতাল ছাড়তে হয়। তখন শুনি পাশের কেবিনে ছিলেন আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতা মতিয়া চৌধুরী ও আমির হোসেন আমু। প্রশাসনের লোকজনও ছিল।”
এরপর ১০ দিন এক বন্ধুর বাসায় থেকে তিনি চিকিৎসা নেন। পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগে প্রায় এক মাস।
রাষ্ট্র ক্ষমতায় সরকার ছিল না, তবু নির্দেশ দিল কে?
এই ঘটনার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো— এর সময়কাল। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৫ই আগস্ট থেকে ৮ই আগস্ট পর্যন্ত দেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না। রাজনৈতিক প্রশাসন অনুপস্থিত, অন্তর্বর্তী সরকার তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেয়নি। এই শূন্যতার মধ্যেই একজন ছাত্রলীগ নেতাকে তুলে নিয়ে হত্যার চেষ্টা চালানো হলো—এটা কীভাবে সম্ভব? কার নির্দেশে? বাহিনী কি স্বপ্রণোদিত হয়ে এমন অভিযানে নেমেছিল, নাকি আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতৃবৃন্দের তালিকা অনুসরণ করে?
যদি সেটাই হয়, তবে ধরে নিতে হবে, এটি পূর্ব পরিকল্পনার অংশ।
রিয়াজ আহমেদ সরাসরি কোনো বাহিনীর নাম উল্লেখ না করলেও ইঙ্গিত দেন যে, এটি ‘বিশেষ একটি বাহিনী’র কাজ। তিনি লিখেছেন, “আমাকে হত্যার জন্য যারা এসেছিল তাদের ওপর আল্লাহর রহমত নেমে এসেছিল, তাই গুলি করেনি।”
ছাত্রলীগ বলেই কি টার্গেট?
স্ট্যাটাসে রিয়াজ প্রশ্ন তোলেন, “আমি কারও ক্ষতি করিনি। আমার চরিত্রে দাগ নেই। তাহলে ছাত্রলীগ করাই কি আমার একমাত্র অপরাধ ছিল?”
