নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ২৮শে জুলাই, ২০২৫।
অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে অভিযুক্ত নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ছত্রছায়ায় দেশজুড়ে ভয়াবহ রূপে বিস্তার ঘটেছে কিশোরগ্যাং, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক দুর্নীতির। ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে এবং রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় চলছে নানা অপকর্ম। সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন” ও “জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)” নামের দুটি প্ল্যাটফর্ম।
গুলশানে চাঁদাবাজি ও বহিষ্কার
রাজধানীর গুলশান-২ নম্বরে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদা দাবি করতে গিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন নেতা পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। পরে সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তাদের বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
চারদিকে অপকর্ম
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে সাভারে আজিজ (২৭) নামে এক ব্যক্তি ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয়ে সাধারণ মানুষকে মামলা ফাঁসানোর হুমকি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার হন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে উত্তরা থেকে ছাত্র সমন্বয়ক পরিচয়ে দুই নারীসহ নয়জনকে যৌথবাহিনী আটক করে। চলতি বছরের মার্চে পিরোজপুরে নির্মাণাধীন মডেল মসজিদে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগে এনসিপির প্রতিনিধি মুসাব্বির মাহমুদ সানি ও সহযোগী মিলন শিকদারকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
আশুলিয়ায় ‘চাঁদাবাজি’ করতে গিয়ে গণপিটুনি
২০২৪ সালের মে মাসে আশুলিয়ায় একটি কারখানায় চাঁদা দাবি করতে গিয়ে বৈছার নেতারা গণপিটুনির শিকার হন। আহত হন ৮ জন, যাদের মধ্যে রিফাত আহমেদ (ইমন), তাওহিদুল ইসলাম (সানভি), হৃদয় হাসানসহ তিনজনকে ভর্তি করা হয় এনাম মেডিকেল কলেজে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে সমন্বয়করা কারখানা মালিকের কাছে বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। মালিকপক্ষ একপর্যায়ে মব সৃষ্টির অভিযোগে পাল্টা প্রতিরোধ করে।
ভিডিও ফাঁস, আরও গ্রেফতার, পদত্যাগ
মার্চে রংপুরের মুখপাত্র নাহিদ হাসান খন্দকারের চাঁদা দাবির ভিডিও ভাইরাল হয়, যেখানে তিনি ইউএনও-ডিসি সামলানোর কথা বলেন। দিনাজপুরে ট্রাক আটক করে চাঁদা দাবি করায় এনসিপির নেতা তারিকুল ইসলামকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
মে মাসে ধানমন্ডিতে এক প্রকাশকের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতে গিয়ে তিন নেতা গ্রেফতার হলেও পরে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক হান্নান মাসউদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।
একই মাসে রংপুরে বৈছার জেলা কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ ও দুর্নীতির অভিযোগে মাহমুদুর রহমান লিওন নামের এক নেতা পদত্যাগ করেন।
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও সংবাদ সম্মেলন
জুলাইয়ে বরিশাল প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে নিজ সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধেই চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলেন বৈছার নেতা মারজুক আব্দুল্লাহ। চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সদস্য সচিব নিজাম উদ্দিনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে পদ স্থগিত ও কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
জুন মাসে সাতক্ষীরার দেবহাটায় সেনাবাহিনীর হাতে তিনজন সমন্বয়ক চাঁদা নিতে গিয়ে আটক হন। একই মাসে বরিশালে তদবির ও দুর্নীতির অভিযোগে তিন নেতা পদত্যাগ করেন।
প্রশাসনিক নিয়োগ বাণিজ্য ও লুটপাট
বর্তমান ইউনূস সরকারের অধীনে এসপি বদলিতে ৫ থেকে ২০ কোটি, ডিসি নিয়োগে ১০-২০ কোটি, চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান পদ ২০০ কোটি, ঢাকা ও চট্টগ্রাম ওয়াসায় গুরুত্বপূর্ণ পদ ১০০-২০০ কোটির বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি, কাস্টমস, কারা, ডিজি-সচিব পদও কোটি কোটি টাকার দরদামে চলে গেছে। উপদেষ্টা-সহকারী উপদেষ্টা পদের পেছনেও ১০০-২০০ কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগ।
নামে-বেনামে শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন থাকায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেতা গাজী সালাউদ্দীন তানভীরের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আদেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্লক করার আদেশও দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর গুলশান এলাকায় গতকাল শনিবার রাতে আওয়ামী লীগ নেত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদাবাজি করার ঘটনায় ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব মাহিন সরকার। ওই পোস্টে মাহিন সরকার লেখেন, গ্রেপ্তার আবদুর রাজ্জাক বিন সুলাইমান পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য।
সরকারি উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠে আসছে একের পর এক। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টার দায়িত্ব পাওয়া নাহিদ ইসলাম, পরে রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করলেও, তার নিয়োগ করা ব্যক্তিগত সহকারী আতিক মুর্শেদ এখনো সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে কর্মরত।
আতিকের বিরুদ্ধে ১৫০ কোটি টাকার অর্থ বেহাতের অভিযোগ নিয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়। অভিযোগ আছে, তাঁর ঘনিষ্ঠদের ঘিরেই ‘নগদ’ প্ল্যাটফর্মে একটি দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। আতিক মুর্শেদ ‘স্বার্থের সংঘাত’ স্বীকার করলেও নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
আতিক মুর্শেদের স্ত্রী জাকিয়া সুলতানা জুঁই ২০২৫ সালের ২০ মে নগদ লিমিটেডে ‘ম্যানেজার–কমপ্লায়েন্স’ পদে নিয়োগ পান। তাঁর তিন মাসের প্রবেশনসহ মাসিক বেতন নির্ধারিত হয় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এই নিয়োগের তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়।
অপরদিকে, ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নিজের সহকারী মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচনায়। মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্যসহ শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং তাঁর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, মোয়াজ্জেম ছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক, যা গত বছরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, উপদেষ্টারা তাঁদের সহকারী বা ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে দুর্নীতি চালান—নিজেরা দায় এড়াতে। এবারও হয়তো একই কৌশল অনুসৃত হয়েছে।
র্যাডিকালাইজড ছাত্র রাজনীতি: মারধর ও চেক আদায়
মিরপুরে বৈছার অফিসে ব্যবসায়ীদের মারধর করে ব্ল্যাঙ্ক চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়া হয়। এর পেছনে থাকে এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ভাই পরিচয়দানকারী সাদমান সানজিদ ও রিফাতুল হক শাওন। শাহ আলী থানার সদস্য সচিব পারভেজও জড়িত। এলাকাবাসীরা বলছে, এই চক্র মিরপুরে ত্রাস সৃষ্টি করেছে।
সরকারিভাবে উদ্বেগজনক রিপোর্ট
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) জানায়, চলতি অর্থবছরের (জুলাই ২০২৪ – ১৫ মে ২০২৫) ১০ মাসে ২৭,১৩০টি সন্দেহজনক লেনদেন রিপোর্ট (STR) জমা পড়ে— যা আগের বছরের তুলনায় ৮০% বেশি।
ছাত্র আন্দোলন ‘স্থগিত’, আইওয়াশ দাবি
বৈষম্য বিরোধী নেতাদের চালানো তাণ্ডবের দায় স্বীকার করে কেন্দ্রীয় কমিটি ব্যতীত সারাদেশে সকল কমিটি স্থগিত ঘোষণা করে বৈছার কেন্দ্রীয় সভাপতি রিফাত রশীদ। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি শুধুই আইওয়াশ। কারণ চাঁদাবাজির টাকায়ই এনসিপির কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। একই অভিযোগ করেই পোস্ট দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমা। ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, গ্রেপ্তার নেতাদের শেকড় অনেক গভীরে। সংগঠনের ব্যানার ব্যবহৃত হচ্ছে চাঁদাবাজির টাকা সংগ্রহে, যা এনসিপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার হয়।
এনসিপির চাঁদাবাজির টাকায় রাজনৈতিক খেলা
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিয়ে সম্প্রতি চাঁদাবাজির অভিযোগ তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক মাঠে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি করছে। গণঅভ্যুত্থানের পর নৈতিকতাভিত্তিক রাজনীতির প্রতিশ্রুতি নিয়ে আত্মপ্রকাশ করা এই দলটির বিরুদ্ধে উঠেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগ, যা তাদের ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই চাঁদাবাজির টাকা কি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও ক্ষমতার খেলায় ব্যবহৃত হচ্ছে? এমন প্রশ্নে জনমনে সন্দেহ ও অস্থিরতা বাড়ছে, যা এনসিপির ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আলী হাসান বলেন, এনসিপির চাঁদাবাজির অভিযোগ তাদের নৈতিক রাজনীতির দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই ধরনের কার্যকলাপ কেবল দলের বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অবিশ্বাস আরও গভীর করছে। এটা রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ।”
সমাজকর্মী ও কলামিস্ট নুসরাত জাহান বলেন, এনসিপি যদি সত্যিই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায় করে থাকে, তবে এটি তাদের গণঅভ্যুত্থানের আদর্শের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা। এই অর্থ যদি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য একটি বড় হুমকি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক অর্থনীতিবিদ রকিবুল ইসলাম বলেন, “চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ শুধু অবৈধ নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতির উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ব্যবসায়ীরা যদি এনসিপির মতো দলের চাপে থাকেন, তবে বিনিয়োগ ও উদ্যোগের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর।”
সিনিয়র সাংবাদিক শারমিন আক্তার মনে করেন, এনসিপির এই কথিত চাঁদাবাজি তাদের দলীয় কাঠামোর মধ্যে সংগঠিত অপরাধের ছায়া ফেলছে। এটি জনমনে এই ধারণা তৈরি করছে যে, নতুন এই দলটি পুরনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই ক্ষমতার পেছনে অর্থের অপব্যবহার করছে। এটি তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করবে।
