ছাত্ররা কি তবে ‘ব্যবহৃত’? গত জুলাইয়ে ‘ইনডেমনিটি’, এই জুলাইয়ে কেন অজ্ঞতনামা মামলার আসামি?

ছাত্ররা কি তবে ‘ব্যবহৃত’? গত জুলাইয়ে ‘ইনডেমনিটি’, এই জুলাইয়ে কেন অজ্ঞতনামা মামলার আসামি?
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৫শে জুলাই, ২০২৫

বিগত এক দশকে বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতা যে শাসকের প্রতিক্রিয়ায় কতটা পরিবর্তনশীল হতে পারে, তা নতুন করে সামনে এসেছে ২০২৫ সালের জুলাইয়ের ঘটনা দিয়ে।

২০১৫ সালের নো ভ্যাট আন্দোলন হোক, ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার বা নিরাপদ সড়ক আন্দোলন— এসব প্রতিটিতেই ছাত্র সমাজ নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে, কিন্তু তৎকালীন সরকার (আওয়ামী লীগ) এসব আন্দোলন দমন করলেও ছাত্রদের নামে এমন ব্যাপক হারে মামলা করেনি। ২০২৪ এর আন্দোলন যতোক্ষন ছাত্রদের ছিল, গণমামলা আর গ্রেফতার হয়নি। জুলাইয়ের ৩য় সপ্তাহে আন্দোলন যখন বিভিন্ন পক্ষের অন্তর্ভুক্তিতে সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধ রাজনৈতিক রুপ পেয়েছে, তখন ভিন্ন পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপট এর সৃষ্টি হয়।

অথচ এবার, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ছাত্রদের একটি তুলনামূলক নরম দাবী— এইচএসসি পরীক্ষার সময় পুনর্বিন্যাস— ঘিরে সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে যে প্রতিক্রিয়া এসেছে, তা বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সরকারি হিসেবে, সেই আন্দোলনে সহিংসতা হয়েছিল— কিন্তু তার পরিণতিতে যে প্রতিক্রিয়া এসেছে তা আরও ভয়াবহ। পুলিশ বলছে, তারা অন্তত ১২০০ জন ‘অজ্ঞাত ছাত্র’কে আসামী করে মামলা করেছে।

এই সরকার— অর্থাৎ বর্তমান ‘ড. ইউনুস সরকার’— যাদের ছাত্ররাই একসময় ‘ছাত্রবান্ধব’ বলে আখ্যায়িত করেছিল, তারাই এবার যেন উল্টো ধারায় হাঁটছে। এমনকি, বিগত সরকারের বিরুদ্ধে অতীতে যারা তীব্র আন্দোলন করেছিল— তাদের অনেককেই সামগ্রিকভাবে ইনডেমনিটি (আইনি দায়মুক্তি) দিয়ে ক্ষমার আওতায় আনা হয়। বলা হয়েছিল, ‘নতুন পথচলা শুরু করতে হবে, প্রতিশোধ নয়, পুনর্মিলন’— অথচ আজ সেই সরকারের হাতেই ছাত্ররা আবার অপরাধীর তালিকায়।

একসময় এই সরকার বলেছিল, তারা রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেবে, কিন্তু সাধারণ ছাত্রদের পাশে থাকবে। সেই ঘোষণার বাস্তবতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রতীকী একটি দাবিতে রাস্তায় নামা ছাত্রদের লক্ষ্য করে একদিকে পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ অভিযান, আর অন্যদিকে তাদের নাম না জেনেও গণহারে মামলা— বিষয়গুলো কেবল মানবাধিকার নয়, নৈতিক ও রাজনৈতিক দ্বিচারিতার উদাহরণও হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, আন্দোলনের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সরকারের কোনো উপদেষ্টা বা ছাত্র বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসেননি। বরং যান্ত্রিকভাবে আন্দোলন দমন ও বিচারিক প্রতিক্রিয়ার পথেই হেঁটেছে সরকার।

এই প্রেক্ষাপটে ছাত্রদের মধ্যেই প্রশ্ন জেগেছে—

“আমরাই তো এই সরকারকে ‘ছাত্রবান্ধব’ আখ্যা দিয়েছিলাম। আজ তাহলে কী হলো? কেবল ক্ষমতায় বসার জন্যই কি আমাদের ব্যবহার করা হয়েছিল?”

“কিংস পার্টি গঠন করে যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা গেল, তখন কি ছাত্রদের আর প্রয়োজন নেই?”

বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত হয়েছে— ছাত্রদের উপেক্ষা করে কোনো শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ছাত্রসমাজ হয়তো নতুন করে ভাবছে— তারা কি কেবল পা রাখা সিঁড়ি, না কি রাষ্ট্রের প্রকৃত অংশীদার?

Visited 12 times, 1 visit(s) today