জেলা প্রতিনিধি
কুমিল্লায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রূপকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলামের স্মরণে নির্মিত ম্যুরাল ভাঙচুরের ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। রাজবাড়ি এলাকায় কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে স্থাপিত এই স্মৃতিস্তম্ভটি ভাঙচুরের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঢল নেমেছে।
তবে ঘটনাস্থলের আশপাশে রহস্যজনকভাবে নেমে এসেছে নীরবতা, কেউ মুখ খুলতে চাচ্ছেন না।
রফিকুল ইসলামের পরিবারের উদ্যোগে এবং জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ২০১৫ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন হওয়া ম্যুরালটি ছিল ভাষা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের এক চিরন্তন প্রতীক। এটি ভেঙে ফেলার ঘটনা শুধুমাত্র একটি ভাস্কর্যের ক্ষতি নয়—এটি দেশের ইতিহাস, গৌরব, ও আত্মত্যাগকে অপমান করার নামান্তর।
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছেন, এটি নিছক কোনো দস্যুতার ঘটনা নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
কুমিল্লা জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার মো. নূরে আলম ভূঁইয়া বলেন, “বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়ার পেছনে বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলামের অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তাঁর স্মরণে নির্মিত ম্যুরালটি ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে যেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই অপমান করা হলো।”
জেলা প্রশাসক মো. আমিরুল কায়ছার প্রথমে ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত নন বলে মন্তব্য করলেও পরে নিন্দা-প্রতিবাদের মুখে ম্যুরালটি পুনঃস্থাপনের আশ্বাস দেন।
তবে অনেকের প্রশ্ন—যেখানে জেলা প্রশাসনের অনুমতি ও তত্ত্বাবধানে স্থাপিত হয়েছিল এই ম্যুরাল, সেখানেই এমন অপমানজনক ঘটনা কিভাবে ঘটল, প্রশাসন কিছুই জানে না—এই ব্যাখ্যা কি বিশ্বাসযোগ্য?
এই ঘটনার গভীরে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন: বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও অর্জনকে কি কোনো পরিকল্পিত অপপ্রচারের অংশ হিসেবে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির আত্মপরিচয়ের স্মারক স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, অবমাননা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মাতৃভাষার স্বীকৃতি আদায়ের পেছনে থাকা রফিকুল ইসলামের ম্যুরাল ধ্বংস সেই ধারাবাহিকতারই একটি ভয়ংকর দৃষ্টান্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ইউনুস সরকারের সময়ে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথাকে পর্যায়ক্রমে পেছনে ঠেলে দেওয়ার এক অঘোষিত নীতি চলছে। বাঙালির গর্বিত ইতিহাস, বিজয়ের প্রতীকগুলোকে অবজ্ঞা করে যেন এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে স্বাধীনতার নায়ক নয়, সুবিধাভোগী কিছু চক্র ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা করে নিচ্ছে।
১৯৯৮ সালে জাতিসংঘে চিঠি দিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া রফিকুল ইসলাম ও তাঁর সংগঠন ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ পরবর্তীতে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি আদায়ে যে ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সাফল্য দেখিয়েছিল, তা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গৌরবের আসনে বসায়। সেই মানুষটির ম্যুরাল আজ ভাঙচুরের শিকার।
২০১৩ সালে কানাডায় প্রয়াত হন এই মহৎ মানুষটি। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁর স্মৃতিকে সম্মান দেওয়ার কথা থাকলেও আজ তাঁর পরিবারের তৈরি করা একটি ভাস্কর্যই রক্ষা করা যাচ্ছে না।
এখন প্রশ্ন— মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনের চেতনার প্রতীকদের অপমানের দায় কে নেবে? এই ঘটনায় কি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা, না কি রাজনৈতিক প্রশ্রয় জড়িত? জাতি জানতে চায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিষয়ে ইউনূস সরকারের অবস্থান কী; ‘রিসেট বাটন’ চেপে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস মুছে ফেলা প্রকল্পের বাস্তবায়নই কি ড. ইউনূসের প্রধান মিশন?
একটি ম্যুরাল ভেঙে দেওয়া মানে একটি ইতিহাসকে মুছে ফেলা নয়, বরং একটি প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—রফিকুল ইসলামের অপরাধ কী ছিল? মাতৃভাষার সম্মান আদায়, নাকি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ?
এমন ঘটনায় এখন প্রয়োজন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের শক্ত বার্তা এবং অপরাধীদের শাস্তি। অন্যথায়, এটি নিছক একটি ম্যুরাল নয়—একটি আদর্শকে ভেঙে দেওয়ার উদাহরণ হয়ে থাকবে।
