মতামত।। জামিনহীন নায়ক: ব্যারিস্টার সুমন

মতামত।। জামিনহীন নায়ক: ব্যারিস্টার সুমন
শেয়ার করুন

এস এম ফাইয়াজ হোসেন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের কোলাহলে, যেখানে সবচেয়ে জোরালো কণ্ঠস্বরগুলো প্রায়ই সবচেয়ে সৎ কণ্ঠগুলোকে ঢেকে দেয়, সেখানে ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন এক বিরল ব্যতিক্রম। আজ তিনি কারাগারে, জামিন বঞ্চিত, এমন এক হত্যা মামলায় অভিযুক্ত যা অনেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন। এক সময়ের তরুণ ও প্রান্তিক জনগণের আশার আলো, সুমন আজ সেই ব্যবস্থারই শিকার, যেটিকে তিনি সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। তার গল্প সাহস, সততা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অটল অঙ্গীকারের—একটি গল্প যা বলা এবং মনে রাখা প্রয়োজন।

জুলাইয়ের কণ্ঠস্বর

সুমনের বর্তমান অবস্থান বোঝার জন্য ২০২৪ সালের জুলাই মাসের ঘটনাগুলোতে ফিরে যেতে হবে। বাংলাদেশের রাস্তাগুলো কোটা আন্দোলনে মুখর ছিল। সেই বিশৃঙ্খলার মাঝে, সুমন যুক্তি ও আশার কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। তিনি জনতার বা ক্যামেরার সামনে আসতে দ্বিধা করেননি। বরং, তিনি তরুণদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের অভিযোগ শুনেছেন, তাদের দাবি তুলে ধরেছেন এবং শান্তিপূর্ণ, গঠনমূলক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে, যখন আন্দোলন ভিন্ন দিকে মোড় নিচ্ছিল, সুমন তখনও সহিংসতা ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী সমর্থকদের অনুপ্রবেশ নিয়ে স্পষ্টভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিরও বিরোধিতা করেন, যা তাকে সহিংস আন্দোলনকারীদের চোখে শত্রুতে পরিণত করে। কয়েক মাস পর দেখা গেল, আন্দোলনে অনুপ্রবেশ ও ষড়যন্ত্র নিয়ে সুমনের বিশ্লেষণ পুরোপুরি সত্যি হয়েছিল।
তার ভূমিকা কেবল প্রতীকী ছিল না। সুমন তার আইনজ্ঞান ব্যবহার করে আদালতে সরকারকে চ্যালেঞ্জ করেছেন, সিন্ডিকেট ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তিনি অর্থপাচার নিয়ে সরব ছিলেন এবং ক্ষমতা ও অপরাধের যোগসূত্র উন্মোচন করেছেন। তার কর্মসূচি কেবল বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ ছিল না; তা ছিল কার্যকর এবং ফলপ্রসূ।

সাহসের মূল্য—গ্রেপ্তার

কিন্তু বাংলাদেশে সাহসের মূল্য দিতে হয়। ২০২৪ সালের অক্টোবরে, সুমন জুলাই মাসের আন্দোলন-সংক্রান্ত একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, এই অভিযোগগুলো তাকে চুপ করিয়ে দেওয়ার জন্য পাতলা পর্দার আড়ালে সাজানো। তার নিখুঁত রেকর্ড এবং ব্যাপক জনসমর্থন সত্ত্বেও, আদালত তাকে জামিন দেয়নি। তার সমর্থকদের কাছে, এটি শুধু সুমনের ওপর আঘাত নয়, বরং তিনি যে আদর্শ ধারণ করতেন তার ওপরও আঘাত।
এখানে তিক্ত এক বিদ্রূপ। একজন ব্যক্তি, যিনি হবিগঞ্জ-৪ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে ক্ষমতাধর আওয়ামী লীগ মন্ত্রীকে হারিয়েছিলেন, তিনি মূলধারার রাজনীতিতে হতাশাদের জন্য আশার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। অথচ, তাকে উদযাপন করার বদলে আজ তিনি কারাগারে, বিচারিক হয়রানির কারণে তার কণ্ঠরোধ করা হয়েছে।

এক ভিন্নধর্মী রাজনীতিক

সুমনকে আলাদা করেছিল তার পুরনো নিয়মে না চলার দৃঢ়তা। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগে থাকলেও, তিনি কখনো দলের চাপ বা ক্ষমতার লোভে মাথা নত করেননি। তিনি নিজের দলের দুর্নীতির বিরুদ্ধেও সরব হয়েছেন, যা তার জন্য ব্যক্তিগত ঝুঁকি ডেকে এনেছে। তিনি কেবল কথায় নয়, কাজে কাজেও প্রচলিত ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন।

নিজ নির্বাচনী এলাকায় সুমনের অবদান কিংবদন্তিতুল্য। যেখানে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে সাধারণত সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে, সেখানে সুমন নিজের টাকায় হবিগঞ্জে ১০০টিরও বেশি সেতু নির্মাণ করেছেন। এগুলো ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্য, বরং বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান—দূরবর্তী গ্রামগুলোকে সংযুক্ত করা, শিশুদের স্কুলে যাওয়া সহজ করা, কৃষকদের পণ্য বাজারে পৌঁছাতে সহায়তা করা। হবিগঞ্জের অনেকের কাছে এসব সেতু কেবল ইস্পাত ও কংক্রিটের কাঠামো নয়, বরং আশা ও অগ্রগতির প্রতীক।

পরবর্তী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা

সুমনের প্রভাব রাজনীতির বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন, তার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মানুষকে শিক্ষিত, অনুপ্রাণিত এবং সংগঠিত করেন। তার ভিডিওগুলো, সাধারণ পরিবেশে ধারণ করা, দুর্নীতি থেকে পরিবেশ রক্ষা পর্যন্ত নানা বিষয় নিয়ে কথা বলত। তিনি মানুষের ভাষায় কথা বলতেন, জটিল আইন ও সামাজিক বিষয়গুলো সবার বোধগম্য করে তুলতেন।
তিনি স্থানীয় তরুণদের জন্য একটি ফুটবল একাডেমিও প্রতিষ্ঠা করেন, বিশ্বাস করতেন খেলাধুলা শৃঙ্খলা, দলগত কাজ এবং জীবনের উদ্দেশ্য শেখায়। অনেক তরুণের কাছে সুমন শুধু রাজনীতিবিদ ছিলেন না—তিনি ছিলেন একজন মেন্টর, আদর্শ এবং বন্ধু।

ন্যায়বিচারের মূল্য

সম্ভবত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে তার ভূমিকা তাকে টার্গেটে পরিণত করেছে। সুমন সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা লড়েছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অপরাধের বিচার চেয়েছেন। এতে তিনি শক্তিশালী শত্রু তৈরি করেছেন—যাদের ক্ষমতা ও উদ্দেশ্য আছে তার পতন ঘটানোর।
তার গ্রেপ্তার ও অব্যাহত আটকাদেশকে ব্যাপকভাবে বিচারিক হয়রানি হিসেবে দেখা হয়, যা তার মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং যারা ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে চায় তাদের জন্য বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, ন্যায়বিচারের চেতনা এত সহজে নিভে যায় না।

ভুলে যাওয়া স্মরণ

যখন বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার আরও নাজুক হয়ে পড়ছে, তখন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমনের মতোদের আত্মত্যাগ ভুলে যাওয়া চলবে না। তার গল্প মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের নেতৃত্ব ক্ষমতার দ্বারা নয়, বরং সঠিকের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসে পরিমাপ করা হয় ।

সুমনের নির্মিত সেতুগুলো আজও হবিগঞ্জে দাঁড়িয়ে আছে, তার উত্তরাধিকারীর নীরব সাক্ষী। তিনি যাদের অনুপ্রাণিত করেছেন, তারা এখনো একটি উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে। আর হয়তো কেউ কেউ তাকে ভুলে গেলেও, অনেকের কাছে ব্যারিস্টার সুমন আজও নায়ক—সততা, দৃঢ়তা ও আশার প্রতীক।

Visited 233 times, 1 visit(s) today