হাত দেওয়া যাচ্ছে না দুধে, লিটারে বাড়ল আরও ১০ টাকা!

হাত দেওয়া যাচ্ছে না দুধে, লিটারে বাড়ল আরও ১০ টাকা!
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৭শে এপ্রিল, ২০২৫

মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দুই দফা বাড়ল দুধের দাম। দাম বৃদ্ধির কারণে ইতিমধ্যে অনেক পরিবারের দৈনন্দিন বাজার তালিকা থেকে বিদায় নিয়েছে দুধ। কেউ কেউ কেনা কমিয়ে দিয়েছেন।

গত বছর নভেম্বরে ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের ‘আড়ং’ ব্র্যান্ড হঠাৎ তাদের তরল দুধের দাম বাড়ায়। তখন প্রতি লিটার দুধের দাম ১০ টাকা এবং ৫০০ গ্রামের প্যাকেটের দাম ৫ টাকা বৃদ্ধি করে। এরপর, প্রাণসহ অন্যান্য দুধ ব্র্যান্ডগুলোও একই পথে হাঁটে। এর ধারাবাহিকতায়, গত ২১শে মার্চ মিল্কভিটাও তাদের তরল দুধের দাম বাড়ায়।

বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, আড়ংয়ের স্ট্যান্ডার্ডাইজড দুধ (যা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াজাত নয়) আধা লিটারের প্যাকেটের দাম ৫৫ টাকা এবং ১ লিটারের দাম ১০০ টাকা করা হয়েছে। পাস্তুরিত দুধের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে, আধা লিটারে ৬০ টাকা এবং ১ লিটার প্যাকেটের দাম ১০৫ টাকায়। একই ব্র্যান্ডের ২৫০ গ্রামের প্যাকেটের দাম বেড়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে উঠেছে। অন্যান্য ব্র্যান্ডের দামও প্রায় একইভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মিল্কভিটা তাদের আধা লিটার প্যাকেটের দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় এবং ১ লিটার প্যাকেটের দাম ৯০ থেকে ১০০ টাকায় নির্ধারণ করেছে।

দুধের দাম বৃদ্ধির কারণে পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য অনেক ভোক্তা খরচ কমানোর দিকে হাঁটছেন বলে জানিয়েছেন খুচরা বিক্রেতারা। তারা বললেন, সব পণ্যের দামই বেড়েছে। এর মধ্যে দাম বাড়ার কারণে দুধের দিকে হাত বাড়াচ্ছেন না ভোক্তারা।

যদিও, বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দাম সমন্বয় করা হয়েছে ‘যৌক্তিকভাবে’।

দেশে ২০১৮ সালে ১ লিটার পাস্তুরিত তরল দুধের দাম ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, ২০২১ সালেও দাম ছিল ৭০ থেকে ৭৫ টাকার মধ্যে। সর্বশেষ মূল্যবৃদ্ধির আগে প্রতি লিটারের দাম ছিল ৯০ টাকা। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে তরল দুধের দাম ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে, যা গতবারও একই হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

দুধের দাম বৃদ্ধির যুক্তি হিসেবে লোকসানের মুখে থাকা মিল্কভিটা কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দাবি করে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, “২০২২ সালে আমরা দুধ এবং দুগ্ধজাত পণ্যের দাম সমন্বয় করেছিলাম। আমরা এই পণ্যগুলো কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করি। এই দুই বছরে চার দফায় খামারিরা ১৩ টাকা দাম বাড়িয়েছেন।”

জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, “খামারিরা কত দাম পান, তা নির্ভর করে ফ্যাট পার্সেন্টেজের ওপর। উদাহরণস্বরূপ, যদি দুধের ফ্যাট ৪ শতাংশ হয়, আমরা সেই দুধের জন্য ৫৮ টাকা প্রতি লিটার দিই। এর সঙ্গে দূরবর্তী এলাকা থেকে দুধ আনার পরিবহন খরচ যুক্ত হয়, যা প্রায় ৩ টাকা। ফলে, ৪ শতাংশ ফ্যাট সম্বলিত দুধের ক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ৬১ টাকার মতো। তারপর আমাদের উৎপাদন খরচ যোগ করলে সেই মূল্য ৮২ টাকার ওপর চলে যায়। আমরা পরিবেশককে ৭৮ টাকায় দিচ্ছি।”

তিনি আরও জানান, দুধের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে প্রথমে অনুমোদন না পাওয়ায় প্রতিমাসে ২ থেকে ২.৫ কোটি টাকা লোকসান গুণতে হয়েছিল। পরে মন্ত্রণালয় রাজি হলে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

প্রাণের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামালের মতে, খামারি পর্যায়ে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণেই দুধের দাম বাড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, “খামারিরা দাবি করছিলেন, গো-খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে, ফলে তাদের লোকসান হচ্ছে। তারা দাম বাড়ানোর অনুরোধ জানায়, যার ফলে আমাদেরও বিক্রির দাম বাড়াতে হয়েছে।”

তবে ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের ঊর্ধ্বতন পরিচালক আনিসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরেও দুধের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২০ লাখ দুগ্ধ খামারি রয়েছেন। ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে দুধের উৎপাদন ছিল প্রায় ৫০ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন, যা পরবর্তী তিন বছরে বেড়ে ৭২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই পরিমাণ দাঁড়ায় ৯২ লাখ মেট্রিক টনে, এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন আরো বাড়ে, পৌঁছায় ১ কোটি ৩০ লাখ ৭৪ হাজার মেট্রিক টনে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে দুধ উৎপাদন বেড়ে ১ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০২৪ সালে তা ১ কোটি ৫২ লাখ ৫২ হাজার টনে পৌঁছেছে। বিপরীতে, দেশে তরল দুধের চাহিদা ১ কোটি ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টনের বেশি, যার অল্প কিছু অংশ আমদানিকৃত গুঁড়া দুধ দিয়ে পূর্ণ করা হয়।

বিভিন্ন কোম্পানি বছরে প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টন দুধ প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করছে, আর বাকি দুধ খামারিরা বিভিন্ন মিষ্টির দোকান এবং খোলাবাজারে বিক্রি করেন।

মহাখালীর সাততলা বাজারে দুধ বিক্রি করতে আসা বিক্রেতা আবুল হোসেন বলেন, “আফতাবনগরের এক খামারির কাছ থেকে দুধ কিনে এনে বিক্রি করি। বাজারের ওঠানামা বুঝে ৭০ থেকে ৮০ টাকা প্রতি লিটার বিক্রি করি।”

শাহজাদপুরের আতিক ডেইরি ফার্মের মালিক আল মাহমুদ জানান, “আমরা মিল্কভিটাকে দুধ সরবরাহ করি। আমাদের খামারে দৈনিক ২০০ থেকে ৩০০ লিটার দুধ পাওয়া যায়। এগুলো সাধারণত ৫৮ থেকে ৬১ টাকায় বিক্রি করি, তবে কখনো কখনো দাম কমে যায়।” তবে, বাজারে দাম কমার কারণ তিনি স্পষ্টভাবে বলতে পারেননি।

নিকেতন বাজার গেইট এলাকার ‘শাকিল স্টোর’ থেকে দুধ কিনতে আসেন শাহানারা আক্তার। তিনি মিল্কভিটার দুধ কিনতেন, তবে দুধের দাম বাড়ানোর তথ্য তার কাছে ছিল না। দোকানে এসে ১ লিটার দুধের দাম ৯০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকা হয়ে যাওয়ার পর তিনি তিন লিটার দুধের বদলে দুই লিটার দুধ কিনে ফিরে যান।

তিনি বলেন, “আমি আগে ৯০ টাকা করে ১ লিটার দুধ কিনতাম, তিন প্যাকেট। আজ দেখি দাম হয়ে গেছে ১০০ টাকা। তাই কম কিনলাম। সব কিছুরই দাম বাড়ছে।”

বিক্রেতা জানান, বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের গুঁড়ো দুধের প্রতি কেজি দাম গড়ে ৬৫০ থেকে ৮৫০ টাকা। গত বছর ডিসেম্বরে প্রায় সব কোম্পানি গুঁড়ো দুধের দাম কেজিতে ২৫ থেকে ৩০ টাকা বাড়ায়। সে থেকে দাম আর বাড়েনি, কিন্তু দাম বাড়ার পর বিক্রি আগের মতো নেই। আগে অনেক ব্র্যান্ডের দুধ রাখা হতো, এখন শুধু দুটি ব্র্যান্ড রাখা হচ্ছে।

মহাখালীর সাততলা বাজারের মুদি দোকানি বাকি বিল্লাহ জানান, এক বছরে ৪০০ গ্রাম ওজনের টিনজাত দুধের দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর সঙ্গে সাথে বেড়েছে অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যের দামও।

বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, আধা কেজি মিষ্টি দইয়ের দাম বর্তমানে গড়ে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা, যা ২০২১ সালে ছিল ৮০ টাকা। আর ২০১৮ সালে এই দাম ছিল মাত্র ৬৫ টাকা। মিষ্টি, আইসক্রিম, মাখন, লাবাং, ফ্লেভারড মিল্কসহ প্রায় সব দুগ্ধজাত পণ্যের দামই বৃদ্ধি পেয়েছে।

Visited 173 times, 1 visit(s) today