নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৭শে এপ্রিল, ২০২৫
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চলমান সহিংসতায় আরও গভীর সঙ্কটে পড়েছে। বিশ্ব ব্যাংক তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.৩ শতাংশ হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে, যা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর পূর্বাভাস থেকেও কম।
বিশ্ব ব্যাংক এর প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতা এই পতনের মূল কারণ। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে নাজুক করে তুলেছে।
সম্প্রতি, রাজনৈতিক বিরোধী দলগুলোর ওপর দমন-পীড়ন, নির্বাচনী স্বচ্ছতায় ঘাটতি এবং সহিংস আন্দোলনের কারণে দেশে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সহিংসতা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাসের মূল কারণ। দেশে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তা এড়াতে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগে অনাগ্রহ প্রকাশ করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে।
বিশ্ব ব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এই সময়ে গড়ে ১০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলবে এবং সামাজিক অস্থিরতার সৃষ্টি করতে পারে।
এ প্রতিবেদন ২১শে এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বিশ্ব ব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকের তৃতীয় দিনে প্রকাশ করা হয়। বৈঠকটি ২৬শে এপ্রিল পর্যন্ত চলমান, যেখানে বাংলাদেশের ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে অংশ নেয়।

তবে সরকারিভাবে এখনো রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবকে খাটো করে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫.২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, যা আগের ৬.৭৫ শতাংশ লক্ষ্য থেকে কম।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবতা আরও কঠিন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.২২ শতাংশ, আর চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তা আরও কমে ১.৯৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিশ্ব ব্যাংক শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি কমার পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সামাজিক সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ঘাটতি এই পতনের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশ্ব ব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইজার বলেন, “এখনই সময় নির্দিষ্ট কিছু সংস্কার উদ্যোগ নেওয়ার, যাতে অর্থনীতির সহনশীলতা বাড়ে এবং প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার করা যায়।”
তিনি বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করা, কৃষি খাতে আধুনিকায়ন এবং বাণিজ্যকে অবাধ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের অবসান না ঘটালে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন ভালো ফলাফল এনে দিতে পারবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহনশীল এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য অধরা থেকে যাবে।
