বিশেষ প্রতিবেদক | ২৪শে এপ্রিল, ২০২৫
কোটাবিরোধী আন্দোলনকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলনে রূপ দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্ররোচিত করে রাষ্ট্রক্ষমতর পট-পরিবর্তন ঘটিয়ে আন্দোলন কোটায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হন আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। এরপর থেকে ক্রমাগত তার এবং তার দপ্তরের নানা অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসতে থাকে। আসিফের হেলিকপ্টার বিলাস এবং তদ্বির বাণিজ্যেরও অনেক তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে এসেছে।
এবার তারই সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে তদ্বির বাণিজ্যের অভিযোগ মিলেছে। একই অভিযোগ স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (ছাত্র প্রতিনিধি) তুহিন ফারাবি ও ডা. মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধেও। অভিযোগ উঠেছে তারা তদ্বির বাণিজ্য ও ফ্যাসিবাদের দোসর চিকিৎসক-প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অর্থের বিনিময়ে পুনর্বাসনে সহায়তা করার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
নিরাপত্তার শঙ্কায় নাম-পরিচয় প্রকাশ না করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, অভিযুক্তরা স্থানীয় সরকার, স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, পানিসম্পদ, গণপূর্ত, সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে ঘুরে ঘুরে তদ্বির করতেন। অল্প দিনেই তদ্বির বাণিজ্যের মাধ্যমে তারা শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।
তাদের কার্যক্রম ছিল বহুস্তরবিশিষ্ট। সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, গণপূর্ত, সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগ, এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরেও প্রভাব খাটিয়ে তারা একাধিক প্রকল্প ও নিয়োগে হস্তক্ষেপ করতেন। প্রকৌশলী থেকে উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নে চাপ প্রয়োগ করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
তথ্য বলছে, মোয়াজ্জেম হোসেন নিজেও বৈছা’র নেতা ছিলেন এবং শিক্ষার্থী কোটায় উপদেষ্টার কার্যালয়ে এপিএস হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর থেকেই শুরু হয় তার উচ্চমার্গের জীবনযাপন এবং আর্থিক উত্থান। অভিযোগ রয়েছে, তিনিও উপদেষ্টা আসিফের মত প্রায়শ হেলিকপ্টারে বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেন, আর রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ঠিকাদারদের থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিতেন।
আরও ভয়াবহ অভিযোগ, স্বাস্থ্য উপদেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ছাত্র প্রতিনিধি তুহিন ফারাবি এবং চিকিৎসক পরিচয়ধারী মাহমুদুল হাসান মিলে স্বাস্থ্য ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ে স্বচ্ছতার নামে প্রকৃতপক্ষে ধান্দা চালিয়ে গেছেন। সেক্টরভিত্তিক নিয়োগ, পুরনো কর্মকর্তাদের চাকরি রক্ষা এবং নতুনদের পদায়নে দালালি করে তারা গড়েছেন কোটি টাকার কমিশন সাম্রাজ্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বশীলরা এসব জানেন, তবে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণে অপারগ বলে আক্ষেপ জানান সরকারেরই অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র। শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী কোটায় যারা এভাবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলে উপদেষ্টাদের রোষানলে পড়তে হবে বলে চুপ থাকাই শ্রেয় মনে করছেন কর্মকর্তারা, জানিয়েছে সূত্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তুমুল সমালোচনার প্রেক্ষিতে তদ্বির বাণিজ্যের হোতা মোয়াজ্জেম হোসেন ও তুহিন ফারাবিকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। গত ২১শে এপ্রিল তাদের অব্যাহতি দিয়ে সরকারি আদেশ জারি হয়। অন্যদিকে ডা. মাহমুদুল হাসান বর্তমানে রাশিয়ায় অবস্থান করছেন। তিনি সেখান থেকে আদৌ ফিরবেন কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত নন কেউই।
তথ্যসূত্র বলছে, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য এবং পূর্বে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের আওয়ামীপন্থি আখ্যা দিয়ে বরখাস্তের হুমকি দেন; চাকরি বহাল রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের কাছ থেকে শতকোটি টাকা হাতিয়েছেন তিনি। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী থেকে উপজেলা প্রকৌশলী পর্যন্ত প্রায় সব গ্রেডের কর্মকর্তার বদলি-পদায়নে তদ্বির বাণিজ্য করেছেন বলে তথ্য রয়েছে। এছাড়া, তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ঘুরে ঘুরে তদ্বির করতেন।
অভ্যন্তরীণ সূত্র জানিয়েছে, অভিযুক্ত মোয়াজ্জেম স্বরাষ্ট্র, পানিসম্পদ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগে ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার তদ্বির করতেন।
দুর্নীতির এর এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেন। নিজেরই সহযোদ্ধা ও বৈছা নেতা মোয়াজ্জেমকে দায়িত্ব দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তাকে ঘিরে গড়ে ওঠে এক সুসংগঠিত তদ্বির নেটওয়ার্ক। দিনভর চোখের আড়ালে থেকে বিকাল ৪টার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সচিবালয় ও সরকারি দপ্তরে ঢুকে তিনি চালাতেন নিজের ‘তদ্বির অফিস’। একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, এই সময়টুকু ছিল ‘মোয়াজ্জেম টাইম’, যখন তার অনুমতি ছাড়া কিছুই নড়তো না।
প্রশাসনের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, নিরাপত্তার শঙ্কায় নাম-পরিচয় প্রকাশ না করে বলেন, মোয়াজ্জেমের দখলে ছিল প্রশাসনের একাংশ। ঠিকাদার নিয়োগ, প্রকৌশলী বদলি, টেন্ডার অনুমোদন থেকে শুরু করে পুলিশ বাহিনীর অস্ত্র, গোলাবারুদ সরবরাহের বরাদ্দেও হস্তক্ষেপ করতেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ড ছিল সরাসরি আর্থিক লেনদেননির্ভর, আর বদলি বা প্রকল্প অনুমোদনের বিনিময়ে প্রতি চুক্তিতে উঠত লাখ লাখ টাকা।
গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এমনকি সিটি কর্পোরেশন—কোথাও বাদ যায়নি তার প্রভাবের ছায়া থেকে। জানা গেছে, প্রতি সন্ধ্যায় তাকে দেখা যেত গণপূর্তের সেগুনবাগিচা দপ্তরে, যেখানে তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, গাজীপুরসহ দেশের বড় বড় শহরের প্রকৌশলীদের বদলির তালিকা করতেন। দীর্ঘ সময় সেখানে থেকে আদায় করতেন টাকা; প্রতিটি বদলি বাবদ লাখ লাখ টাকা দিতে হতো তাকে।
বিশেষ সূত্র জানায়, যেসব প্রকৌশলী বা কর্মকর্তা রাজনৈতিকভাবে আওয়ামীপন্থি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাদেরকেও ভয় দেখিয়ে মোয়াজ্জেম আদায় করতেন মোটা অঙ্কের টাকা। তার দাপটে অনেক কর্মকর্তা নিজ দায়িত্ব পালনে ছিলেন অস্বস্তিতে, তবু চুপ থেকেছেন শুধু রোষানলের ভয়েই।
সাম্প্রতিক সময়ে সচিবালয়ে একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার সূত্র ধরে জনমনে প্রশ্ন উঠেছিল, এত রাতে উপদেষ্টার দপ্তরে কারা ছিল এবং কেনই বা আগুন লাগল? এখন জানা যাচ্ছে, সেই রাতের আলো-ছায়ার পেছনে লুকিয়ে ছিল এই ‘রাতের তদ্বির বাণিজ্য’।
এছাড়া, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন পৌরসভার সচিব ও প্রকৌশলী, সিটি কর্পোরেশনে বিভিন্ন গ্রেডের কর্মকর্তা নিয়োগে বদলি বাণিজ্য করতেন এমন অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তারা। শুধু তাই নয়, আওয়ামীপন্থি আখ্যা দিয়ে প্রকৌশলীদের জিম্মি করে তাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন মোয়াজ্জেম। জানান খোদ স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা।
এমন দুর্নীতির তথ্য প্রশাসনের বহু কর্মকর্তা জানলেও কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না, কারণ মোয়াজ্জেম ছিলেন ক্ষমতাধর উপদেষ্টার ছত্রছায়ায়।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দুই ঘনিষ্ঠ ছাত্র সহযোগী— তুহিন ফারাবি ও মো. মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে চিকিৎসক, নার্স, এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের বদলি ও নিয়োগের নামে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে সিনিয়র সচিব থেকে শুরু করে বিভাগীয় কর্মকর্তা, পরিচালক, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, সিভিল সার্জন— প্রায় সব স্তরেই নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এই দুই ছাত্র প্রতিনিধি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চিকিৎসক বদলিতে জনপ্রতি ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা এবং সিনিয়র স্টাফ নার্স ও মিডওয়াইফ বদলিতে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করতেন তারা। এমনকি হজ টিমে ডাক্তার-নার্স অন্তর্ভুক্তিতেও ছিল তাদের কমিশন নির্ধারিত।
একাধিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, গত ৫ই আগস্টের পর এ দুইজন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিবকে ব্যবহার করে জোরপূর্বক চিকিৎসক বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এ সময় প্রতিটি বদলিতে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। একইসঙ্গে পূর্বের নির্বাচিত ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে নতুনদের নিয়োগ দিয়ে লাভবান হয়েছেন তারা, যা স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
অন্যদিকে ৮ই আগস্টের পর সাবেক স্বাস্থ্য সচিবকে দিয়ে জোরপূর্বক বেশ কিছু চিকিৎসক বদলি করান তুহিন ফারাবি ও ডা. মাহমুদুল হাসান। প্রতিটি বদলিতে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা করে নিয়েছেন তারা।
এদের মধ্যে তুহিন ফারাবিকে ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয় থেকে অপসারণ করা হলেও ডা. মাহমুদুল হাসান এখনও দায়িত্বে বহাল রয়েছেন এবং বর্তমানে রাশিয়ায় অবস্থান করছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক গোপন সূত্র জানিয়েছে, মাহমুদ আগে থেকেই রাশিয়ায় বসবাস করতেন। গত বছর ৫ই আগস্টের পর তিনি দেশে ফেরেন। তখন ফারাবি তাকে মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ পাইয়ে দেন। তিনি রাশিয়া থেকে দেশে আর নাও ফিরতে পারেন।
দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার সাবেক এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন গণমাধ্যমে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, “আমি নিজেই পদত্যাগ করেছি—কোনো অপসারণ হয়নি। আমি পিএসসি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাইভা প্রস্তুতির জন্য পদত্যাগ করেছি।” তবে সামাজিক মাধ্যমে চারশ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি এক টাকার দুর্নীতিও করিনি, কেউ তা প্রমাণ করতে পারবে না।”
এদিকে, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের দুই ছাত্র সহকারীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, দু’জনেই দীর্ঘদিন ধরেই অফিসে অনুপস্থিত এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
এটি নিছক কোনো ব্যক্তিগত অনিয়মের গল্প নয়—এটি একটি পুরো ছাত্র রাজনীতি ভিত্তিক সিন্ডিকেটের উন্মোচন, যা আদর্শের মুখোশ পরে লুটপাটে মেতে উঠেছে। রাষ্ট্র যদি এখনই পদক্ষেপ না নেয়, তবে আগামীতে এদের বীজ থেকে অঙ্কুরিত হবে আরও বড় দুর্বৃত্তশক্তি।
