নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৭ই এপ্রিল, ২০২৫
পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) ইন্সপেক্টর মামুন ইমরান খান হত্যা মামলায় আলোচিত স্বর্ণ ব্যবসায়ী আরাভ খানসহ ৮ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
১৭ই এপ্রিল, বৃহস্পতিবার ঢাকার মহানগর দায়রা জজ জাকির হোসেন (গালিব) এই রায় ঘোষণা করেন।
মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন—আরাভ খানের স্ত্রী সুরাইয়া আক্তার কেয়া, রহমত উল্লাহ, স্বপন সরকার, মিজান শেখ, আতিক হাসান, সারোয়ার হাসান ও দিদার পাঠান।
এদের মধ্যে আরাভ খান ও তার স্ত্রী কেয়া পলাতক রয়েছেন। বাকি ছয়জনকে আগে থেকেই গ্রেপ্তার করা হয় এবং রায় ঘোষণার দিন তারা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পর আদালত তাদের সাজা পরোয়ানার ভিত্তিতে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী রুহুল আমিন সাংবাদিকদের এই রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
২০১৮ সালের ৭ই জুলাই রাজধানীর বনানীতে খুন হন পুলিশ ইন্সপেক্টর মামুন ইমরান খান। ঘটনার দুই দিন পর, ৯ই জুলাই গাজীপুরের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মামুনের ভাই জাহাঙ্গীর আলম খান ১২ই জুলাই বনানী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ৩১শে মার্চ পুলিশ রহমত উল্লাহ, রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খানসহ ৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে ২০২১ সালের ২৫শে নভেম্বর আদালত অভিযোগ গঠন করে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু করে।
মামলার সাক্ষ্যগ্রহণে আদালত মোট ৩৮ সাক্ষীর মধ্যে ২৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন এবং বিচার শেষে ৮ জনের বিরুদ্ধে দোষ প্রমাণিত হওয়ায় সবাইকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

আরাভ খানের চাঞ্চল্যকর ইতিহাস
২০২৩ সালে দেশের গণমাধ্যমে চাঞ্চল্য তৈরি হয় আরাভ খানকে নিয়ে মুখরোচক নানাবিধ খবর প্রকাশের পর। এর আগেই পুলিশ কর্মকর্তা হত্যার ঘটনায় তার নাম আসে চার্জশিটে। এরইমধ্যে দুবাইয়ে আরাভ খান ওরফে রবিউল ইসলামের স্বর্ণের দোকান উদ্বোধন হয়। তার সাথে দেখা যায় বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে।
সংবাদে প্রকাশ, ‘আরাভ জুয়েলার্স’ নামের ওই স্বর্ণের দোকানের লোগো তৈরিতেই খরচ হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। দোকানটিতে রেকর্ড পরিমাণ স্বর্ণের মজুদ করেছেন আরাভ। ঘোষণা দিয়েছেন পুরোনো সব ব্যবসায়ীর চেয়ে কম দামে স্বর্ণ বিক্রির। দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা টাওয়ারের ৬৫ তলায় কিনেছেন ফ্ল্যাট। বিলাসবহুল দুবাইয়ে আরও ৪-৫টি ফ্ল্যাট তার। বানিয়েছেন সুইমিংপুল, বাগানসহ বড় ডুপ্লেক্স বাড়ি। হয়েছেন দুবাইয়ের একটি গোল্ড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। যুক্তরাষ্ট্রে আরাভ জুয়েলার্সের আরেকটি শাখা উদ্বোধনের ঘোষণা দেন।
সবার প্রশ্ন, হঠাৎ এত অর্থবিত্তের মালিক হলেন কীভাবে আরাভ?
অথচ তথ্য বলছে, শূন্য হাতে ঢাকায় এসেছিলেন ফেরিওয়ালা বাবার সন্তান আরাভ। পুলিশ কর্মকর্তাকে খুন করে দেশত্যাগের পর বসবাস করছিলেন ভারতের একটি বস্তিতে। আর এখন হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। এই সম্পদের উৎস সম্পর্কে পরিষ্কার কোনো তথ্য নেই। সেসময় ডিবি জানিয়েছিল ইন্টারপোলের মাধ্যমে আরাভকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদিও তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট না থাকায় আর এটি সম্ভব হয়নি।
এখ খুনির স্বর্ণের দোকান উদ্বোধনে অর্থের বিনিময়ে অংশ নেওয়ায় সাকিবকে নিয়ে তখন ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন প্রধান হারুন অর রশীদ বলেন, আরাভ একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর হত্যা মামলার চাজশিটভুক্ত আসামি। আমরা সাকিবকে সবকিছু জানানোর পরেও তিনি সেখানে গেছেন। এটা খুবই দুঃখজনক। এটা তারা কেন করেছেন, আমরা জানি না।
এরইমধ্যে আরাভ ঘোষণা দেন বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় একটি করে মসজিদ নির্মাণ করবেন। এতেই দেশের ধর্মান্ধ লোকজন ধন্য ধন্য করতে থাকেন তার নামে। আরাভের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। সেখানে তিনি সোহাগ মোল্লা হিসাবে পরিচিত। দিনমজুরের ছেলে হয়েও কীভাবে এত টাকার মালিক বনে গেলেন, প্রশ্ন গ্রামবাসীর মুখে মুখে। কোটালীপাড়া থানা তখন জানায়, আরাভের বিরুদ্ধে তখন পর্যন্ত থানায় ৯টি ওয়ারেন্ট। তবে তার কোনো হদিস পায়নি পুলিশ তখন পর্যন্ত।
সোহাগ মোল্লা ওরফে আরাভ কোটালীপাড়ার আশুতিয়া গ্রামের দিনমজুর মতিয়ার রহমান মোল্লার ছেলে। মতিয়ার একসময় বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলায় ফেরি করে অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িপাতিল বিক্রি করতেন। এখানেই ১৯৮৮ সালে সোহাগের জন্ম হয়। ২০০৫ সালে চিতলমারী সদরের একটি বিদ্যালয় থেকে সোহাগ এসএসসি পাশ করেন। দারিদ্র্যের কারণে আর লেখাপড়া করেননি। চিতলমারী থেকে ২০০৮ সালে ভাগ্যান্বেষণে ঢাকা চলে যান। নাম পরিবর্তন করে হয়ে যান মোল্লা আপন। প্রবেশ করেন অপরাধজগতে।
ঢাকায় পুলিশ হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডের কারণে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় বেশ কয়েকটি মামলা হয়। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে সোহাগ মোল্লা ওরফে মোল্লা আপন, ওরফে রবিউল ইসলাম রবি, ওরফে শেখ হৃদি, ওরফে আরাভ খান ভারতের কলকাতায় পালিয়ে যান। সেখান থেকে আরাভ খান চলে যান দুবাইয়ে।
আরাভ খানের দুবাইয়ে স্বর্ণের দোকান উদ্বোধনের খবর জানাজানি হলে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। সবার মুখে মুখে একই প্রশ্ন- সোহাগ কীভাবে রাতারাতি এত টাকার মালিক বনে গেল? সোহাগের চাচাতো ভাই ফেরদৌস মোল্লাও সোহাগ ওরফে আরাভের অল্পদিনে এত টাকার মালিক হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেন। ২০২৩ সালে সোহাগ তার দুই বোন ও মা-বাবাকে দুবাই নিয়ে গেছেন বলে জানান ফেরদৌস।
হিরণ ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান মাজহারুল আলম পান্না বলেন, সোহাগ মোল্লা ওরফে আরাভ খান একই ব্যক্তি। আমার গ্রামেই তার বাড়ি। সে একটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। গত পাঁচ-সাত বছর সে এলাকায় আসে না। হঠাৎ সে কীভাবে এত টাকার মালিক হলো, এটা আমাদের বোধগম্য নয়।
হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও আরাভের ঘনিষ্ঠজনরা জানান, আরাভ যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারী, আছে কানাডিয়ান পাসপোর্টও। ২০২০ সালে রবিউল ভারতের পাসপোর্ট সংগ্রহ করেন। তার ভারতীয় পাসপোর্ট নং ইউ ৪৯৮৫৩৮৯। ওই বছরের ২৮শে জুলাই কলকাতা থেকে ইস্যুকৃত পাসপোর্টে তার নাম আরাভ খান মুদ্রিত। নিজের মত বাবা-মায়ের নামও বদলে দেন আরাভ। বাবার নাম জাকির খান এবং মা রেহানা বিবি খান উল্লেখ করা হয়। পাসপোর্টের মেয়াদ ২০৩০ সালের ২৭শে জুলাই পর্যন্ত। আরব আমিরাত সরকার ২০২১ সালের ৩১শে অক্টোবর তাকে রেসিডেন্ট পারমিট দেয়। ২০২৪ সালের ৩০শে অক্টোবর এই পারমিটের মেয়াদ শেষ হয়।
জানা যায়, ভারতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলার উদয় সংঘ ক্লাবের পাশে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন আরাভ। খুনের মামলায় আসামি হওয়ার পর পালিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ওঠেন কর্তাবাদ এলাকার নরেন্দ্রপুর বস্তিতে। পরে দুবাইয়ে তার বিলাসী জীবনযাপন শুরু। বস্তির জাকির হোসেনের বাড়িতে অবস্থান ছিল তার। জাকির ও তার স্ত্রী রেহানা বিবির সঙ্গে সখ্য গড়ে তাদের বাবা-মা বানিয়ে নিজের ও স্ত্রীর ভারতীয় পাসপোর্ট বানান আরাভ। তবে রেহানা বিবির দাবি, আধার কার্ড দিলেও পাসপোর্ট তৈরির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
ডিবি কর্মকর্তা হারুন অর রশীদ বলেন, পুলিশের একজন মেধাবী কর্মকর্তা ছিলেন ইন্সপেক্টর মামুন। তাকে শুধু হত্যাই করেনি, তার লাশ কালীগঞ্জের জঙ্গলে গুম করা হয়। হত্যা মামলার আসামি আরাভ পালিয়ে গেলেও নকল এক আসামি জেলখানায় দেয় সে। পরে ডিবির তদন্তে নকল আসামির ঘটনা সামনে আসে। এর মধ্যে মূল আসামি দুবাইয়ে স্বর্ণের দোকানের মালিক রবিউল ইসলাম ওরফে আরাভ খান ভারতে পালিয়ে যায়। সেখান থেকে ভারতীয় পাসপোর্টে দুবাই যায়। তার বিরুদ্ধে ১২টি ওয়ারেন্ট রয়েছে।
আরাভ খানের বিভিন্ন ছবি প্রকাশ হয় এবং ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান টিভি ও ফেসবুকে ওই স্বর্ণের দোকান উদ্বোধনের বিজ্ঞাপন দেন। সব মিলেই আমরা তথ্য পাই আরাভ খানই পুলিশ খুনের মামলার আসামি রবিউল ইসলাম। খুনের পর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নাম ধারণ করেন রবিউল ইসলাম।
