❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলে আবারো তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়িয়েছে সরকার।
ভোক্তাপর্যায়ে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
সোমবার সন্ধ্যায় নতুন এ দাম ঘোষণা করা হয়। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত দামেও বাজারে এলপিজি মিলছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভোক্তারা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ সংকটের সুযোগে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা। কোথাও কোথাও ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৮০০ টাকায়।
চলতি বছরের মূল্য সমন্বয়ের পরিসংখ্যান বলছে, এলপিজির দাম নিয়ে ভোক্তাদের স্বস্তি নেই। বছরের শুরুতে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ১ হাজার ৩৫৬ টাকা।
মার্চে সামান্য কমলেও এপ্রিলে এক লাফে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৭২৮ টাকা। মে মাসে আরো ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা করা হয়।
এরপর জুন ও জুলাইয়ে দুই দফায় দাম কমানো হলেও আগস্টে আবার বাড়ে। সেপ্টেম্বরে দাম কমে ১ হাজার ৫৮৫ টাকায় দাঁড়ায়। কিন্তু অক্টোবরে ২৫২ টাকা এবং নভেম্বরে আরো ২২৩ টাকা বাড়ানো হয়।
অর্থাৎ বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৭৫৪ টাকা বা প্রায় ৫৮ শতাংশ। আর গত দুই মাসেই বেড়েছে ৪৭৫ টাকা। সেপ্টেম্বরের তুলনায় বর্তমান দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।
ফলে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর মাসিক ব্যয়েও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
দাম বাড়ানোর পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে রাজধানীর ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর, বসিলা, আদাবর, শ্যামলী, মিরপুর, উত্তরা, বাড্ডা, রামপুরা ও বনশ্রী এলাকায় খোঁজ নিয়ে সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
যেসব দোকানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানেও বিক্রেতারা নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দাম চাইছেন। কোথাও ২ হাজার ৬০০ টাকা, আবার কোথাও ২ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫৪০ থেকে ৭৪০ টাকা বেশি।
বেসরকারি চাকরিজীবী স্বর্ণা আক্তার বলেন, ‘একটু আগে বাসা থেকে জানানো হলো গ্যাস শেষ হয়ে গেছে। অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে কয়েকটি দোকানে খোঁজ করেও গ্যাস পাইনি। এক দোকানদার জানালেন, দাম বাড়ানোর কারণে সরবরাহকারীরা কয়েকদিন ধরে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত যেখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও আমাদের মতো বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়েনি। অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঙ্গে রান্নার গ্যাসের খরচও বাড়ছে।’
এলপিজির দাম প্রতি মাসে সমন্বয় করে বিইআরসি। সৌদি আরামকোর প্রোপেন ও বিউটেনের কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সিপি), ডলারের বিনিময় হার, জাহাজভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এ দাম নির্ধারণ করা হয়।
আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়লে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়ে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে দেশের বাজারে সরবরাহ সংকট এবং নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগের বিষয়টি আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
গত মাসেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। অক্টোবরে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বিভিন্ন এলাকায় এর চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়।
অর্থাৎ নতুন করে দাম বাড়ানোর আগেও বাজারে নির্ধারিত মূল্য কার্যকর ছিল না। এখন আবার দাম বাড়ার পর সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এ পরিস্থিতিতে এলপিজির মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি বাজারে সেই মূল্য কার্যকর করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় সংকট তৈরি হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
অন্যথায় বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য ভোক্তাদের জন্য কার্যকর কোনো সুরক্ষা দিতে পারবে না। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির চাপের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের অনিয়মের খরচও শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে।
সাত মাসে দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশ
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় এলপিজির প্রতি কেজির দাম ছিল ১১৩ টাকা, আর ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১,৩৫৬ টাকা। সাড়ে সাত মাস পর গত ৪ঠা অক্টোবর প্রতি কেজির দাম ঠিক করা হয় ১৫৩ টাকা, ফলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম গিয়ে দাঁড়ায় ১,৮৩৭ টাকায়।
মাঝের সময়ে দুই দফা কয়েক টাকা কমলেও সার্বিকভাবে এই সরকারের সাড়ে সাত মাসে এলপিজির দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। বাড়তি দামেও ক্রেতারা এলপিজি কিনতে পারছেন না বলে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বিইআরসি ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রথমবার ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৯৭৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল। তারেক রহমানের শাসনামলে চলতি বছরের এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বাড়িয়ে দাম করা হয় ১,৯৪০ টাকা। জুনে কমানো হয় ৫৫ টাকা, জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা।
আগস্টে ফের ৭০ টাকা বাড়িয়ে দাম ঠিক করা হয় ১,৫৯৮ টাকা। সেপ্টেম্বরে আরো ১৩ টাকা কমিয়ে তা নির্ধারণ করা হয় ১,৫৮৫ টাকায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ দাম
পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এলপিজির দাম এখন সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। দেশে প্রতি কেজির দাম ১৫৩ টাকা ঠিক করা হলেও ভারতে এর ভর্তুকিমূল্য বাংলাদেশি টাকায় ৮৭, আর ভর্তুকি ছাড়া ১০৮ টাকা। পাকিস্তানে দাম ১২৪.১৬, নেপালে ১১৫.৩৫ এবং শ্রীলঙ্কায় ১১৬ টাকা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর তথ্য বলছে, ভর্তুকি বাদ দিলেও দেশটিতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম থাকে ১,৩০০ টাকার আশপাশে। শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪,৯৬৫ রুপি, অর্থাৎ ১,৪০০ টাকা।
পাকিস্তানে প্রতি কেজির দাম ২৭৯ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম সেখানে দেড় হাজার টাকার কিছু কম। পাকিস্তানে নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বেশিতে এলপি গ্যাস বিক্রির অভিযোগ থাকলেও ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে মোটামুটি সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি হয় বলে জানা গেছে।
নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ৬৮ ভাগ বাজার, গোয়েন্দা তথ্যে মিলল কারসাজির প্রমাণ
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে এলপিজি ব্যবহৃত হয় অন্তত দেড় লাখ টন। এর ৮০ শতাংশ যায় রান্নায়, ১২ শতাংশ শিল্পে, আর ৮ শতাংশ গাড়ির জ্বালানি অটোগ্যাস হিসেবে। এলপিজির ৯৮-৯৯ ভাগ বাজার বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দখলে।
আগস্টে দেশে আমদানি হয় এক লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি। সেপ্টেম্বরে এসেছে দেড় লাখ টনের বেশি। দেশে মোট ২৯টি এলপিজি কোম্পানি চালু থাকলেও সেপ্টেম্বরে আমদানি করেছে কেবল ১০টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি করেছে ইউনাইটেড আইগ্যাস।
সরকারের জ্বালানি বিভাগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট এলপিজি বাজারের ৬৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র চারটি কোম্পানি—ওমেরা, পেট্রোমেক্স, মেঘনা ও যমুনা।
এ ছাড়া বিএম এনার্জির দখলে বাজারের ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আইগ্যাসের ৭ শতাংশ, ডেল্টার ৪ শতাংশ, আর জেএমআই ও প্রিমিয়াম এলপিজির ৩ শতাংশ করে।
শ্লেষকদের ভাষ্য, পুরো বাজার হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকায় বাজারের ওপর যেকোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তার তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে।
এলপি গ্যাস নিয়ে গ্রাহকদের সীমাহীন ভোগান্তির মধ্যেই সামনে এসেছে ব্যবসায়ীদের কারসাজির বিষয়টি। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান কারসাজির সঙ্গে কিছু বড় কোম্পানি জড়িত থাকতে পারে। সরবরাহ আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে সন্দেহের তালিকায় নাম এসেছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের—আইগ্যাস, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি, ওমেরা ও যমুনা।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এলপিজির আমদানি, মজুদ ও বাজারে সরবরাহের গোটা প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
বিপিসির অদক্ষতা
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারিভাবে এলপিজি আমদানি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে চরম অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে বিপিসি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে বারবার তাগিদ আসা সত্ত্বেও গত সাড়ে সাত মাসে সংস্থাটি এক কেজি এলপিজিও আমদানি করতে পারেনি।
বিপিসি কর্মকর্তারা জানান, পাঁচ দফা দরপত্র ডাকা হলেও সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে সরবরাহকারীরা অতিরিক্ত জাহাজ ভাড়া চাওয়ায় সরবরাহকারী চূড়ান্ত করা যায়নি বলে তারা জানান।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেসরকারি আমদানিকারকরা নিজেদের জন্য প্রতি টন এলপিজি ২০০ ডলার জাহাজ ভাড়ায় আনলেও বিপিসির জন্য সরবরাহ করতে হলে ২৭০ ডলারের নিচে নামতে চায় না সরবরাহকারীরা।
অভিজ্ঞদের মতে, এর কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহের ক্ষেত্রে নানা ‘লুকায়িত ব্যয়’।
মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার পাশাপাশি দেশে এলপিজি সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ সরকারি কোম্পানির দুর্বলতা।
বাজার নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিপিসির আওতাধীন এলপিজি গ্যাস লিমিটেড নামে একটি কোম্পানিও রয়েছে। তবে দেশের মোট চাহিদার ২ শতাংশেরও কম বাজার হিস্যা এই কোম্পানির।
এর প্রধান কারণ, কোম্পানিটির মজুদ করার সক্ষমতা তেমন নেই। আশার কথা হলো, সমস্যা মেটাতে নতুন কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বাগেরহাটের মোংলায় ৬.৩৭ একর জমিতে ৮,২০০ টন এলপিজি মজুদের ট্যাংক নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। টাঙ্গাইলের কালিহাতী ও রাজাবাড়ীতে ৬.৯১ একর এলাকায় মজুদ ও বটলিং প্ল্যান্ট বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।


