বাংলাদেশের উপর ট্রাম্প প্রশাসনের ৩৭% শুল্ক প্রয়োগ: পোশাক ও ঔষধ রপ্তানিতে বিশাল ধাক্কার সম্ভাবনা

বাংলাদেশের উপর ট্রাম্প প্রশাসনের ৩৭% শুল্ক প্রয়োগ: পোশাক ও ঔষধ রপ্তানিতে বিশাল ধাক্কার সম্ভাবনা
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকা, ৩ এপ্রিল ২০২৫  – যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ট্যারিফ নীতির অধীনে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা সমস্ত পণ্যে ৩৭% ট্যারিফ আরোপ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের পোশাক ও ঔষধ রপ্তানি উদ্যোগে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এই নতুন নীতি, যা শীঘ্রই কার্যকর হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশকে হুমকির মুখে ফেলবে, যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য।

বাংলাদেশের রপ্তানি কারখানার মালিকরা ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, ৩৭% ট্যারিফের কারণে আমেরিকান বাজারে বাংলাদেশী পোশাক ও ঔষধের দাম বেশি হবে, যার ফলে এই পণ্যগুলোর প্রতিযোগিতামূলকতা হ্রাস পাবে। ২০২৪ সালে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭.৩৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে, এই নতুন ট্যারিফের কারণে আমেরিকান ব্যবসায়ীরা বিকল্প সরবরাহকারীদের দিকে মুখ ফিরাতে পারে, যার ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যাবে।

এতোদিন বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ ১৫.৬২ শতাংশ শুল্কের সম্মুখীন হতেন, যেখানে গত বছর ১১৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পোশাক আমদানি করা হয়েছিল। গত ৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক আর ঔষধ রপ্তানী দ্বিগুন বৃদ্ধি পেয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া এবং পাকিস্তান যথাক্রমে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং অষ্টম বৃহত্তম পোশাক সরবরাহকারী। প্রথম স্থানে রয়েছে চীন।

বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য যে সকল দেশের উপরে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে তার কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হল:

চীন: ৩৪ শতাংশ। ইইউ: ২০ শতাংশ। ভিয়েতনাম: ৪৬ শতাংশ। তাইওয়ান: ৩২ শতাংশ। জাপান: ২৪ শতাংশ। ভারত: ২৬ শতাংশ। পাকিস্থান ২৯ শতাংশ। মালয়শিয়া ২৪ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়া ৩২ শতাংশ। চিলি ১০ শতাংশ। ব্রাজিল ১০ শতাংশ। নিকারাগুয়া ১৮ শতাংশ। তুরষ্ক ১০ শতাংশ।

বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে জেনেরিক ঔষধ সরবরাহ করে, যা সস্তা ও গুণগতমূল্যে জনপ্রিয়। তবে, উচ্চ ট্যারিফের কারণে এই ঔষধগুলোর দাম বাড়লে, আমেরিকান ভোক্তারা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীরা বিকল্প সোর্স খুজতে পারে, যা বাংলাদেশের ঔষধ রপ্তানি উদ্যোগে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

এদিকে, কলম্বিয়া, চিলি, ব্রাজিল, তুরষ্ক, নিকারাগুয়া এই পরিস্থিতি থেকে লাভবান হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এই দেশগুলোর পোশাক রপ্তানি উদ্যোগ বাংলাদেশের তুলনায় শুল্ক কম রয়েছে। প্রথমত চীন, ভারত, চিলি ও ব্রাজিল পোশাক উৎপাদন কারখানা বিভিন্ন ধরনের পণ্য সরবরাহ করতে সক্ষম, যা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি বিভিন্নতা ও নমনীয়তা প্রদান করে। দ্বিতীয়ত ব্রাজিল, চিলি, নিকারাগুয়া, কলম্বিয়া বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কিছু বাণিজ্যিক সমঝোতার মাধ্যমে কম ট্যারিফের সুবিধা ভোগ করছে, যা তাদের পোশাক রপ্তানিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে। এই প্রতিটা ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ নতুন শুল্কনীতির কারনে রপ্তানি বাণিজ্যে অনেক বড় ধাক্কার মুখোমুখি হবে,

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন যে, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশকে তার রপ্তানি কৌশল পুনর্বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানীতে গড়ে ৭৪% শুল্ক আরোপ করে থাকে। যদি বাংলাদেশ রাজস্ব আয়ের এই খাতে অভ্যন্তরীন সুবিধাদি হ্রাস করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের শুল্ক হ্রাস করবে। এটাই ট্রাম্পের “রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ নীতি”

এই নতুন ট্যারিফ নীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে যে দেশটির জিডিপির প্রায় ৮০% পোশাক রপ্তানি উদ্যোগে নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের এই ট্যারিফ নীতি বিশ্ব বাণিজ্যে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে, এবং বাংলাদেশের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার সময়। ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া যে সুবিধা লাভ করবে, তা বাংলাদেশকে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক হতে বাধ্য করবে, তবে এটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হবে।

Visited 211 times, 1 visit(s) today