– Preset71
১৯৬১ সাল। নভেম্বরের শেষ। সন্ধ্যা। দু’জন পঞ্চাশোত্তর মানুষ অটোরিকশায় এসে নামলেন ঢাকার তেজগাঁও এলাকায়। খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক ঘুরে ছোট্ট একটি একতলা বাড়ির সামনে এসে কড়া নাড়লেন। বাড়ির মালিক নিজে দরজা খুললেন। অতিথি দু’জনের জন্য সাগ্রহে প্রতীক্ষা করছিলেন তিনি; কিছুটা উত্তেজিতও। উত্তেজনা, কেননা অতিথিরা সাধারণ কেউ নন। সরকারের গুপ্ত পুলিশ তাঁদের হন্যে হয়ে খুঁজছে। অতিথি দু’জন কমিউনিস্ট নেতা– পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মণি সিংহ ও কেন্দ্রীয় সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য খোকা রায়। দেশ ভাগ, বিশেষত ‘৫৮ সালের সামরিক আইন জারির পরে, অনেকেই তাদের চেহারা দেখেনি। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনে নাম দু’টি সুপরিচিত।
তেজগাঁওয়ের ওই বাড়িটিতে যিনি থাকতেন তার নাম আব্দুর রউফ। সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন। তবে কমিউনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ সমর্থক, বিপদের দিনের বন্ধু। সেই সন্ধ্যার এমন কিছু বিশেষত্ব ছিল না। কেউ জানত না তেজগাঁয়ের ঐ ছোট্ট তিন কামরার ভাড়াটে বাড়িতে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ঐতিহাসিক তৎপর্যবহ এক বৈঠক। এই বৈঠকেই রচিত হয়েছিল পূর্ব বাংলায় কমিউনিস্ট ও বাঙালি জাতীয়তাবাদী শক্তির সংগ্রামী ঐক্যের ভিত্তি। যার প্রত্যক্ষ ফল হচ্ছে আইয়ুবী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে ‘৬২-এর বিপ্লবী ছাত্র গণআন্দোলন। আর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল ‘৬৯-এর ছাত্রগণভ্যুত্থান ও ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ওপর যা মূলত এই শক্তি সমন্বয়ের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল।
১৯৬১ সালে একটা খবর বেশ চাউর হয়েছিল– আইয়ুব খান সংবিধান দিতে যাচ্ছেন। এ অবস্থায় একদিন “ইত্তেফাক” সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া “সংবাদ” সম্পাদক জহুর হুসেন চৌধুরী মারফত খবর পাঠান যে, তিনি মণি সিংহের সঙ্গে দেখা করতে চান। যে মানিক মিয়া তাঁর শক্তিশালী লেখনীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলন ও স্থানীয় কমিউনিস্টদের বিরোধিতা করে থাকেন, তিনি হঠাৎ কী কারণ ও উদ্দেশ্যে সাক্ষাৎ করতে চান? খটকা থাকলেও সম্পাদকমণ্ডলীতে আলোচনা করে মনি সিংহ সিদ্ধান্ত নেন, মানিক মিয়ার সাথে তিনি দেখা করবেন। স্থান ও তারিখ নির্দিষ্ট করে খবর পাঠালেন। মানিক মিয়া এক রাত্রে এলেন। বললেন- আইয়ুব খান নিশ্চিতভাবেই একটি প্রতিক্রিয়াশীল সংবিধান প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। এ অবস্থায় একযোগে আন্দোলন করতে না পারলে তার সঙ্গে পেরে উঠা যাবে না। যৌথ আন্দোলনের রূপরেখা প্রণয়নের জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করতে তিনি মনি সিংহকে অনুরোধ জানালেন।
শেখ মুজিব তখনও বঙ্গবন্ধু হননি। কিন্তু পূর্ব বাংলায় তিনিই ছিলেন আওয়ামীলীগের মুখ্য সংগঠক। শহীদ সোহরাওয়ার্দী আওয়ামীলীগের প্রধান নেতা। শেখ মুজিব তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। তবে তরুণ প্রজন্মের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ছিল লক্ষণীয়। সোহরাওয়ার্দীর কাছে তখনও অখন্ড পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই প্রধান সংগ্রাম। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান ততদিনে বুঝে নিয়েছেন– স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালির মুক্তি নেই; “স্বাধীন বাংলা”-র লক্ষ্যকে সামনে রেখেই রাজনীতির ধারা স্থির করতে হবে।
মানিক মিয়ার প্রস্তাবনা নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদকমন্ডলী আবারও সভায় বসলেন। সিদ্ধান্ত হল- দু’জন দেখা করবেন শেখ মুজিবের সাথে। সেই অনুযায়ী, আব্দুর রউফের তেজগাঁওয়ের বাসায় প্রথম বৈঠক। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে কমরেড মনি সিংহ ও খোকা রায়, আওয়ামীলীগের পক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। মোট ৪টি বৈঠক হয় দুই রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিগণের মধ্যে। এক পর্যায়ে তাঁরা সম্মত হলেন– আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন শুরু করতে হবে। আর একমাত্র ছাত্ররাই প্রকাশ্যে এই আন্দোলন করতে পারে। কিন্তু প্রধান দুটি ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের মধ্যে বিরাট আকারে দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগেই আছে। দ্বন্দ্ব-সংঘাত যদি অপসারণ করা না যায়, তাহলে আন্দোলন করা সম্ভব হবে না। মনি সিংহ মুজিবকে বললেন– আপনি নিজে এই দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনের ব্যবস্থা করুন। মুজিব বললেন– হ্যাঁ, আমাদের মধ্যে কমিউনিস্টবিরোধী আছে। ঠিক আছে, আমি ব্যাপারটা নিরসনের চেষ্টা করব।
আলাপ-আলোচনার ভেতর দিয়ে সাব্যস্ত হল, আওয়ামীলীগ ও কমিউনিস্ট পার্টি লাখ খানেক ইশতেহার বিলি করবে। ওই ইশতেহারে সামরিক শাসনের অবসান, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সকল রাজবন্দীর মুক্তি, ২১ দফা কর্মসূচি মোতাবেক পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন, ছাত্রদের শিক্ষার অধিকার, এবং শ্রমিক-কৃষক ও অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষের জরুরি দাবি-দাওয়া আদায়ের কথা থাকবে। ঐসব দাবি-দাওয়ার ভিত্তিতেই ১৯৬২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের যৌথ উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে আন্দোলন শুরু করা হবে।
এসব সিদ্ধান্তের পর হঠাৎ করেই শেখ মুজিব বলে উঠলেন– সবই ঠিক আছে, কিন্তু পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার বিষয়টিও ইশতেহারে উল্লেখ থাকতে হবে। প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ দু’জন চমকে উঠলেন। সাথে সম্পাদক মানিক মিয়াও। কমিউনিস্ট নেতা দু’জন বুঝানোর চেষ্টা করলেন– এখনই স্বাধীন পূর্ব বাংলার দাবি তোলা হবে অপরিণত এবং রাজনৈতিকভাবে ভুল পদক্ষেপ। এতে দেশবাসীর মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা সহজ হবে, লাভবান হবে শাসকগোষ্ঠী। কিন্তু অপেক্ষাকৃত তরুণ জাতীয়তাবাদী মুজিব তাঁর দাবিতে অটল থাকলেন। বিষয়টির সমাধানের জন্য তাঁরা আরেকদিন বৈঠকে বসলেন। এর মধ্যে শেখ মুজিব তাঁর “লিডার” সোহরাওয়ার্দীকে অবগত করছিলেন সবকিছু। শেষ বৈঠকে এসে তিনি বললেন– দাদা, আপনাদের জিত হল। এবারের মত আপনাদের কথা মেনে নিলাম। লিডারও আপনাদের মতে সায় দিয়েছেন। তবে আমার কথাটা থাকল। মনে রাখবেন, গরিবের কথা বাসি হলে ফলে।
আওয়ামীলীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির সমঝোতার কথা উভয় দলের ছাত্র ফ্রন্টের নেতাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরই সূত্র ধরে, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের মধ্যে গড়ে ওঠে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট গোপন সমন্বয় কমিটি। এর নেতৃত্বে ছিলেন মোহাম্মদ ফরহাদ ও শেখ মণি। আন্দোলনের প্রস্তুতি চলতে থাকে। ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়নের গোপন কমিটির প্রথম বৈঠক বসে জানুয়ারির প্রথম দিকে শেখ মণির আরামবাগের বাসায়। উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগের তরফ থেকে শেখ মণি, আনিসুর রহমান (ফরিদপুর) ও আসমত আলী শিকদার। আর ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ছিলেন মোহাম্মদ ফরহাদ ও বজলুর রহমান।
সেই বৈঠকে পরিকল্পনা হয়েছিল, ১৯৬২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র আন্দোলন শুরু হবে। কিন্তু ঢাকা থেকে করাচি ফিরে যাওয়ার পর ৩০শে জানুয়ারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হন। এর প্রতিক্রিয়ায় তীব্র গণঅসন্তোষ সৃষ্টি হলে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দ স্থির করেন আন্দোলন শুরুর এখনই প্রকৃষ্ট সুযোগ। ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় ধর্মঘট। সে আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে গোটা পূর্ব বাংলায়। ১৯৬২ সাল হয়ে উঠে পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে একের পর এক অগ্নিগর্ভ ছাত্র আন্দোলনের বছর।
তথ্যসূত্রঃ
======
১। জীবন সংগ্রাম। মনি সিংহ। জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী। ফেব্রুয়ারি ১৯৯২
২। সংগ্রামের তিন দশক। খোকা রায়। জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ। ১৯৮৬।
৩। শেখ মুজিব–মনি সিংহের ঐতিহাসিক বৈঠক। বজলুর রহমান। কমরেড মনি সিংহ স্মারক গ্রন্থ। জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী। সেপ্টেম্বর ২০০৫
