“বাকশাল যদি কার্য্যকরী না হয় তবে ইউ উইল রেক্টিফাই ইট” – বঙ্গবন্ধু

“বাকশাল যদি কার্য্যকরী না হয় তবে ইউ উইল রেক্টিফাই ইট” – বঙ্গবন্ধু
শেয়ার করুন
– রঙ রেজা

বাকশাল ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে, যদি কার্য্যকরী না হয় তবে ‘ইউ উইল রেক্টিফাই ইট’। বাকশালে ৭২’র সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তিত হয় নাই। বাকশাল করার মেনডেট (দ্বিমত থাকলে গণভোটের দাবী উঠাতে পারতো, কেউ উঠায় নি!) জাতি বঙ্গবন্ধু’কে প্রদান করেছিলেন। সুতরাং বাকশাল কোন অবৈধ ব্যবস্থা নয়।

১লা সেপ্টেম্বর বাকশাল চালু হওয়ার কথা ছিল। ১৫ই অগাস্ট না হলে বাকশাল কার্য্যকরী হয়ে ফলপ্রসু না হলে বঙ্গবন্ধু নিজেই তা’ পরিবর্তন করতেন। মোদ্দাকথা, বাকশালের সমালোচনার সুযোগ নেই যেহেতু এটা কোন অবৈধ ব্যবস্থা নয় এবং তা’ কোনদিনই আলোর মুখ দেখেন নি। বাকশাল না হলেও বঙ্গবন্ধু ১৯৭৭ সাল অবধি ক্ষমতায় থাকতেন। সুতরাং ক্ষমতা কুক্ষীগত করার ত্বরে বঙ্গবন্ধু বাকশাল কায়েম করতে চেয়েছিলেন সেই লজিক্যাল ফ্যালাসি গ্রহনযোগ্য হতে পারে না।
বাকশাল ব্যবস্থায় সংসদ চাইলে রাষ্ট্রপতি’কে ইম্পিচ করতে পারতো। বাকশালের নির্বাচনী ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি’কে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বাধ্যবাধতা ছিল। কায়েম হলে হয়তঃবা বঙ্গবন্ধু সেই মেনডেটও চাইতেন। দুই সংসদ নির্বাচন হয়েছিলো বাকশাল ব্যবস্থায়। একটিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামের সহোদর হেরেও গিয়েছিলেন।
কেমন ছিল বাকশালের নির্বাচনী ব্যবস্থা? যেমন ছিল এক পার্টি থাকাকালীন মার্কিনী ব্যবস্থায়। গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি মানে রিপাবলিক পার্টি থেকেই দুইজন’কে গোপন ব্যালেটের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হতো। তারপর দুইজন থেকে একজন সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হতেন। এখন যেমন দুই দল থেকে দুইজন তখন ছিল এক দল থেকে দুইজন। মার্কিনী নির্বাচনে টাকার খেলা। বঙ্গবন্ধু সেটা বন্ধ করেছিলেন বাকশালে। সরকার থেকেই দুই প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচার সমানভাবে করা হবে। কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় পার্টির ভোট আছে, নেই সরাসরি ভোট। মার্কিন ব্যবস্থায় লাগে টাকা–এক কিংবা দুই পার্টি যা’ই হোক না কেন।
বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে যে সমস্যা তার শুরু জিয়া-এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা নেয়ার পর ৫ম ও ৮ম সংশোধনীর পর (যদিও কোর্ট থেকে এই দুইটি’কে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছিলো পরবর্তীতে)। ৪র্থ সংশোধনীতে মূলনীতি পরিবর্তিত হয় নি। রহস্যজনকভাবে এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে কেউ কোর্টে মামলাও ঠুকেন নি। (উল্লেখ্য, ৫ম সংশোধনীর বিরুদ্ধেও কেউ মামলা ঠুকেন নি। মুন সিনেমা হল নিয়ে একটি মামলার রায়ে বিচারপতি মালিক পক্ষ’কে বলেছিলেন ৫ম সংশোধনীর আলোকে রায় প্রদান করা হয়েছে। সুতরাং বাদীপক্ষ চাইলে ৫ম সংশোধনীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে। বাকীটা ইতিহাস।)
যুদ্ধোপরাধীদের ঠেকাতে এবং নির্বাচনে কালো টাকা রোধকল্পে বঙ্গবন্ধু আপত্কালীন বহুদলীয় ব্যবস্থা বন্ধ করেছিলেন।
আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে বাকশাল গঠন করে সবচেয়ে বঞ্চিত করেছিলেন নিজ দলের লোকজন’কে। অনির্বাচিত বাকী রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ’কে বাকশালে স্থান দিতে গিয়ে অনেক লীগার বাদ পড়েছিলেন। তার আগে ৭৩’র নির্বাচনে সিট সংকুলন করতে গিয়ে ৭০’র নির্বাচনের বহু কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সদস্য বাদ পড়ে গিয়েছিলেন। তাদের সকলেই লীগের।
জাসদ ও সর্বহারাসহ চৈনিক’রা বাকশাল মেনে নেন নি। যদিও তাঁদের কোন জনপ্রতিনিধি ছিল না সংসদে। ওসমানী ও মইনুল হোসেন পদত্যাগ করেছিলেন প্রতিবাদে। কাউকেও জোড়-জবরদস্তি করা হয় নি।
ডেপুটি বিধায় জিয়া সদস্য হতে পারেন নি। তবে তিনি সকল গভর্নর’দের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছিলেন। জিয়া ও খালেদা’র একটি ছবি আছে বাকশাল সমাবেশের অতিথি হিসাবে। বাধ্যবাধকতা ছিল না তারপরেও স্বপ্রণোদিত হয়ে গিয়েছিলেন। অবৈধভাবে ক্ষমতা নিয়ে বাকশালের প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি ঠিকই রেখেছিলেন। তবে সেই পদ ছিল বাকশালী প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি’র চেয়েও স্বৈরাচারী। সংসদ ছিল ডামি। কারণ রাষ্ট্রপতি’কে ইমপিচ করার কোন এখতিয়ার সংসদের ছিল না। উল্টো প্রেসিডেন্ট যে কোন সময় সংসদ ভেঙ্গে দিতে পারতেন–প্রধানমন্ত্রী ও স্পীকারের অনুমোদন ছাড়া। প্রেসিডেন্টই প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রীপরিষদ, সংসদীয় দলের নেতা, স্পীকার, হুইপ সবকিছুই নিয়োগ দিতেন!
৯১’এ ক্ষমতায় গিয়ে চাঁপে পড়ে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। কোনদিন এই ব্যবস্থার চর্চা করেন নি। কোন পদ-পদবী’তে না থেকে, জনপ্রতিনিধি না হয়েও তারেক ছিল সর্বেসবা। জিয়ার চেয়েও স্বৈরাচার। কিন্তু যেহেতু কোন পদ-পদবী’তে নেই। তাই অফিসিয়ালি দায়ও নেই। বারব অফিসিয়ালি দায়ী।
বারব’টা আবার কে? ছাত্র দলের মামুন নামের একজনের সাথে ইলিয়াস আলীর সাথে নট-খট বেঁধেছিলো। নিরু-অভি’রা জানতেন যে, ইলিয়াস খতর নক। মামুন’কে মেরে ফেলবে। তাই সূর্যসেন হলের একটি রুমে রেখে বাইর থেকে তালা বন্ধ করে এমন কি মূল ফকটে তালা বন্ধ করে পাহারায় বসিয়েছিলেন বাবর ও সুব্রত বাইন’কে। কিন্তু ইলিয়াস আলী’কে গেট খুলে দিয়ে মামুনের রুম নম্বর বলে দেয় বাইন-বাবর। ২০০১’এ এসে এই বারব’কে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বানিয়ে আঁদতে তারেকই ক্ষমতা চালাতেন।
আর্মি’র সাথে গন্ডগোলেই তারেকের কাল হয়ে দাঁড়ায়। মামলা প্রত্যাহার করার পরেও তিনি দেশে আসার সাহস পাচ্ছেন না। কারণ রাষ্ট্রপক্ষ চাইলে সুপ্রীম কোর্টে আপিল করে পুরানো সাজা বহাল রেখে কার্য্যকরী করতে পারেন। একদিকে আর্মি আর অন্যদিক জামায়াত আবার আছে ইউনুস গং। সুতরাং তারেক’কে দেশে এনে প্রধানমন্ত্রী করে দেয়ার সে সুশীলিয় ‘গণতন্ত্র’ তা’ আজ তামাদী।
এসেছে নতুন ‘গণতন্ত্র’। সেই ৪৭ থেকে শুরু। লীগের আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। নতুবা অবসরে যেতে হবে। এই নতুন ‘গণতন্ত্র’কে প্রতিহত করা অতীতের সবকিছুর চেয়েও দুরূহ কর্ম। লীগ কি করবে? কিভাবে করবে? দেখা যাক। তবে ‘বানরের তৈলাক্ত বাঁশের অংক’ আর কত প্রজন্ম কষে বেড়াবে! বর্তমান প্রজন্ম কি রাজী আছে? সে’টা যাচাই করা জরুরী সবকিছুর আগে…
Visited 114 times, 1 visit(s) today