রাজনীতির সংজ্ঞা, সরকারের ভাষা, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর ভাষা, সবই পরিবর্তিত বাংলাদেশেঃ সভ্যতার বিদায়

রাজনীতির সংজ্ঞা, সরকারের ভাষা, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর ভাষা, সবই পরিবর্তিত বাংলাদেশেঃ সভ্যতার বিদায়
শেয়ার করুন

।।মতামত।।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পদত্যাগ এবং অপশাসন-নির্যাতনের প্রতিবাদে আগামী ০১-১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ২৮ জানুয়ারি রাতে দলটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ০১ ফেব্রুয়ারি থেকে ০৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দাবির পক্ষে লিফলেট বা প্রচারপত্র বিলি করবে দলটি, ০৬ ফেব্রুয়ারি দেশে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে, ১০ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ, ১৬ ফেব্রুয়ারি অবরোধ এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা সর্বাত্মক ‘কঠোর’ হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনাসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ অন্যান্য মামলা প্রত্যাহার এবং ‘প্রহসনমূলক বিচার’ বন্ধেরও দাবি জানানো হয়।

কর্মসূচি ঘোষণার পর ২৯ জানুয়ারি বুধবার বিকেলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগ নিয়ে সরকারের অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ যত দিন না ক্ষমা চাচ্ছে, যত দিন না তাদের নেতৃত্বকে বিচারের মধ্যে আনা হচ্ছে এবং যত দিন না জবাবদিহির মধ্যে আসছে, তত দিন তাদেরকে কোনো প্রোটেস্ট (প্রতিবাদ কর্মসূচি) করতে দেওয়া হবে না। এর আগে সকালে নিজের ফেসবুকে এক পোস্টেও এ বিষয়ে কথা বলেন তিনি। তার পরপরই ডিআইজি (রাজনৈতিক উইং) এসবি, ঢাকা দেশের বিভাগীয়, জেলা ও থানা পর্যায়ের পুলিশের সকল কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বার্তা প্রেরণ করেন, বার্তায় লিখেন, “আসসালামু আলাইকুম, বিশেষ বার্তা আগামী ফেব্রুয়ারি/২০২৫ মাসব্যাপী বিশেষ সতর্কতা এবং নিম্নরূপ জরুরি নির্দেশনাসমূহ প্রতিপালনসহ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হলোঃ

১. নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ লিফলেট বিতরণ, ঝটিকা মিছিল কিংবা কোনরূপ কার্যক্রম গ্রহণের চেষ্টা দৃশ্যমান হলে গ্রেফতারসহ সন্ত্রাস দমন আইন/সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা রুজু এবং অন্যান্য আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে;

২. আওয়ামীলীগ কিংবা এর অন‍্যান‍্য সহযোগী/অঙ্গ সংগঠন কর্তৃক কোনরূপ কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে;

৩. ⁠জেলা ম‍্যাজিষ্ট্রেট, সংশ্লিষ্ট সকল গোয়েন্দা সংস্থা এবং ফ‍্যাসিবাদ বিরোধী সকল রাজনৈতিক এবং সামাজিক শক্তির সঙ্গে সমন্বয় ও আলোচনার মাধ্যমে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

নির্দেশক্রমে, ডিআইজি (রাজনৈতিক উইং) এসবি, ঢাকা।”

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। একটি দেশে রাজনীতি করার জন‍্য রাজনীতির সংজ্ঞার আলোকে রাজনৈতিক দল গঠন, দলের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নিশ্চয়ই রাষ্ট্র বিজ্ঞান তথা বিশ্ব স্বীকৃত নিয়মাবর্তিতার শিক্ষা রয়েছে। বাংলাদেশ মনে হচ্ছে পৃথিবী থেকে আলাদা একটি রাষ্ট্র। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কার্যক্রম থেকে অন্ততঃ রাজনীতির প্রশ্নে বিশ্ববাসীকে নতুন বার্তা ও নতুন শিক্ষা নিতে হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরাতন এবং ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কর্মসূচি পালনের প্রশ্নে সরকারের বক্তব্যে মনে হচ্ছে, রাজনৈতিক দল সরকারের কর্মচারী। কর্মচারী ভুল করলে যেমন সরকার বিচারের ব্যবস্থা করণসহ ক্ষমা প্রার্থনার জন‍্য বলতে পারে এবং ক্ষমাও করতে পারে, তেমনি রাজনৈতিক দলও ইউনুস সরকারের কাছে তেমনই, আওয়ামী লীগকে ক্ষমা চাইতে বলা হচ্ছে। রাষ্ট্র বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় পৃথিবী স্বীকৃত শিক্ষা থেকে আমরা জানতে পারি, রাজনৈতিক দলের বিচারক দেশের জনগণ তথা নির্বাচকমন্ডলী বা ভোটার। আওয়ামীলীগকে ক্ষমা চাইতে হবে, আওয়ামীলীগ কার কাছে ক্ষমা চাইবে, আওয়ামীলীগ কার কাছে ভুল করেছে? আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক দল কি সরকারের কাছে ভুল করে? রাজনৈতিক দল কি সরকারের কাছে জবাবদিহি করবে নাকি জনগণের কাছে জবাবদিহি করবে?  দেশের জনগণ তথা নির্বাচকমন্ডলীর ম‍্যান্ডেট ছাড়াই যদি সরকার জনগণের সাংবিধানিক ক্ষমতা হরণ করে রায় তারা নিজেদের মতো করে দিয়ে দেয়, তাহলেই তাকে ফ‍্যাসিবাদ বলে। আওয়ামী লীগের কর্মসূচি পালনের প্রশ্নে সরকারের অবস্থান ফ‍্যাসিবাদীর চরম প্রকাশ। এটি অসভ্যতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

এবার আসুন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীর বক্তব্য নিয়ে কিছু বলি। ডিআইজি (রাজনৈতিক উইং) এসবি, ঢাকা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তার বার্তাটি গভীরভাবে অনুধাবন করুন। তিনি কি রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির সাথে সমন্বয় করে আওয়ামীলীগের কর্মসূচি মোকাবিলা করার নির্দেশনা দিতে পারেন? তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যেন স্বাভাবিক থাকে, কোন অবস্থাতেই যেন জনগণের ভোগান্তি নাহয়, আইনশৃঙ্খলার অবনতি নাহয়, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দিতে পারেন। কিন্তু তিনি যা বলেছেন, তাতে মনেহয় তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, দেশে স্বৈরশাসন চলছে এবং তিনিই দেশের শাসনকর্তা। সরকার ও সরকারের কর্মকর্তা কর্তৃক এমন আজগুবি ভাষার ব্যবহার পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রে ব‍্যবহৃত হওয়ার উদাহরণ আছে মর্মে আমরা জানি না। তাহলে বাংলাদেশে কি পৃথিবীর বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হয়েই পৃথিবীর মানচিত্রে থাকবে? আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোন নিয়মকেই ইউনুস সরকার ও তার সরকারের কর্মচারীরা তোয়াক্কা করবে না? এমনতর আচরণে এটি পরিষ্কার যে, বাংলাদেশ থেকে সভ্যতা বিদায় নিয়েছে, ফ‍্যাসিবাদীরা রাষ্ট্রের ভোটার তথা নির্বাচকমন্ডলী ও জনগণকে জিম্মি করেছে। অতএব পৃথিবীর সকল শাসক গোষ্ঠী, রাজনৈতিক শক্তি, সচেতন নাগরিক এবং বাংলাদেশের সকল জনগণ যেন বিষয়টি দ্রুত ভাবেন এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

গোলাম হোসেন
রাজনৈতিক কর্মী।
৩১ জানুয়ারি, ২০২৫।
Visited 133 times, 1 visit(s) today