সংবাদ প্রতিবেদন
বিএনপি সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর চাঞ্চল্যকর ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় অস্ত্র আইনের মামলায় খালাস পেয়েছেন। একই ঘটনায়, বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় গত ১৮ই ডিসেম্বর খালাস পাওয়ার পর এখন তার মুক্তিতে আর বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী শিশির মনির।
শিশির মনির বলেন, “আমি আশা করি, আজকের মধ্যে মুক্তির আদেশ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাবে এবং খুব শীঘ্রই তিনি জেল থেকে মুক্তি পাবেন। তিনি বর্তমানে কেরানীগঞ্জ কারাগারে আছেন। আদেশ যথাযথভাবে পৌঁছানোর পর তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং শুভানুধ্যায়ী সকলে শান্তিপূর্ণভাবে আইন মেনে তাকে মুক্ত করবেন এবং সম্মানজনকভাবে বাসায় পৌঁছে দেবেন।”
এদিকে, ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়ার সাজা কমিয়ে ১৪ বছর কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয়েছে। এই রায় মঙ্গলবার, বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি নাসরিন আক্তারের আপিল বেঞ্চে দেওয়া হয়।
আসামিদের পক্ষে আইনজীবী শিশির মনির জানান, এই মামলায় মোট ১৪ জনের সাজা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৫ জনকে আদালত বেকসুর খালাস দিয়েছে, ৫ জনের সাজা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং ৪ জনের মৃত্যুজনিত কারণে মামলার নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। যে ৫ জন সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে পরেশ বড়ুয়ার যাবজ্জীবন সাজা ১৪ বছর কারাদণ্ডে রূপান্তরিত হয়েছে। আর বাকিরা— আকবর, লিয়াকত, হাফিজ এবং সাহাবুদ্দিন— প্রত্যেকে ১০ বছর করে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন।

উদ্ধারকৃত দশ ট্রাক অস্ত্রের একাংশ
এছাড়া, ১০ বছরের সাজা হলেও, তারা ইতোমধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে কারাবন্দি ছিলেন। বিচারক জানিয়েছেন, এ সময়টি তাদের মোট মেয়াদ থেকে বাদ যাবে এবং তাদের পরিপূর্ণ সাজা কমানো হবে, বলে জানান শিশির মনির।
খালাস পাওয়া ব্যক্তির তালিকায় রয়েছেন:
- সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর
- এনএসআই-এর সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী
- রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)-এর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহসিন তালুকদার
- সিইউএফএল-এর সাবেক মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) এ কে এম এনামুল হক
- সাবেক ভারপ্রাপ্ত শিল্পসচিব নুরুল আমীন
১৪ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন: পরেশ বড়ুয়া, যার সাজা পূর্বে যাবজ্জীবন ছিল।
১০ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন: এনএসআই-এর সাবেক উপপরিচালক অবসরপ্রাপ্ত মেজর লিয়াকত হোসেন, সাবেক পরিচালক অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার সাহাব উদ্দিন আহাম্মদ, সাবেক মাঠ কর্মকর্তা আকবর হোসেন খান এবং চোরাকারবারি হাফিজুর রহমান।
মৃত্যুজনিত কারণে আপিল বাতিল হয়েছে রাজাকার মতিউর রহমান নিজামী, দীন মোহাম্মদ, আব্দুর রহিম ও আব্দুস সোবহানের।
২০০৪ সালের ১লা এপ্রিল, চট্টগ্রামের সিইউএফএল ঘাটে ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান জব্দ করা হয়। ওই ঘটনায় কর্ণফুলী থানায় অস্ত্র আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় চোরাচালানের অভিযোগে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, চীনের তৈরি এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার জন্য সমুদ্রপথে আনা হয়েছিল। বাংলাদেশের মাধ্যমে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওই অস্ত্র ভারতে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ভারতকে অস্থিতিশীল করে তোলাই ছিল যার লক্ষ্য।
২০১৪ সালের ৩০শে জানুয়ারি, চট্টগ্রামের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এই মামলার রায় প্রদান করে। অস্ত্র আইনের মামলায় সব আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় সাবেক শিল্পমন্ত্রী এবং জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমির, যুদ্ধাপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত রাজাকার মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার সামরিক কমান্ডার পরেশ বড়ুয়া এবং দুটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
২০২২ সালের ১৮ই ডিসেম্বর হাই কোর্টের রায়ে বাবরসহ ৭ জন খালাস পেয়েছেন। পরেশ বড়ুয়ার মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ৪ জনকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, রাজাকার মতিউর রহমান নিজামী এবং আব্দুর রহিমের মৃত্যুর কারণে তাদের বিরুদ্ধে মামলা অকার্যকর হয়ে যায়।
