নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলতেন, ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস’। বাংলা, বাঙালি, স্বাধীনতা ও স্বাধিকার অর্জনের লক্ষে ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলি হলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এটি এশিয়া মহাদেশের ‘বৃহত্তম’ ছাত্র সংগঠন।
আজ সম্পূর্ণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এই প্রাচীন সংগঠনটির ৭৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপিত হলো দেশজুড়ে, বিভিন্ন মানবিক কর্মসূচির মাধ্যমে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর রাত থেকেই শুরু হওয়া মানবিক কর্মসূচির মধ্যে ছিল এই শীতের রাতে রাস্তায় ঘুমানো অসহায় ছিন্নমূল মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র ও কম্বল বিতরণ এবং তাদের মাঝে খাবার বিতরণ। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুলের শ্রদ্ধা জানানো হয়।
ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অসহায় মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করে তাদের কাছে জননেত্রী শেখ হাসিনার জন্য দোয়া চান। ছিন্নমূল অসহায় মানুষরাও দুই হাত তুলে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের জন্য দোয়া করেন।
বিডি ডাইজেস্ট-এর প্রতিনিধিরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ছাত্রলীগের কর্মসূচির স্থিরচিত্র ও ভিডিওচিত্র পাঠিয়েছেন।
গাজীপুর
বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গাজীপুর মহানগরের প্রাণকেন্দ্র চান্দনা চৌরাস্তায় অসহায় মানুষদের মাঝে শীতবস্ত্র এবং খাবার বিতরণ করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এসময় তারা ছিন্নমূল অসহায় মানুষদের খোঁজখবর নেন। তাদের যেকোনো প্রয়োজনে ছাত্রলীগ পাশে থাকবে বলে আশ্বাসও দেন। অর্ধাহারে, অনাহারে থাকা ভাসমান ছিন্নমূল মানুষ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও জননেত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনা করে দোয়া করেন।


ঢাকা জেলা উত্তর
কেক কেটে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করেন ঢাকা জেলা উত্তর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এসময় তারা দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে দেশকে কীভাবে নেতৃত্ব দিয়ে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করেন। প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং দেশজুড়ে দমন-পীড়নের মাঝেও ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন নেতাকর্মীরা। এসময় অনুষ্ঠানস্থল ছাত্রলীগের সাবেক এবং বর্তমান নেতাকর্মীদের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
আড়ম্বরহীন আনুষ্ঠানিকতার মাঝে উদযাপিত এই আয়োজনের মাধ্যমে তারা দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন।

ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ছাত্রলীগ
রাষ্ট্রীয় মদদে দমন-পীড়নের ঝুঁকি নিয়েও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমে এসেছিলেন মানবিকতার দৃষ্টান্ত হয়ে। রাস্তার ভাসমান ছিন্নমূল মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ করেন তারা। অসহায় মানুষরা এই প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যে এমন আনকোরা নতুন কম্বল পেয়ে রীতিমত হতবাক হয়ে যান। ভ্যাবাচেকা খেয়ে প্রশ্নও করেন, বিভিন্ন সংগঠনের মত ছবি তুলে আবার কম্বল ফেরত নিয়ে যাবে কিনা? জানতে চান, কোন সংগঠনের পক্ষ থেকে কম্বল দেওয়া হচ্ছে?
এসময় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাদের আশ্বস্ত করে বলেন ছাত্রলীগ তাদের জন্য কম্বল নিয়ে এসেছে। ছাত্রলীগের নাম শুনেই মুখে হাসি ফুটে উঠল অসহায় মানুষদের। নেতাকর্মীদের বুকে জড়িয়ে ধরেন তারা। এসময় এক আবেগাপ্লুত দৃশ্যের অবতারণা হয়। শেখ হাসিনার জন্য দোয়া করেন ঢাকার রাস্তার এই অসহায় মানুষেরা।

চট্টগ্রাম সিটি কলেজ ছাত্রলীগ
চট্টগ্রাম সিটি কলেজ ছাত্রলীগ ৭৭ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করল আড়ম্বর পরিহার করে মানবিক কর্মসূচির মাধ্যমে। এমনকি পোস্টার ও লিফলেট ছাপানোর জন্যও তারা অর্থব্যয় না করে সেই অর্থ শীতবস্ত্র ক্রয়ের কাজে লাগিয়েছেন। হাতে লেখা ছাত্রলীগের শুভেচ্ছাবার্তা সম্বলিত শীতবস্ত্র বিতরণ করেন নেতাকর্মীরা রাস্তার ফুটপাতে, গাছতলায় রাত কাটানো গৃহহীন হতদরিদ্র ভাসমান মানুষের মাঝে। এই কনকনে ঠান্ডার মাঝে কম্বলের উষ্ণতা পেয়ে অসহায় মানুষগুলো ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মাথায় হাত রেখে দোয়া করেন। গভীর রাতে এই সাধারণ মানুষও সমস্বরে জয় বাংলা স্লোগানে আলোড়িত করেন বীর চট্টলা রাজপথ।

নারায়ণগঞ্জ
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জেও ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন নেতাকর্মীরা। রিক্সাচালক, ফুটপাতে থাকা ছিন্নমূল মানুষের মাঝে তারা শীতবস্ত্র বিতরণ করেন এবং নেতাকর্মীদের জন্য, শেখ হাসিনার জন্য দোয়া কামনা করেন।
টাঙ্গাইল
টাঙ্গাইলে আজ সকালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মিছিল বের করেন। মিছিলটি নিরালার মোড়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে থেকে বের হয়ে জগলুর রোড দিয়ে চলে যায়। এর আগে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দেয় সংগঠনের নেতাকর্মীরা। নেতাকর্মীরা এসময় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে মিছিল বের করেন।
যদিও টাঙ্গাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তানভীর আহমেদ ছাত্রলীগের মিছিল বের করার খবরে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, পুরো শহরে টহল দেওয়া হয়েছে। কাউকে পাওয়া গেলেই ধরা হবে। তাদের কোথাও দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। এ বিষয়ে আমরা তৎপর রয়েছি।

গোপালগঞ্জ
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা ও কেক কাটার মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭৭ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিক পালিত হয়। এসময় নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে ফুলের মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিভিন্ন স্লোগানও দেন তারা। এর আগে ৪ঠা জানুয়ারি দিবাগত রাতে জেলা শহরের লঞ্চঘাট এলাকায় কেক কেটে দিবসটি উদযাপন করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

ছাত্রলীগের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস
তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় একঝাঁক সূর্যবিজয়ী স্বাধীনতাপ্রেমী তারুণ্যের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় এশিয়া মহাদেশের ‘বৃহত্তম’ ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের ৭৬ বছরের ইতিহাস জাতির মুক্তির স্বপ্ন, সাধনা এবং সংগ্রামকে বাস্তবে রূপদানের ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার আগেই ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পর সর্বপ্রথম মাতৃভাষা বাংলার জন্য সংগ্রাম করেছিল। যার ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জল ভূমিকা ছিল। বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া মোহাম্মদ রফিক ছিলেন ছাত্রলীগ কর্মী। যাদের রক্তের বিনিময়ে এই বাংলা ভাষা মর্যাদায় আসীন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবির আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করাসহ সমগ্র জাতিকে স্বাধিকার আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করায় ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণে নির্দেশিত হয়ে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সারাদেশে ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। প্রতিটি জেলায়, উপজেলায় এমনকি গ্রাম পর্যায়ে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। নেতা-কর্মীরা স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রলীগের ১৭ হাজার নেতাকর্মী শহিদ হন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামের স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে।
১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর পিছিয়ে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নে ছাত্রলীগ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রলীগ তেজোদীপ্ত ভূমিকা রাখে। যুদ্ধাপরাধমুক্ত বাংলাদেশ গড়তেও ছাত্রলীগ অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে।
