কান ঘেঁষে গজাচ্ছে নতুন রাষ্ট্র, ভূ-রাজনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ?

কান ঘেঁষে গজাচ্ছে নতুন রাষ্ট্র, ভূ-রাজনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ?
শেয়ার করুন

বাংলাদেশের জন্য ঘনীভূত হচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক এক জটিল পরিস্থিতি। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ও আরাকান আর্মির হাত ধরে কক্সবাজার সীমান্তের ওপাড়ে যেকোনো মুহুর্তে অভ্যুদয় ঘটতে পারে এক নতুন রাষ্ট্রের। চলতি মাসেই দেশটির সরকারি বাহিনীকে পরাজিত করে রাখাইনে ৮০ শতাংশের বেশি অঞ্চলের দখল নিয়েছে রাজ্যটির সশস্ত্র বিদ্রোহী বাহিনী আরাকান আর্মি। যার ফলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর এখন দক্ষিণ এশিয়ায়।

৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের অস্থিরতার মধ্যেই আরও ভয়াবহ সংকটে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

জানা গেছে, রাখাইন অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে শুরু করেছে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো। এতে প্রশ্ন উঠেছে, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কি নতুন সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ?

এই নতুন সমীকরণ ঢাকার জন্য কতটা স্বস্তিদায়ক হবে, এ নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এসব নিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।

মাত্র দেড় দশক আগে ২০০৯ সালের ১০ই এপ্রিল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইউনাইটেড লীগ অফ আরাকান (ইউএলএ) এর সামরিক শাখা- আরাকার আর্মির। স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবিতে তারা কার্যক্রম শুরু করে। রাখাইন নৃগোষ্ঠীর (আরাকানি) বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের এই সংগঠন নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সামনে রেখে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রতিষ্ঠার মাত্র দেড় দশকের কম সময়ে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীকে পরাজিত করে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা। তাই দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এখন অনেকটাই নিশ্চিত।

এদিকে ভৌগলিকভাবে রাখাইনের অবস্থান ও এর প্রাকৃতিক সম্পদ চীন ও ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাখাইনকে নিজেদের বলয়ে রাখতে এশিয়ার এই দুই পরাশক্তি এরইমধ্যে কূটনৈতিক ও গোপন তৎপরতা শুরু করেছে। জানা গেছে, রাখাইনে রয়েছে এই দুটি দেশের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ।

ইতিমধ্যে রাখাইনের চকভিউতে চীন গড়ে তুলেছে গভীর সমুদ্রবন্দর। বঙ্গপোসাগরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলায় রাখাইনের এই বন্দর চীনের মহাস্ত্র। এছাড়া এই বন্দর থেকেই সরাসরি গ্যাস সরবরাহ হয় চীনে। দেশটির বেল্ট এন্ড রোড ইনেশিয়েটিভ বাস্তবায়ন ছাড়াও মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় তেল-গ্যাস পাঠানোর বিকল্প ও সহজ পথও এই অঞ্চলকে ঘিরে। এছাড়া মিয়ানমারের ইরাবতী নদীতে চীনের ১৩ হাজার মেগাওয়াটের এক জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তো রয়েছেই।

অন্যদিকে ভারতের জন্য রাখাইন অঞ্চলও মহাগুরুত্বপূর্ণ। কালাদান মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বাইপাস করে সেভেন সিস্টার্স ও কলকাতার মধ্যে ভারতের যোগাযোগ সহজ করতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে ভারত। এছাড়া সেভেন সিস্টার্সকে চীনের বিচ্ছিন্নকরণের হুমকি মোকাবিলায়ও রাখাইন প্রদেশ ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর কাছেও রাখাইন বেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে। এশিয়ার এই অঞ্চলের প্রভাব ও বাণিজ্যিক পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাখাইনের বিকল্প নেই তাদের কাছে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, রাখাইন নিয়ে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির যে নতুন সমীকরণ শুরু হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ও অবস্থান কী হবে?

মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মি, দুপক্ষের সঙ্গেই ভালো সম্পর্ক ভারত ও চীনের। নতুন রাষ্ট্র গঠন হলেও এই দুই শক্তিশালী দেশের ওপর তেমন প্রভাব পড়বে না। বরং নতুন রাষ্ট্র গঠিত হলে চাপে পড়বে বাংলাদেশ। সীমান্ত থাকা প্রতিবেশি মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত সীমিত। স্পর্শকাতর রোহিঙ্গা ইস্যু, সমুদ্রসীমা বিরোধ মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর বাংলাদেশের আকাশ ও সমুদ্রসীমা লঙ্ঘন, পাবর্ত্য অঞ্চলকে নিজেদের বলে দাবী করার মতো বহু কারণে দুই দেশের সম্পর্কও বরফ শীতল।

এছাড়া নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে কার্যত হাত গুটিয়ে নিয়েছে ভারত ও চীন। ফলে শরণার্থী রোহিঙ্গারা নতুন সংকট হিসেবে আর্বিভূত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জন্য।

জানা গেছে, রোহিঙ্গা ও আরাকান আর্মির মধ্যকার বিরোধ বহু পুরনো। এছাড়া গত কয়েক মাস আগে চলা সংঘাতে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের বাহিনীর পক্ষে রাখাইনের বেশ কিছু রোহিঙ্গা অংশগ্রহণ করে। ফলে রাখাইনকে স্বাধীন ঘোষণা করে আরাকান আর্মি সরকার গঠন করলে সীমান্তের ওপাড়ে থাকা ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ঢল বাংলাদেশ অভিমুখে নামার শঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংকগুলো। সেইসাথে বাংলাদেশে আগে থেকেই অবস্থানরত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন পুরোপুরি অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।

এমন ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেব উপস্থি হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

Visited 139 times, 1 visit(s) today