বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ডেস্ক:
চীন এমন একটি সুপারসনিক প্লেন তৈরি করেছে, যা মাত্র দেড় ঘণ্টায় লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্ক পৌঁছাতে সক্ষম হবে বলে দাবি করেছে। দীর্ঘ ২১ বছর পর এটিই প্রথম যাত্রীবাহী সুপারসনিক এয়ারলাইনার হতে পারে, যা কনকর্ডের চেয়েও দ্বিগুণ গতিতে ছুটবে।
সম্প্রতি চীনের একটি অ্যারোস্পেস কোম্পানি ‘স্পেস ট্রান্সপোর্টেশন’ তাদের নতুন সুপারসনিক প্লেন ‘ইউনজিং’-এর প্রথম পরীক্ষামূলক ফ্লাইট সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। এই প্লেনটির গতিবেগ হবে মাক ৪, অর্থাৎ এটি শব্দের গতির চারগুণে চলবে। উল্লেখ্য, কনকর্ডের গতি ছিল মাক ২, যা এই নতুন প্লেনের তুলনায় কম।
স্পেস ট্রান্সপোর্টেশন, যা ‘লিংকং টিয়ানজিং টেকনোলজি’ নামেও পরিচিত, ঘোষণা করেছে যে তাদের প্রোটোটাইপ প্লেনটির পরীক্ষামূলক ফ্লাইট সফল হয়েছে এবং নভেম্বরে তারা আরও উন্নত ইঞ্জিন পরীক্ষা করবে।
চীনা সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানায়, এই সুপারসনিক প্যাসেঞ্জার জেটের পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ফ্লাইটের লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে। সবকিছু পরিকল্পনা মতো চললে এটি কনকর্ডের পর প্রথম সফল যাত্রীবাহী সুপারসনিক এয়ারলাইনার হতে পারে, যা শেষবার আকাশে উড়েছিল ২০০৩ সালে।
কনকর্ড প্লেন আটলান্টিক অতিক্রম করত প্রায় ৩ ঘণ্টায়। বর্তমানে প্রচলিত এয়ারলাইনারে লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্ক পৌঁছাতে ৮ ঘণ্টা সময় লাগে, কিন্তু এই নতুন সুপারসনিক প্লেন সেই সময় কমিয়ে মাত্র দেড় ঘণ্টায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
সুপারসনিক এয়ারলাইনার তৈরির প্রতিযোগিতায় একাধিক কোম্পানি যুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভিনাস অ্যারোস্পেস নামে একটি প্রতিষ্ঠান এমন একটি জেট ইঞ্জিন তৈরি করছে, যা মাক ৬ গতি অর্জন করতে পারবে বলে দাবি করেছে। তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি শুধু দ্রুতগতিই হবে না, বরং হাইপারসনিক অর্থনীতির ধারণা বাস্তবে রূপান্তর করবে।
অন্যদিকে, টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান ইলন মাস্কও সুপারসনিক জেট নির্মাণে আগ্রহী। তিনি একাধিকবার এমন একটি ইলেকট্রিক ‘ভার্টিকাল টেক-অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং (ভিটল)’ সুপারসনিক প্লেন তৈরি করার কথা বলেছেন, যা জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বিদ্যুৎচালিত হবে।
২০২১ সালে এক টুইটে মাস্ক বলেছিলেন, “আমি একটি সুপারসনিক ইলেকট্রিক ভিটল জেট তৈরির জন্য আগ্রহী। তবে কাজের চাপের কারণে আপাতত এটি নিয়ে এগোনো সম্ভব হচ্ছে না।”
সুপারসনিক প্লেনের অন্যতম সুবিধা হলো যাত্রার সময় কমানো, যা ব্যবসায়িক ও পর্যটন খাতে বিপ্লব আনতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে সুপারসনিক ফ্লাইট বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে যাত্রীরা এখন অপেক্ষা করছে এমন প্রযুক্তির জন্য যা সময় সাশ্রয় করবে। তবে, এ ধরনের প্লেনের জন্য উন্নত প্রযুক্তি, উচ্চ জ্বালানি খরচ, শব্দদূষণ এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে নির্মাতাদের।
স্পেস ট্রান্সপোর্টেশনসহ অন্যান্য কোম্পানি যখন সুপারসনিক প্লেন তৈরিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন পরিবেশবিদদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে, কারণ উচ্চ গতির এই প্লেনগুলো পরিবেশের জন্য হুমকি হতে পারে। প্রচলিত এয়ারলাইনারের তুলনায় সুপারসনিক প্লেনগুলোর জ্বালানি খরচ বেশি এবং এর ফলে কার্বন নিঃসরণও বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের তৈরি ইউনজিং প্লেনটি সফলভাবে আকাশে উড়তে পারলে আকাশপথে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ভ্রমণগুলো অনেক কম সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে, যা ব্যবসা ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
সুপারসনিক ফ্লাইট আবার ফিরে এলে এটি মানুষের ভ্রমণ পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনবে। এটি শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতিই নয়, বরং নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে, যেমন হাইপারসনিক ব্যবসা ভ্রমণ বা দ্রুত মাল পরিবহন ব্যবস্থা।
