গুজবের বিরুদ্ধে প্রমাণের লড়াই: স্বাধীন তথ্য যাচাই প্ল্যাটফর্ম ‘ফ্যাক্টচেকার ল্যাব’ এখন বাংলাদেশে

গুজবের বিরুদ্ধে প্রমাণের লড়াই: স্বাধীন তথ্য যাচাই প্ল্যাটফর্ম ‘ফ্যাক্টচেকার ল্যাব’ এখন বাংলাদেশে
শেয়ার করুন

❐ তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক


বাংলাদেশে ভুল তথ্যের বিস্তার এখন একটি জাতীয় সংকটের রূপ নিয়েছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইউটিউবে প্রতিদিন লক্ষাধিক দাবি, ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে — যার একটি বড় অংশ যাচাইবিহীন, বিকৃত বা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

রাজনৈতিক গুজব, স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত ভুল তথ্য, পুরনো ছবির নতুন মোড়কে উপস্থাপন, ডিপফেক ভিডিও — এই বিভ্রান্তির স্রোত সমাজে অস্থিরতা তৈরি করছে, সহিংসতা উসকে দিচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক বিমর্শের ভিত্তিকে ক্রমশ ক্ষয় করছে। সমস্যাটি নতুন নয়, কিন্তু এর গতি ও ব্যাপ্তি প্রতিনিয়ত বাড়ছে — আর এর বিপরীতে কার্যকর, নির্ভরযোগ্য এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তাও তীব্র হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে যাত্রা শুরু করেছে FactCheckerLab — বাংলাদেশের একটি স্বাধীন তথ্য যাচাই প্ল্যাটফর্ম, যার ঠিকানা factcheckerlab.com। Fazley Rabbi-র নেতৃত্বে এবং Al Noman Shamim-এর পরামর্শে পরিচালিত এই উদ্যোগের মূলনীতি একটাই: মতামত নয়, প্রমাণই একমাত্র মানদণ্ড।

প্রতিষ্ঠানটির কোনো সম্পাদকীয় কণ্ঠস্বর নেই, কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নেই — বিভিন্ন বিশ্বস্ত উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য সংশ্লেষণ করে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হয়, কী বিশ্বাস করবেন সেই রায়টি পাঠকের নিজের।

FactCheckerLab-কে অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম থেকে আলাদা করে তোলে তার আমূল স্বচ্ছতা। প্রতিটি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সমস্ত সূত্র, অনুসন্ধান পদ্ধতি এবং চূড়ান্ত রায়ের সম্পূর্ণ প্রমাণ-শৃঙ্খল পাঠকের সামনে উন্মুক্ত রাখা হয়।

প্ল্যাটফর্মটি কোন কোন মাধ্যমকে বিশ্বস্ত বলে বিবেচনা করে, তার তালিকাও সর্বজনীন — অর্থাৎ পাঠক শুধু ফলাফল পড়েন না, পুরো অনুসন্ধান প্রক্রিয়াটি নিজে মিলিয়ে নিতে পারেন। ঐতিহ্যবাহী তথ্য যাচাই প্রতিষ্ঠানগুলিতে যে অস্বচ্ছতার অভিযোগ প্রায়ই ওঠে, FactCheckerLab সেই জায়গাটিতেই সবচেয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।

অনুসন্ধান প্রক্রিয়াটি পাঁচটি স্তরে বিন্যস্ত। প্রথমত, AFP Fact Check, Full Fact, PolitiFact, Snopes ও BOOM-এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংস্থাগুলি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দাবিটি যাচাই করেছে কি না, তা Google Fact Check Tools ডেটাবেসে খোঁজা হয়।

দ্বিতীয়ত, বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় Reuters, AP ও AFP-এর মতো আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এবং বাংলাদেশের জাতীয় গণমাধ্যম ও সরকারি উৎস থেকে তথ্য অনুসন্ধান করা হয়।

তৃতীয়ত, প্রমাণের অনুপস্থিতিও বিশ্লেষণ করা হয় — কোনো ঘটনার পক্ষে তথ্য না মিললে কেন মিলছে না, সেটি নির্ধারণ করাও অনুসন্ধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

চতুর্থত, জমা দেওয়া ছবি ও ভিডিওর ফরেনসিক পরীক্ষা চালানো হয় — সম্পাদনার চিহ্ন, অসামঞ্জস্যপূর্ণ আলো ও ডিজিটাল কারসাজির লক্ষণ খোঁজা হয়।

পঞ্চমত, ভুল তথ্যের পরিচিত ছকগুলি যাচাই করা হয় — অতিরিক্ত জরুরি ভাষা, অস্পষ্ট উদ্ধৃতি, পুরনো কন্টেন্টের পুনর্ব্যবহার এবং আবেগ-উদ্দীপক উপস্থাপনা।

এই পাঁচ স্তরের অনুসন্ধান শেষে প্রতিটি রায় প্রকাশের আগে একজন মানবিক সম্পাদক তা পর্যালোচনা ও অনুমোদন করেন — কোনো ফলাফলই যাচাই ছাড়া প্রকাশিত হয় না।

রায়ের বিভাগগুলি আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-চেকিং মানদণ্ড IFCN ও ClaimReview অনুসরণ করে মোট ১৪টি শ্রেণিতে বিন্যস্ত। শুধু ‘সত্য’ বা ‘মিথ্যা’ নয় — আধা সত্য, বিভ্রান্তিকর, বানোয়াট, পরিবর্তিত মিডিয়া, ভুল ক্যাপশন, প্রসঙ্গবিহীন, ব্যঙ্গ, প্রতারণা, মেয়াদোত্তীর্ণ এবং ইতিহাস বিকৃতির মতো সূক্ষ্ম বিভাগগুলিও এতে অন্তর্ভুক্ত।

এই বিভাজন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাস্তবের ভুল তথ্য প্রায়ই এতটা সরল নয়। একটি সত্যিকারের ছবি ভুল ক্যাপশন দিয়ে ছড়ানো হলে তা ‘মিথ্যা’ নয়, বরঙ ‘ভুল ক্যাপশন’। একটি পুরনো সত্য তথ্য পরিস্থিতি পরিবর্তনের পরও ছড়ানো হলে তা ‘মেয়াদোত্তীর্ণ’।

ইতিহাসের প্রকৃত ঘটনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে উল্টো করে উপস্থাপন করা হলে তা ‘ইতিহাস বিকৃতি’। এই সূক্ষ্মতা পাঠককে একটি দাবির প্রকৃত স্বরূপ অনেক গভীরভাবে বুঝতে সহায়তা করে।

FactCheckerLab কেবল একটি প্রকাশনা নয়, এটি একটি জনঅংশগ্রহণমূলক প্ল্যাটফর্মও বটে। কোনো সংবাদ, সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট, ছবি বা ভিডিও দেখে সন্দেহ হলে যেকোনো নাগরিক factcheckerlab.com/submit পাতায় গিয়ে সেটি বিনামূল্যে জমা দিতে পারেন।

রাজনীতি, স্বাস্থ্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ডিপফেক এবং আন্তর্জাতিক বিষয় — সব ধরনের দাবি বিবেচনায় নেওয়া হয়।

প্ল্যাটফর্মটি এখন বাংলাদেশকেন্দ্রিক হলেও সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় এর পরিধি বিস্তারের পরিকল্পনা রয়েছে।

Visited 27 times, 1 visit(s) today