— চন্দন ঘোষ শুভ
এই ছবিটার সাথে এতো বড় লেখার কি সম্পর্ক?
ডিটেইলস বলছি, বড় লেখা হলেও পড়েন আখেরে বিশাল ফায়দা হবে।
কয়েকদিন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তিনি বলেছেন, মাহাথির মোহাম্মদ ঢাকা মেডিকেলের স্টুডেন্ট ছিলেন। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভুল তথ্য। জামায়াতের লোকেরা সেটা গিলে ফেলেছে এবং প্রচার করে চলেছে।
জাশির আমিরের এই মিথ্যা তথ্য কদুরুদ্দিন শিবির আর ডাস্টবিন শফিক কি রিউমার স্ক্যানার দিয়ে ভেরিফাই করেছে? করবে না তারা, এটা লিখে নিন। তারা আজীবন গুপ্তঘাতক হয়ে এই দেশে গুজব, গণহত্যা এবং পরবর্তীকালে আবার ১৯৭১-এ পরাজিত পাকিস্তানের হয়ে রক্তের রাজনীতি কায়েম করেছে। ধর্মকে ব্যবহার করেছে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে।
জামায়াতের রাজনৈতিক মেধা গতকাল সংসদে নদীর স্রোত নিয়ে আলোচনায় স্পষ্ট বোঝা গেছে। দিন যাবে, জামায়াতের সব পর্দা মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়ে যাবে। জুলাইয়ে দেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো, তারপর রগ কাটার রাজনীতি ছেড়ে মববাজিতে মানুষ খুনের যে নতুন নকশা তারা তৈরি করেছে, তার সবই সাধারন মানুষের দৃষ্টিগোচরে আসতে শুরু করেছে ।
অল্প কিছু বিএনপি, যৎসামান্য বাম, আমাদের মতো পরিচয়বিহীন পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিস্ট এবং সাংবাদিক ছাড়া এই জামায়াতের নতুন রূপটাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ ছিল পীর শামীমের হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জামায়াতের হাত। প্যাটার্ন নতুন? মোটেও না।
এই ঘটনার পিছনের কার্যকারন বুঝতে আরেকটু পিছনে যাই—
শ্যামল কান্তি ভক্তকে মনে আছে? নারায়ণগঞ্জের সেলিম ওসমানের বিচারিক রায়ে একজন শিক্ষককে বিনা অপরাধে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে কান ধরে উঠবস করানো হয়। জামায়াতীরা অন্যদের ব্যবহার করে এলাকায় গুজব ছড়িয়ে দিল যে, শ্যামল কান্তি ভক্ত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন। নেটওয়ার্ল্ডে ছড়িয়ে পড়ল। জামায়াত আবার বিজনেসে ফিরে এল।
এরপর সারাদেশে একের পর এক—ফেনীর রসরাজ, সদ্য প্রয়াত শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র, কুমিল্লায় দেবী দুর্গার পাশে পবিত্র কোরআন রেখে গদা ইকবাল কাণ্ড, দীপু দাশ, শামীম মোল্লা, মাসুদ, তোফাজ্জল, পীর শামীম এবং আরও অনেক নাম না জানা বাংলার মায়ের সন্তান। সবক্ষেত্রেই জামায়াত-শিবির একই কায়দায় ফেসবুকে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে ধর্মীয় অবমাননার নামে, কখনো চুরির অভিযোগে মানুষকে হত্যার লক্ষবস্তু হিসাবে তুলে দিয়েছে উগ্র মুসলিমদের হাতে। এই কাজের প্রধান ও প্রথম রুপকার ছিলেন ‘আমার দেশ’ পত্রিকার মাহমুদুর রহমান, যিনি ‘হিটলিস্টেড ব্লগার’ তালিকা প্রকাশ করে হত্যার জন্য টার্গেট দেখিয়ে দিয়েছিলেন উগ্র মুসলিমদের।
অনেক ব্লগার হত্যার পরও কারও টনক নড়ছিল না। শুধু চাপাতির ভয়ে কত শত আস্তিক ব্লগার দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। আমরা এত প্রতিবাদ করেও শুনতে পেয়েছি—তোমরা বয়সে ছোট, এত কিছু কী বোঝো?
তবে আমরা চোখে স্পষ্ট দেখছিলাম, প্রত্যেক জায়গায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর ধান্দা ছিল। অনেক জায়গায় তা লাগিয়েওছে। ব্যবহার করা হয়েছে অসংখ্য এতিম শিশুকে। যাদের শিশুতোষ মগজ ধোলাইয়ে শিবির সরাসরি জড়িত না থেকে একদল এজেন্টের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছে। সেখানে অনেক আওয়ামী লীগ নেতা নিজেদের আসল চরিত্র লুকাতে শিবিরের সব অপকর্মকে বৈধতা দিয়েছে, স্পনসর করেছে। এটা শুধু আপনার এলাকার নয়, সারাদেশের একই চিত্র।
সহযোদ্ধা নাজিম ভাই বলেছিলেন,
“জামাতি কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়, জামাতি একটা মানসিকতার নাম।”
কেউ বিএনপি করেও জামাতি হতে পারে, কেউ আওয়ামী লীগ করেও জামাতি হতে পারে, এমনকি বাম করেও—
ডিপ স্টেটের দালাল শফিক ও বাটপার ইউনুসের মতো।
আজ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. জাহেদ বলেছেন, পীর শামীমের ঘটনা পরিকল্পিত। ইয়েস, এটা জামাতির পরিকল্পিত আরেকটি কিলিং প্রসেস। হয়তো অল্প কিছু প্রাণের বিনিময়ে আমরা এসব হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, এই দেশ সম্প্রীতির দেশ। সাম্প্রদায়িক কোনো দাঙ্গার উষ্কানিকে সাধারণ মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ পাত্তা দেবে না।
আওয়ামী লীগের পার্টিগত ভুলটা কোথায়? আসল ভুলটা কোথায়?
গুজব দিয়েই আওয়ামী লীগকে ধরাশায়ী করা হয়েছে এবং তারা সফল হয়েছে। এখন সেই টার্গেট বিএনপির ওপর। যেমন হাদী হত্যাকাণ্ডে সরাসরি আব্বাস ভাইয়ের নাম বলেছিল জাশির সাদিক কায়েম। কী পরিমাণ দুঃসাহস!
আওয়ামী লীগের রাজনীতি করা প্রত্যেক মানুষ মির্জা আব্বাস সাহেব, মির্জা ফখরুল সাহেব, বর্তমান সংসদের মাননীয় স্পিকার হাফিজ সাহেবসহ সব সিনিয়র নেতাদের যথেষ্ট সম্মান করে।
জামাতিদের ন্যারেটিভ—ভারতবিরোধী মনোভাব, নারীকে কুৎসিত ভাষায় অসম্মান, সাম্প্রদায়িক আচরণ, বর্ণবাদী আচরণ, পাকিস্তানি সংস্কৃতি ধারণ, মানুষকে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে ইন্ধন, লুটপাট, হিপোক্রেসি—এসব তো বাদই দিলাম। নৈতিক স্খলনের জায়গাটাও বাটপার ইউনুস আমলে মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল।
পাকিস্তানের জিয়াউল হক ১৯৭৭ সালে শাড়িকে হিন্দুয়ানি পোশাক বলেছিলেন, জামাতিরা সেটাই এ দেশের মানুষকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে। অথচ এই বাংলায় শাড়ি কত বছরের ঐতিহ্য—তা জানে? এসব মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়াতে যারা মগজ ধোলাই করে, তারা আসলে কোন ময়দার ট্যাবলেট খায়!
যে বীজ পাকিস্তানিরা এ দেশে দিয়ে গেছে, সেটা আর চাইলেও কীভাবে আটকাবেন!
তারা গুপ্ত থাকবে, আবার বের হবে, আবার নারকীয় তাণ্ডব ঘটাবেই।
এদেরকে রুখে দিতে মানুষ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনগোষ্ঠী, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী এবং সদ্য নিহত পীর শামীমের মতো ভিন্ন মতবাদের মানুষ এক ছাতার নিচে এসেছে। সেটার নাম বাঙালি জাতীয়তাবাদ। যার স্পষ্ট ভিত্তি ১৯৫২ থেকে শুরু করে, ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানে বাংলার খোকার মুখের ভাষায় আকাশে মানচিত্র ডিজাইন হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭২-এর সংবিধান, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, জাতীয় পতাকা—এসব তো আছেই।
তারা সংকটে তারেক রহমানকেই প্রধানমন্ত্রী করেছে। কত শতাংশ ভোটারের উপস্থিতি ছিল, কেমন নির্বাচন ছিল—সেটা সবাই স্পষ্ট জানে। তবু মানুষ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানকেই বেছে নিয়েছেন।
দেশে এখন বিদ্যুৎ সংকট, বৈশ্বিক সংকট, শিশুদের হামে মৃত্যু, অর্থনীতি থেকে শুরু করে অনেক কিছু নিয়ে দেশ ভঙ্গুর অবস্থায়। মানুষ কেন রাস্তায় নামছে না, জানেন? এমনকি সংসদে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার পরও কেন আওয়ামী লীগ জোরালো কর্মসূচি দেয়নি? কারণ একটাই—যেকোনো উপায়ে এ দেশে স্থিতিশীল পরিস্থিতি দরকার। স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে আওয়ামী লীগকে আটকাবে কে? বঙ্গবন্ধুর তৈরি দল আদর্শিক রাজনীতি করলে কে আটকাবে?
এই তো কিছুদিন আগেও বিভিন্ন দাতা দেশের সাহায্য নিয়ে চলা একটা দেশ, জামায়াতের মতো প্রতিপক্ষ, মেজরিটি করাপ্টেড মানুষ, নৈতিকতার অবক্ষয় হয়ে যাওয়া একটা জাতিকে ১৬ বছর টানা ক্ষমতায় থেকে ভৌগোলিক ম্যাপ দিয়েছেন শেখ হাসিনা, অর্থনীতি দিয়েছেন, ডিপ্লোম্যাসি দিয়েছেন। যে ডিপ্লোম্যাসির ধারেকাছে যেতে আজও অনেক বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পারেননি। অথচ ট্রল করেছেন “ডিজিটাল এবং উন্নয়ন” নিয়ে। পারলে আগামী ৫০ বছরে এমন কিছু করে দেখান, যা শেখ হাসিনার ডিজিটাল উন্নয়নের ধারেকাছে যেতে পারে! চ্যালেঞ্জ—এটা পারবে না।
আওয়ামী লীগ জানে তাদের ক্ষমতা হারানোর কারণ কী।
পীর শামীমের জন্য শুধু আফসোস হয় যে, এ দেশে ভিন্নমত নেওয়ার মতো মানুষ নেই। যে কারণে সমাজে কোনো ভায়োলেন্স ছড়ানো ছাড়াই জামাতির মব-চাপাতির কোপে তাকে মরতে হলো। বিএনপির এখনও পর্যন্ত বড় কোনো ভুল পাইনি। যা আছে, সেটা পার্টিজান করলে ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব পড়ে—এইটুকুই।
উদারপন্থী ধর্মীয় ব্যবস্থা, সুফিবাদের এ দেশে জামায়াতের ১৯৭১-এর রিভেঞ্জ নেওয়ার জন্য একটা বড় হুমকি। এই সত্যটা না মানলে আপনি রাজনীতি ছেড়ে দিন। তবে আমাদের দেশে রাজনীতির নামে কেবল রাজনীতি ছাড়া বাকি সব আকাম-কুকাম চলে। নুরুল হুদা পাগলা মরে গিয়েও তার লাশ কবর থেকে তুলে পোড়ানো হয়েছিল একই কায়দায়। অথচ এ দেশের মেজরিটি মুসলিম উদার বলেই এখনও এই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আমরা ভয় পাই না।
এই দেশ ধর্মের ভিত্তিতে স্বাধীন হয়নি—সেটা মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপি নেতা, মন্ত্রণালয় সামলানো টুকু সাহেব নিজেও বলেছেন। যা স্পষ্ট সত্য। এ দেশে অসংখ্য ধর্মীয় বিশ্বাস ও মতবাদের মানুষের বসবাস। সেখানে উগ্রপন্থীদের আক্রমণ অ্যালার্মিং। এদেরকে আটকান। ভিন্নমত নিন, উদারপন্থী রাজনীতিতে ফিরুন। বঙ্গবন্ধু ও দেশের মুক্তির সনদে এটাই লেখা আছে।
এবার আসি ছবির প্রসঙ্গে।
এই ছবিতেই দেখুন—শিবির ও শিবিরের বি-টিম এনসিপির চোখে ফ্যাসিস্ট বঙ্গবন্ধু বাম/ভিন্ন রাজনীতিতে বিশ্বাসী মানুষদের কতটা সম্মান করতেন! আওয়ামী লীগের ইতিহাস কেবল দালিলিক প্রমাণ নয়, ঐতিহাসিক উদাহরণ সৃষ্টি করে গেছে।
আমরা যারা লেখালেখি করি, ভালো করেই জানি আততায়ীর বুলেট আমাদের দিকে তাক করা। কেবল দেশটা ভালো থাকবে কীসে—এইটুকুই চাওয়া। রাজনীতি যারা করে, তারা কেবল রাজনীতি করুক, কোনো ধর্মের ব্যবসা না করুক। আমরা দেশের পক্ষে, ভিন্ন মতের সবার সাথে শত্রু চিনতে এবং শত্রুমুক্ত করতে প্রাণে প্রাণ মেলাবই।
