❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে এক মাসে ১২টি ঘটনা ও ধারাবাহিক অভিযানে ২ হাজার ৭৭৪ জন শিশু-কিশোরকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ)।
২০২৬ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত চারটি বিভাগ ও আটটি জেলার তথ্য পর্যবেক্ষণ করে তৈরি প্রতিবেদনটি আজ প্যারিসে সংস্থাটির সদর দপ্তর থেকে প্রকাশ করা হয়।
জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় মুদ্রিত এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমের খবর পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে জেএমবিএফ।
সংস্থাটির নিজস্ব নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যও এতে যুক্ত করা হয়েছে। সম্ভব হলে একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও নিজস্ব সূত্রের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করেছে তারা।
অভিযানের ব্যাপ্তি এবং শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক চলাচল, জনসমাগমে অংশ নেওয়া কিংবা বিদ্যালয়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রণে পুলিশি হেফাজত ব্যবহারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জেএমবিএফ।
সংস্থাটির মতে, ব্যক্তিনির্দিষ্ট, আইনসম্মত ও প্রয়োজনীয় ভিত্তি ছাড়া শিশু-কিশোরদের আটক করা হলে তাদের স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘিত হয়—পরে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হলেও।
জেএমবিএফের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহানূর ইসলাম বলেন, “শিশু-কিশোরেরা জনসমাগমস্থলে জড়ো হয়েছে, ক্লাসে যায়নি অথবা ভবিষ্যতে অপরাধ করতে পারে—এমন ধারণার ভিত্তিতে তাদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া উচিত নয়।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতিটি গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশকে ব্যক্তিনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি দেখাতে হবে এবং কেন আটক রাখা প্রয়োজন, তা প্রমাণ করতে হবে। পরে অভিভাবকের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে শিশু-কিশোরদের ছেড়ে দিলেও তাদের অধিকার আগেই লঙ্ঘিত হয়ে থাকলে সেই লঙ্ঘন মুছে যায় না।”
কুমিল্লায় সবচেয়ে বেশি আটক
জেএমবিএফের হিসাব অনুযায়ী, জেলা হিসেবে কুমিল্লায় সবচেয়ে বেশি—২ হাজার ৩৫ জন শিশু-কিশোরকে গ্রেপ্তার বা আটকের তথ্য পাওয়া গেছে। বিভাগভিত্তিক হিসাবে চট্টগ্রামে ২ হাজার ৪১৮ জন, সিলেটে ৩০০, রাজশাহীতে ৫০ এবং বরিশালে ছয়জন রয়েছে।
মাসভিত্তিক হিসাবে, ২৩ থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২ হাজার ১৭৩ জন এবং ১ থেকে ২২শে অক্টোবরের মধ্যে ৬০১ জন শিশু-কিশোর গ্রেপ্তার বা আটক হয়েছে।
জেএমবিএফ জানিয়েছে, এসব সংখ্যা তাদের পর্যবেক্ষণে শনাক্ত হওয়া ঘটনাগুলোর হিসাব; এগুলো দেশের মোট ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা নয়। কিছু ঘটনা প্রকাশিত হয়নি বা সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্কে পৌঁছায়নি বলে প্রকৃত সংখ্যা প্রতিবেদনে উল্লেখিত সংখ্যার চেয়ে বেশি হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
প্রতিবেদনে আটক-পরবর্তী পরিণতির হিসাবও দেওয়া হয়েছে। অভিভাবকের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকা নিয়ে ১ হাজার ৭২০ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আরও ১৯৪ জনকে অন্যভাবে অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ৮৩৩ জনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং ২৭ জনকে টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
জেএমবিএফ স্পষ্ট করেছে, এই হিসাবগুলো জানানো পরিণতির শ্রেণি; বর্তমানে কতজন আটক রয়েছেন, তা এগুলো নির্দেশ করে না।
ক্লাস চলাকালে ১৬ শিক্ষার্থী আটক
চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে ক্লাস চলার সময় বিদ্যালয়পড়ুয়া ১৬ জন শিশু-কিশোরকে আটকের ঘটনা প্রতিবেদনে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পরে তাদের অভিভাবকদের কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কুমিল্লা, সিলেট, নাটোর ও নোয়াখালীর গণঅভিযানও পর্যালোচনা করেছে জেএমবিএফ। শিশু-কিশোরদের স্বাধীনতা হরণের আগে কর্তৃপক্ষ আটক ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প যথাযথভাবে বিবেচনা করেছিল কি না, সে প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি।
জেএমবিএফের বক্তব্য, শিশু-কিশোরদের নিয়ে পুলিশের যেকোনো অভিযানে ব্যক্তিস্বাধীনতা বিষয়ে সংবিধানের সুরক্ষা এবং শিশু আইন, ২০১৩-এর বিধান প্রযোজ্য। শিশু অধিকারবিষয়ক কনভেনশন অনুযায়ী, আটক হতে হবে আইনসম্মত ও স্বেচ্ছাচারমুক্ত। আটককে শেষ অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করতে হবে এবং উপযুক্ত সর্বনিম্ন সময়ের জন্যই শিশু-কিশোরদের আটক রাখা যাবে।
কোনো শিশু বা কিশোর সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত—এমন অভিযোগ উঠলেও তার অধিকার ক্ষুণ্ন হয় না বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। এ ধরনের অভিযোগকে অপরাধ প্রমাণের ভিত্তি হিসেবেও বিবেচনা করা যায় না।
গণগ্রেপ্তার বন্ধসহ একাধিক দাবি
শিশু-কিশোরদের গণগ্রেপ্তার ও আটক বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে জেএমবিএফ।
সংস্থাটির দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে: শিশু-কিশোরদের আটকের প্রতিটি ঘটনার আইনি ভিত্তি ও প্রয়োজনীয়তা পর্যালোচনা করা; আইনসম্মত কারণ ছাড়া আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া; বিকল্প ব্যবস্থা ও যথাযথ পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়া; আইনজীবীর সহায়তা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রবেশন সহায়তা নিশ্চিত করা; এবং স্বেচ্ছাচারী আটকের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করা।
আইনবহির্ভূতভাবে আটক শিশু-কিশোরদের কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ পাওনা হলে তা নিশ্চিত করার দাবি করেছে তারা।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলে চিহ্নিত ঘটনাগুলো এই প্রতিবেদন থেকে বাদ রাখা হয়েছে।
জেএমবিএফ এ ধরনের ঘটনা আলাদা প্রতিবেদনে পর্যালোচনা করেছে: বাংলাদেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত শিশুদের স্বেচ্ছাচারী গ্রেপ্তার নিয়ে ছয় মাসের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন।
তবে শিশু-কিশোরদের প্রকৃত বা ধারণাগত রাজনৈতিক পরিচয়, এমনকি তাদের পরিবারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাও, কিছু গ্রেপ্তারের অপ্রকাশিত কারণ হয়ে থাকতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে জেএমবিএফ।
সংস্থাটির মতে, এ বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
