ইউনূসের জাপান সফরের ১৭ মাসঃ পাঁচ বছরে জাপানে ১ লাখ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর চুক্তির অগ্রগতি কতোটা?

ইউনূসের জাপান সফরের ১৭ মাসঃ পাঁচ বছরে জাপানে ১ লাখ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর চুক্তির অগ্রগতি কতোটা?
শেয়ার করুন

২০২৫ সালে ইউনূসের জাপান সফরে জনশক্তি রপ্তানির চুক্তি;
শ্রমিকের ঘাটতি মেটাতে জাপানের আগ্রহ থাকলেও বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদক। ২৮ অক্টোবর, ২০২৬।


জাপানের শ্রমবাজারে দক্ষ ও আধা-দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের জাপান সফরের সময় এ বিষয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু দেড় বছর পরও বাংলাদেশ থেকে এই উদ্যোগের আওতায় একজন কর্মীও জাপানে পাঠানো না হয়ে থাকলে, চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে।

জাপানে ক্রমবর্ধমান শ্রমিকসংকট মোকাবিলায় বিদেশি কর্মী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে জাপানের শ্রমবাজার গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। দুই দেশের স্বার্থের এই মিল থেকেই এক লাখ কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনাটি সামনে আসে।

জাপান সরকার ২০২৯ সালের মার্চ মাসের মধ্যে ‘এসএসডব্লিউ’ (SSW) ক্যাটাগরির অধীনে ১৬টি খাতে ৮ লাখ ২০ হাজার বিদেশি কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশ যদি কার্যকরভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তবে তারা এই চাহিদার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত—অর্থাৎ ৩ লাখেরও বেশি কর্মী—সরবরাহ করতে সক্ষম হতে পারে।

টোকিওতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কল্যাণ উইং ‘দ্য জাপান টাইমস’-এ সম্প্রতি প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করে জানিয়েছে যে, জাপান ২০২৯ সালের মার্চ মাসের মধ্যে ‘এমপ্লয়মেন্ট স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ (ESD) এবং ‘এসএসডব্লিউ’ (SSW)—উভয় ক্যাটাগরি মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের লক্ষ্য নিয়েছে।

২০২৫-এ ড ইউনূসের ১ লাখ কর্মি পাঠানোর চুক্তি

তবে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং বাস্তবে কর্মী পাঠানো এক বিষয় নয়। ভাষাগত দক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের চাহিদা, ভিসা প্রক্রিয়া ও কর্মী বাছাইয়ের মতো একাধিক ধাপ পেরিয়ে তবেই এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব। ফলে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বাস্তবে কতজন কর্মী পাঠানো হয়েছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

জাপানে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো এবং ২০২৫ সালের সরকারি সমঝোতা স্মারকের আওতায় কর্মী পাঠানো এক বিষয় নয়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাপানের একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল এক লাখ কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড ইউনূসের ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান ইউনূস সেন্টারে বৈঠক করেন।

যদিও জাপানের মিনিস্ট্র অব ফরেন এফেয়ার্সের ওয়েবসাইটের প্রেস বিবৃতিতে ড ইউনূসের জাপান সফরে আসার ঘোষনা বাদে সফরের বিস্তারিত কোন আলোচনা বা শ্রমিক রপ্তানির চুক্তি সংক্রান্ত কোন বিষয়ের উল্লেখ নেই।

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের ওয়েব সাইটে ২০২৫ সালে ড ইউনূসের সফরসূচী

 

এক লাখ কর্মী নেওয়ার ঘোষণা, ১৭ মাসে ক’জন গেলো?

প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও নিয়োগ পরিকল্পনার কথা জানাল জাপানি প্রতিনিধিদল; কর্মী পাঠানোর নির্দিষ্ট হিসাব প্রকাশের দাবি

টোকিওতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রায় পাঁচ মাস পর, ২০২৫ সালের অক্টোবরে জাপানের ন্যাশনাল বিজনেস সাপোর্ট কম্বাইন্ড কো-অপারেটিভসের (এনবিসিসি) ২৩ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। বৈঠকে প্রতিনিধিদল জানায়, পাঁচ বছরে এক লাখের বেশি দক্ষ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। প্রথম পর্যায়ে ২০২৬ সালে দুই হাজার কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।

কিন্তু ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে ওই সমঝোতা স্মারকের আওতায় কতজন বাংলাদেশি কর্মী বাস্তবে জাপানে পৌঁছেছেন, তার সুস্পষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে এক লাখ কর্মী নিয়োগের ঘোষণা ও বাস্তব অগ্রগতির মধ্যে ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জাপানের প্রতিনিধিদল জানিয়েছিল, নির্মাণ, সেবা, বিমান চলাচল, পোশাক ও কৃষি খাতে কর্মীর চাহিদা রয়েছে। দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য খুলনা ও গাজীপুরের কাপাসিয়ায় দুটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কথাও জানানো হয়। একই সঙ্গে জাপানি ভাষায় দক্ষতা অর্জনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরেও এনবিসিসির প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছে। ওই সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৭ সালে দুই হাজার, ২০২৮ সালে ছয় হাজার এবং ২০২৯ সালে ১৮ হাজার কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। তবে এই সময়সূচি ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঘোষিত প্রথম পর্যায়ের সময়সূচির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। নতুন সময়সূচি কেন প্রয়োজন হলো, প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্য কতটা পূরণ হয়েছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া কোন পর্যায়ে রয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

 

জাপানে শ্রমিকের চাহিদা, বাংলাদেশের সামনে সুযোগ

জাপানে শ্রমিকসংকটের কারণে বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগের সুযোগ বাড়ছে। জাপান ২০২৯ সালের মার্চের মধ্যে ১৬টি খাতে নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী কর্মসূচির আওতায় আট লাখ ২০ হাজার বিদেশি কর্মী নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশ জাপানি ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে জাপানের শ্রমবাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু সমঝোতা স্মারক যথেষ্ট নয়। কর্মীদের ভাষাগত দক্ষতা, পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, জাপানি নিয়োগদাতাদের চাহিদা, পরীক্ষা ও সনদ, ভিসা এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এসব ধাপের অগ্রগতি প্রকাশ না করলে এক লাখ কর্মী নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত, তা মূল্যায়ন করা কঠিন।

 

ঘোষণার সাফল্য নির্ধারিত হবে কর্মী পাঠানোর বাস্তব সংখ্যায়, সমঝোতা স্মারকের সংখ্যায় নয়। জাপানে এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কিন্তু এই সুযোগ বাস্তবে কতটা কাজে লাগছে, তা বোঝাতে প্রশিক্ষণ, নিয়োগ, ভিসা ও কর্মী প্রেরণের পর্যায়ভিত্তিক পরিসংখ্যান প্রকাশ করা জরুরি।

 

Visited 23 times, 2 visit(s) today