❐ আয়নাল কারিগর
আজ অগ্নিকন্যা বেগম মতিয়া চৌধুরীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আলোকিত হয়ে ছিলেন তিনি—যার বর্ণাঢ্য জীবন ছিল সংগ্রাম, আদর্শ এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের মিশ্রণ।
১৯৪২ সালের ৩০শে জুন পিরোজপুরের এক সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এই নারী নেত্রী তার তীব্র বক্তৃতা, সাহসী সংগ্রাম এবং কৃষি সেক্টরে অসামান্য অবদানের জন্য চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। গত বছরের আজকের এদিন- ১৬ই অক্টোবর বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি চির বিদায় নেন। আজ তাঁর স্মৃতিতে রাজনৈতিক মহল, কৃষক সমাজ এবং নারী আন্দোলনের কর্মীরা শোকাহত।
মতিয়া চৌধুরীর জীবন ছিল একটি মহাকাব্য—যেখানে বামপন্থী আদর্শ থেকে আওয়ামী লীগের প্রধান সারথির সঙ্গে যাত্রা, মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা স্মৃতি এবং কৃষিমন্ত্রী হিসেবে দেশের কৃষক মানুষের জীবন গড়ার অসাধারণ সাফল্য মিলেমিশে একাকার হয়ে উঠেছে।
ছাত্রজীবন থেকে ‘অগ্নিকন্যা’র উত্থান
মতিয়া চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছিল ছাত্র আন্দোলনের আগুনে। পিরোজপুরের স্থানীয় স্কুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তিনি ঢাকায় আসেন এইচএসসির জন্য। ইডেন মহিলা কলেজে ভর্তির সঙ্গে সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।
১৯৬০-এর দশকে, পাকিস্তান আমলে যখন ছাত্ররা ভাষা আন্দোলনের ধ্বংসাবশেষ থেকে উঠে আসছিল, তখন মতিয়া চৌধুরীর তীক্ষ্ণ বক্তৃতা এবং অদম্য সাহস তাঁকে ‘অগ্নিকন্যা’র নামে খ্যাতি অর্জন করায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠেন এবং ১৯৬৪ সালে ডাকসুর জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। এই সময় তাঁর বক্তৃতায় ছিল আগুনের ঝলকানি—যা তরুণদের হৃদয় জয় করে নিত। পাকিস্তানি শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ছিল নির্ভীক; বহুবার কারারুদ্ধ হন এবং নির্যাতিত হন।তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা বামপন্থী আদর্শের সঙ্গে জড়িত ছিল।
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এ যোগ দিয়ে তিনি কৃষক-শ্রমিকের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেন।
১৯৭০-এর দশকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁর আদর্শ আরও পরিমার্জিত হয়। ১৯৭৯ সালে আওয়ামী লীগে যোগদানের খবর সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় ছাপা হয়, যা তাঁর স্বামী বজলুর রহমানের সম্পাদিত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই যোগদান ছিল তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট।
আওয়ামী লীগের নারী শাখায় সক্রিয় হয়ে তিনি নারী অধিকার এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে নতুন গতি দেন। তাঁর বক্তৃতায় ছিল সাম্যবাদী চেতনা, কিন্তু তা মিশ্রিত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে। শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্নকে তিনি নিজের আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করেন।
মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিময় অংশগ্রহণ: আদর্শের পরীক্ষা এবং জয়
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল মতিয়া চৌধুরীর জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতার মুখে তিনি সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসেবে তিনি গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচারক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল যুদ্ধের আহ্বান, যা মুক্তিযোদ্ধাদের মনে আগুন জ্বালাত।
পিরোজপুরের স্থানীয় গ্রামাঞ্চলে তিনি গোপন সংগ্রাম চালান, অস্ত্র সংগ্রহ এবং খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করেন। যুদ্ধের সময় তাঁর স্বামী বজলুর রহমানও স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন, যা তাঁদের দম্পতির জীবনকে আরও ঘনিষ্ঠ করে তোলে।
মুক্তিযুদ্ধের পর তাঁর আদর্শ আরও দৃঢ় হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক সীমান্ত নয়, বরং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ার লড়াই। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে ১৯৮০-৯০ এর দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি সামনে ছিলেন।
১৯৯১ সালে শেরপুর-২ আসন থেকে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এরপর ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে ছয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তা প্রমাণ করেন।
তাঁর আদর্শ ছিল সহজ: “রাজনীতি হলো মানুষের জন্য, ক্ষমতার জন্য নয়।” এই আদর্শ তাঁকে সাদামাটা জীবনযাপনের প্রতীক করে তোলে।
কৃষিমন্ত্রী হিসেবে সাফল্য: কৃষকের জীবন গড়ার অসাধারণ অধ্যায়
মতিয়া চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ ছিল কৃষিমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অবদান। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম সরকার গঠনের পর তিনি কৃষিমন্ত্রী হন। এই সময় বাংলাদেশ কৃষি সেক্টরে বড় সংকটের মুখে ছিল—খাদ্য সংকট, বন্যা এবং দারিদ্র্য। মতিয়া চৌধুরী তার অক্লান্ত পরিশ্রমে কৃষকদের জন্য ‘কৃষিতে ভর্তুকি’ প্রকল্প চালু করেন, যা বীজ, সার এবং সেচের খরচ কমিয়ে কৃষকদের উৎপাদন বাড়ান।
১৯৯৬-২০০১ সালে তাঁর নেতৃত্বে ধান উৎপাদন ২৫ মিলিয়ন টন ছাড়িয়ে যায়, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্মূল করে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সরকারে আবার কৃষিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময় তিনি ‘কৃষি বিপ্লব’ এর নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) ফসলের পরীক্ষামূলক চাষ চালু করেন, যা উৎপাদনশীলতা ৩০ শতাংশ বাড়ায়।
২০১৩ সালে তৃতীয়বার মন্ত্রী হিসেবে তিনি ‘ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল পলিসি’ প্রণয়ন করেন, যা কৃষকদের জন্য ঋণ, বীমা এবং বাজার সুবিধা নিশ্চিত করে। তাঁর সরকারে বাংলাদেশ খাদ্য অব্যয়মুক্ত দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
কৃষক নেতা মোহাম্মদ আব্দুল কাদির বলেন, “মতিয়া আপা কৃষকের মা ছিলেন। তাঁর সময়ে আমরা প্রথমবার সেচের জল পাই, সারের দাম কমে।”
তাঁর সফলতা ছিল তাঁর আদর্শের প্রতিফলন—কৃষককে কেন্দ্র করে রাজনীতি। ২০১৪ সালের সরকারেও তিনি মন্ত্রী ছিলেন, কিন্তু ২০১৮ সালে বাদ পড়লেও তাঁর অবদান অমর।
আদর্শের দৃঢ়তা: সংগ্রামী জীবনের মূল স্তম্ভ
মতিয়া চৌধুরীর আদর্শ ছিল সাম্যবাদী এবং নারীমুক্তির স্বপ্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, “নারী ছাড়া বিপ্লব অসম্পূর্ণ।” আওয়ামী লীগের মহিলা শাখায় তাঁর নেতৃত্বে হাজারো নারী রাজনীতিতে যোগ দেন।
২০০১-২০০৬ সালে বিরোধী দল হিসেবে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি প্রমাণ করেন যে, রাজনীতি ক্ষমতার লড়াই নয়, জনগণের সেবা। তাঁর সাদামাটা জীবনযাপন—সাধারণ শাড়ি, গ্রামীণ কৃষকদের সঙ্গে মিশে থাকা—তাঁকে জনগণের কাছে নিয়ে আসে।
বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “মতিয়া চৌধুরী ছিলেন আওয়ামী লীগের মেরুদণ্ড। তাঁর আদর্শ ছিল অটুট, যা তাঁকে কট্টর বিরোধী থেকে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী করে তোলে। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রামের কাহিনি।”
২০২১ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের অবদানের জন্য সম্মানসূচক ফেলোশিপ দেয়। ২০২৩ সালের ১২ই জানুয়ারি থেকে জাতীয় সংসদের উপনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আওয়ামী লীগের ১নং প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে তিনি দলের সাংগঠনিক শক্তি ছিলেন।
অমর অবদান এবং স্মৃতির আলোকে
আজ মতিয়া চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা স্মরণ করছি এক অগ্নিকন্যার যাত্রা—যিনি ছাত্র আন্দোলন থেকে মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ থেকে কৃষি সংস্কার, সবকিছুতে আদর্শের আলো ছড়িয়েছেন। তাঁর সাফল্য ছিল কৃষকের হাসিতে, নারীর সাহসে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় লুকিয়ে আছে।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের এই অধ্যায় আমাদের শেখায়, রাজনীতি হলো মানুষের জন্য সংগ্রাম। মতিয়া চৌধুরী চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ চিরকাল জ্বলবে। জয় বাংলা, জয় মতিয়া।


