২০২৩ সালের প্রদত্ত রায়ের অনুরপে গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দেওয়ার নির্দেশ, ২০২৪ সালে র ৩রা অক্টোবর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে হাইকোর্ট এই রায় প্রত্যাহার করেছিল।
বিশেষ প্রতিবেদক। ঢাকা। ১৩ অক্টোবর, ২০২৬।
গ্রামীণ টেলিকমের কাছ থেকে পাওয়া অর্থকে ‘লভ্যাংশ’ হিসেবে দেখিয়ে সরকারকে ন্যায্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টায় গ্রামীণ কল্যাণ কোনো কমতি রাখেনি বলে পূর্ণাঙ্গ রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে হাইকোর্ট। সোমবার প্রকাশিত রায়ে প্রতিষ্ঠানটির এই কর্মকাণ্ডকে ‘কর ফাঁকি দেওয়ার ধ্রুপদী নজির’ (ক্লাসিক কেস অব ইভেডিং ট্যাক্সেস) বলা হয়েছে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের বেঞ্চ এ রায় দেন। ৩২ ও ১৫ পৃষ্ঠার দুটি রায়ই লিখেছেন বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া। রায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ডিমান্ড নোটিস জারি করে বকেয়া কর আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আগে দেওয়া স্থগিতাদেশও প্রত্যাহার করা হয়েছে।
২০২৪ সালের আওয়ামীলীগ আমলের আদালতের রায়ের প্রতিফল
মামলার ঘটনাক্রম বলছে, নতুন বেঞ্চের সিদ্ধান্ত ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের আগের অবস্থানের সঙ্গে মিলে গেছে। ২০২৪ সালের ৩০ জুলাই বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামানের বেঞ্চ ইঙ্গিত দেয়, ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষের জন্য গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর দিতে হবে। শুনানিতে গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী বছরে ১০০ কোটি টাকা করে কিস্তিতে পরিশোধের প্রস্তাব দিলে আদালত তা নাকচ করে। রাষ্ট্রপক্ষ অন্তত ৫০ শতাংশ একবারে দিয়ে বাকিটা কিস্তিতে পরিশোধের প্রস্তাব রাখে।
পরবর্তী সময়ে হাইকোর্ট গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে রায় দেয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর সেই রায় প্রত্যাহার করা হয় এবং মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। প্রধান বিচারপতি মামলাটি নতুন বেঞ্চে পাঠালে মজিবুর রহমান মিয়ার বেঞ্চ শুনানি শেষে রুল খারিজ করে চূড়ান্ত রায় দেয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গ্রামীণ কল্যাণের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ ওঠে ও দীর্ঘ তদন্ত শেষে ৩১শে মে, ২০২৩ সালে হাইকোর্ট রায় প্রদান করে। করফাকির জন্য ১২ কোটি টাকা জরিমানাও প্রদান করা হয় ড ইউনূসের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। তখন ইউনূসের পক্ষ থেকে এবং পরে তাঁর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এই অভিযোগকে রাজনৈতিক শত্রুতাপ্রসূত বলে দাবি করা হয়েছিল। এ দাবিকে ঘিরে গণমাধ্যমেও আলোচনা হয়।
১৮৩ বিশ্বব্যাক্তিত্বের ইউনূসের পক্ষে লেখা চিঠি ৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৩
২০২৩ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো নিয়ে দেশে-বিদেশে তীব্র আলোচনা হয়। সরকারপক্ষের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন, মামলাটি নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে হয়েছে এবং বিচার স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। তাঁর দাবি, ইউনূসের আইনজীবীরা মামলাগুলোকে মিথ্যা বলে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
অন্যদিকে বিশ্বনেতাদের উদ্বেগ বাড়তে থাকে। ২৮ আগস্ট ২০২৩ প্রায় ১৮৩ জন বিশ্বব্যক্তিত্ব, যাঁদের মধ্যে ১০৪ জন নোবেল বিজয়ী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খোলা চিঠি পাঠান। চিঠিতে তাঁরা ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান আইনি কার্যক্রম স্থগিত করার আহ্বান জানান এবং “ধারাবাহিক বিচারিক হয়রানি” নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সংবাদের লিংকঃ ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান আইনি কার্যক্রম স্থগিত করার আহ্বান এবং “ধারাবাহিক বিচারিক হয়রানি” নিয়ে উদ্বেগ

২০২৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর নিউ এইজ পত্রিকার সংবাদঃ ১০৪ জন নোবেলজয়ীসহ বিশ্বের ১৮৩ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে ইউনূসের বিরুদ্ধে হয়রানি মূলক মামলার কার্যক্রম স্থগিত করার আহ্বান জানান।
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR) বিবৃতিতে বাংলাদেশে মানবাধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের নেতাদের ওপর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে “ভয়ভীতি ও হয়রানি” নিয়ে উদ্বেগ জানায়। বিবৃতিতে ইউনূস এবং অধিকার-এর দুই নেতা আদিলুর রহমান খান ও নাসিরউদ্দিন এলানের নাম উল্লেখ ছিল। জেনেভায় মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি বলেন, ইউনূস প্রায় এক দশক ধরে হয়রানি ও ভয়ভীতির মুখে আছেন। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীদের বাংলাদেশে এসে আইনি প্রক্রিয়া যাচাই করার আমন্ত্রণ জানায়। এ আমন্ত্রণের কথা আগস্ট ২০২৩-এর শেষে হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের বরাতে Daily Ittefaq-এর পরবর্তী প্রতিবেদনেও এসেছে।
ড ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে করফাঁকি মামলার রায় প্রত্যাহার
৩ অক্টোবর ২০২৪ গ্রামীণ কল্যাণের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবি-সংক্রান্ত রায়টি স্ব-প্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার (রিকল) করে হাইকোর্ট। রায় প্রদানকারী ডিভিশন বেঞ্চের একজন বিচারক আইনজীবী থাকাকালে এই মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ কারণেই রায়টি প্রত্যাহার করা হয়েছে। মামলাটি তখন প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হচ্ছে। তিনি নতুন বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেবেন এবং সেখানে মামলাটির ফের শুনানি হবে।
রায় প্রত্যাহার সংবাদের লিংকঃ গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবীর রায় প্রত্যাহার : ফের নতুন বেঞ্চে হবে শুনানি

গ্রামীণ কল্যাণের কাছে ৬৬৬ কোটি টাকা কর দাবীর রায় প্রত্যাহার : ফের নতুন বেঞ্চে হবে শুনানি। বাসস । ০৩ অক্টোবর ২০২৪
গ্রামীণ কল্যাণের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ-আল-মামুন আজ সাংবাদিকদের জানান, রায় প্রদানকারী বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি প্রত্যাহারের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে বেঞ্চের অপর বিচারপতি এই আদালতেই রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। তিনি একসময় সরকারের পক্ষে এই মামলা পরিচালনা করেছেন। তাই ওই বিচারক বেঞ্চে থেকে রায় দিলে তা ত্রুটিপূর্ণ হতো।
এর আগে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর বিচারপতি খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের বেঞ্চ ২০১৭ সালের ১১ নভেম্বরের একটি আদেশ বাতিল করে কিছু পর্যবেক্ষণসহ রুল নিষ্পত্তি করেছিল।
পাঁচ করবর্ষে ৬৬৭ কোটি টাকা কর দাবি
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আব্দুস সামাদ আজাদের তথ্য অনুযায়ী, এই কর ফাঁকির সঙ্গে প্রায় ৬৬৭ কোটি টাকার কর জড়িত।
| করবর্ষ | বকেয়া কর (টাকা) |
|---|---|
| ২০১২-১৩ | ১৮৯ কোটি ২৫ লাখ ২৫ হাজার ৪৬৬ |
| ২০১৩-১৪ | ১৩২ কোটি ৭৭ লাখ ৪৬ হাজার ১২ |
| ২০১৪-১৫ | ১১৪ কোটি ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৭৪ |
| ২০১৫-১৬ | ১১৫ কোটি ২২ লাখ ৯৬ হাজার ৬২৫ |
| ২০১৬-১৭ | ১১৫ কোটি ৬৩ লাখ ১ হাজার ৬৯৩ |
পাঁচ করবর্ষে মোট দাবি ৬৬৬ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৩৭০ টাকা।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার কর অঞ্চল-১৪ দুটি নোটিসে এই কর দাবি করে। কর অফিস গ্রামীণ কল্যাণের সময়ের আবেদন নাকচ করলে এবং রিভিউ আবেদনও খারিজ হলে প্রতিষ্ঠানটি হাইকোর্টে দুটি রিট করে। ওই বছরের ২৬ নভেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করেছিল।
১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ কল্যাণ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ পরিবারের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। ইউনূস এর সাবেক চেয়ারম্যান। রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের কথা ইউনূসের আইনজীবীরা আগেই জানিয়েছেন।
