নিজস্ব প্রতিবেদক
সময় টেলিভিশনের হেড অব নিউজ মুজতবা খন্দকারকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। নারী সাংবাদিকদের হয়রানির অভিযোগসহ বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে সংবাদকর্মীদের মধ্যে তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও প্রতিবাদ চলার মধ্যেই বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় তাকে ছুটিতে পাঠানো হয়। পরে দ্রুতই তাকে টেলিভিশন ভবন ত্যাগ করতে হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে বুধবার দুপুরে মুজতবা খন্দকারের অপসারণের দাবিতে সময় টিভির সংবাদকর্মীরা প্রতিষ্ঠানটির এইচআর-এডমিন বিভাগে গিয়ে প্রতিবাদ জানান। এ সময় নারী সংবাদকর্মীদের বড় একটি অংশও প্রতিবাদে অংশ নেন। বিষয়টি নিয়ে নিউজরুমে দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, মুজতবা খন্দকারের বিরুদ্ধে নারী সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণ ও হয়রানি নিয়ে আগে থেকেই অভিযোগ ও অসন্তোষ ছিল। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে আলোচনা হলেও কর্মীদের একটি অংশ মনে করছিলেন, বিষয়টির যথাযথ সমাধান হয়নি।
মুজতবা খন্দকারকে ঘিরে বিতর্কের শুরু থেকেই নারী সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসে। এর মধ্যে সময় টিভির এক নারী সংবাদকর্মীকে প্রেজেন্টর বানানোর কথা বলে অফিসের বাইরে একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়ার পর তার সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের অভিযোগও রয়েছে।
পূর্বে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই নারী সংবাদকর্মী অভিযোগ করেছিলেন, রেস্টুরেন্টে অবস্থানের সময় মুজতবা খন্দকার তার গায়ে হাত দিয়েছিলেন। বিষয়টি পরে সময় টিভির নিউজরুমে আলোচনায় আসে বলে জানা যায়।
ওই ঘটনার পর অভিযোগকারী নারীকে বিষয়টি নিয়ে চুপ থাকার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগও বিভিন্ন মাধ্যমে উঠে আসে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য প্রকাশ্যে না আসায় ঘটনাগুলোর প্রতিটি দিক স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এরই মধ্যে অভিযোগকারী নারী সাংবাদিকের একটি অডিও বক্তব্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে বলে জানা গেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মুজতবা খন্দকারকে ঘিরে আরেকটি ঘটনা নিয়ে সময় টিভির নিউজরুমে আলোচনা তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২০ সেপ্টেম্বর দুপুরে অন্য একটি টেলিভিশনের এক নারী প্রেজেন্টরকে সময় টিভির ডিজিটাল বিভাগের প্রধান সাদাফের কক্ষে নিয়ে যান মুজতবা খন্দকার। পরে ওই কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকা এবং দীর্ঘ সময় পর দুজনের বেরিয়ে আসাকে কেন্দ্র করে নিউজরুমে আলোচনা শুরু হয়।
সূত্রগুলোর দাবি, তারা আধা ঘণ্টার বেশি সময় ওই কক্ষে ছিলেন। কয়েকবার নক করার পরও প্রথম দিকে দরজা খোলা হয়নি। পরে অফিসের কর্মী ও সিনিয়ররা সেখানে জড়ো হলে তারা কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন বলে অভিযোগ করা হয়।
তবে ওই ঘটনার প্রকৃত কারণ বা সেখানে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে মুজতবা খন্দকার, সংশ্লিষ্ট নারী প্রেজেন্টর কিংবা সময় টিভি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো অভিযোগ ও সূত্রের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
মুজতবা খন্দকারকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসার মধ্যে বুধবার দুপুরে তার অপসারণের দাবিতে সরাসরি প্রতিবাদে নামেন সময় টিভির সংবাদকর্মীরা।
প্রতিবাদকারীরা এইচআর-এডমিন বিভাগে গিয়ে তাদের অভিযোগ ও দাবি জানান। এতে নারী কর্মীদের উল্লেখযোগ্য অংশ অংশ নেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কর্মীদের মধ্যে এমন পরিস্থিতির মধ্যেই খবর আসে, মুজতবা খন্দকার বিকেলে অফিসে আসছেন। তিনি টেলিভিশন ভবনে প্রবেশ করার পর নিউজরুমে ফের উত্তেজনা তৈরি হয়।
সংবাদকর্মীদের একাংশ তার উপস্থিতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
পরে কর্তৃপক্ষ তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্তের পর দ্রুতই তিনি টেলিভিশন ভবন ত্যাগ করেন বলে জানা গেছে।
এদিকে মুজতবা খন্দকারকে ঘিরে পরিস্থিতির মধ্যে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সময় টিভির নারী কর্মীদের ‘পেন ডাউন’ কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নারী কর্মীদের পক্ষ থেকে মুজতবা খন্দকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত ও তার অপসারণের দাবি জানানো হচ্ছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বুধবারের প্রতিবাদের পর বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হলেও আগামী দিনের কর্মসূচি ঘিরে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা নিয়ে কর্মীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
মুজতবা খন্দকারকে ঘিরে নারী সাংবাদিকদের হয়রানির অভিযোগ, নারী প্রেজেন্টরকে নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক এবং সংবাদকর্মীদের অসন্তোষ নিয়ে এর আগেও বিডি ডাইজেস্টসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মুজতবা খন্দকারের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য এবং সময় টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, পেশাগত পরিবেশ এবং নারী সহকর্মীদের অভিযোগের যথাযথ তদন্তের বিষয়টি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
এদিকে মুজতবা খন্দকারকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে ঘিরে সময় টিভির ভেতরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্ট সংবাদকর্মীরা।
