ইউনূস সরকারের বাতিল করা বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো আবার শূন্য থেকে শুরু বিএনপি’র, গত দুইবছরে গ্রিডে যুক্ত হয়নি এক ইউনিট বিদ্যুৎ

ইউনূস সরকারের বাতিল করা বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো আবার শূন্য থেকে শুরু বিএনপি’র, গত দুইবছরে গ্রিডে যুক্ত হয়নি এক ইউনিট বিদ্যুৎ
শেয়ার করুন

আওয়ামী লীগ আমলে অনুমোদিত প্রকল্প বাতিল করেছিল ইউনূস সরকার, এখন নতুন করে ফের শুরু করছে বিএনপি সরকার

বিশেষ প্রতিবেদক

দেশজুড়ে চলমান তীব্র লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে নতুন করে সামনে আসছে একটি পুরোনো সিদ্ধান্তের প্রসঙ্গ—২০২৪ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ আমলে অনুমোদিত কয়েক হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাতিল করেছিল। বর্তমান বিএনপি সরকার এখন সেই প্রকল্পগুলো নতুন করে চালুর উদ্যোগ নিলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে এর সুফল পেতে অন্তত আরও তিন থেকে চার বছর অপেক্ষা করতে হবে।

 

যা বাতিল হয়েছিল

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪ সালের শেষদিকে অনুমোদিত অন্তত ৩৭টি সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে দেয় ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। প্রকল্পগুলো মূলত ২০১০ সালের ‘দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ (বিশেষ বিধান) আইন’-এর আওতায় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ৫ হাজার ৬৮১ মেগাওয়াট, এবং বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার। এসব প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও সংশ্লিষ্টতা সবচেয়ে বেশি ছিল, এবং সিঙ্গাপুরসহ ১৪-১৫টি দেশের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ছিল।

আলাদা একটি সরকারি হিসাব অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার মোট ৩৯টি বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন বাতিলের উদ্যোগ নেয়, যার মধ্যে ৩৪টি সৌরবিদ্যুৎ ও বাকি ৫টি গ্যাসভিত্তিক ছিল। শুধু সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকেই প্রায় ২ হাজার ৬৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা ছিল, যাতে আনুমানিক বিনিয়োগ ধরা হয়েছিল ২৪০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, অর্থাৎ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় এক মাসের মাথায়, এই প্রকল্পগুলোর লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) বাতিল করা হয়েছিল।

তৎকালীন সরকারের যুক্তি ছিল, আওয়ামী লীগ আমলে ২০১০ সালের ‘কুইক এনার্জি সাপ্লাই (স্পেশাল প্রভিশন) অ্যাক্ট’-এর অধীনে অনুমোদিত এসব প্রকল্প প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই দেওয়া হয়েছিল। আইনি দিক থেকেও এই আইনের কিছু বিধান আদালত ইতিমধ্যে অবৈধ ঘোষণা করেছিল বলে জানা যায়।

 

শূন্য থেকে আবার শুরু: বিএনপি সরকারের নতুন উদ্যোগ

চলতি বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশ-চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ফোরামে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাতিল হওয়া প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের এলওআই নতুন করে খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেগুলো যোগ্যতার ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।

 

মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে প্রক্রিয়াটি কার্যত শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে। তার ভাষায়, তিনি এসব প্রকল্পের এলওআই নতুন করে খুলছেন, যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়নের পর যেগুলো টেকসই মনে হবে সেগুলো রাখা হবে, এবং কী কারণে ও কোন ভিত্তিতে প্রকল্পগুলো বাতিল করা হয়েছিল তা মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী আট থেকে দশ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

 

মন্ত্রী আরও জানান, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ৩৭টি এলওআই বাতিল করার ফলে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বলেও তিনি জানান, যদিও স্বীকার করেন যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে দ্রুত শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির কারণে তাদের সামনে দ্রুততার সঙ্গে এগোনো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।

একই অনুষ্ঠানে বিডা চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানান, শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলকে প্রধান কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।

তিন-চার বছরের জন্য পিছিয়ে গেলো বিদ্যুৎ খাত, চাহিদা বাড়ছে হু হু করে

সরকার আপাতত ৩১টি প্রকল্প পুনর্মূল্যায়নের কথা বললেও, বাস্তবতা হলো—কোনো বিদ্যুৎ প্রকল্প অনুমোদন থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যন্ত পৌঁছাতে জমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, নির্মাণ ও গ্রিড সংযোগের মতো একাধিক ধাপ পেরোতে হয়, যাতে সাধারণত কয়েক বছর সময় লাগে।

২০২৪ সালে বাতিল করা প্রকল্পগুলো যদি পরিকল্পনামতো এগোতো, তাহলে ২০২৫-২৬ সাল নাগাদ এর একটি বড় অংশ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।

 

কিন্তু বাতিলের পর নতুন করে এলওআই পুনর্মূল্যায়ন, দরপত্র প্রক্রিয়া ও নির্মাণ কাজ শুরু হলে বাস্তবে এই সক্ষমতা গ্রিডে যুক্ত হতে ২০২৯-৩০ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।

এর মধ্যেই দেশ জুড়ে চলছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং—কোথাও ১০ ঘণ্টা, কোথাও আবার ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে উৎপাদন খরচ, কৃষক পড়ছেন সেচ সংকটে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামমাত্র উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও গ্যাস, কয়লা ও এলএনজি সরবরাহে টানাপোড়েনের কারণে সেই সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

একটি পুনরাবৃত্ত প্যাটার্ন

এই ঘটনাক্রম বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে একটি পুনরাবৃত্ত সমস্যাকে সামনে আনে—এক সরকারের নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি প্রকল্প পরবর্তী সরকার এসে বাতিল করে দেয়, এবং নতুন সরকার আবার নতুন করে একই ধরনের প্রকল্প শুরু করে বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ করে। বিদ্যুৎকেন্দ্র বা সঞ্চালন লাইনের আয়ুষ্কাল কয়েক দশক হলেও, নীতিগত সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব প্রতিবারই প্রকল্প বাস্তবায়নে বছরের পর বছর বিলম্ব ঘটাচ্ছে বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ।

প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—২০২৪ সালে অনিয়মের অভিযোগে প্রকল্পগুলো বাতিল না করে যদি যাচাই-বাছাই করে এগিয়ে নেওয়া যেত, তাহলে আজকের এই সংকটের মাত্রা কি কিছুটা হলেও কম হতো না?

 

Visited 1 times, 1 visit(s) today