-আজম খান
ব্লগার ও রাজনীতি বিশ্লেষক
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হবার পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও জ্বালানি সংকট হয়েছিল। ফারাক হচ্ছে সেই সরকার এই সমস্যা যে হতে পারে সেটা উপলব্ধি করেছিল এবং সমস্যা সমাধানে তড়িৎ, কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছিল।
শুধু এক উপায়ের উপরে নির্ভর না করে কয়েকটি কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল।
১. বেশি LNG আমদানীঃ
২০২২ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে LNG গ্যাস এর দাম এত বেড়ে যায় যে আওয়ামী লীগ সরকার এলএনজি আমদানি বন্ধ করে দেয় স্পট মার্কেট থেকে। ফলে ২০২২ সালের জুলাই থেকে ৭ মাসের জন্য স্পট মার্কেট থেকে কোন এলএনজি কেনা হয় নাই।
২০২৩ এর শুরুতে LNG গ্যাস এর দাম পড়ে যায়। তারপরে সরকার হুড়োহুড়ি করে কম দামে ব্যাপক হারে গ্যাস কেনা শুরু করে। শুরু হয় গরমকালের জন্য প্রস্তুতি। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ সরকার গরম আসার আগেই LNG procurement বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। একই কৌশল অবলম্বন তারা ২০২৪ এর শুরুতেও করেছিল। যার সুফল পেয়েছিল ইউনুস সরকার। ২০২৪-২৫ এর গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ এর সমস্যা সহনশীল ছিল।
২. গ্যাসে পূরন না হলে তেলভিত্তিক Power Plant
গ্যাসের পাশাপাশি ব্যাকাপ হিসাবে ছিল তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার প্ল্যান্টগুলো। গ্যাস কম থাকলে এগুলো দিয়ে বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে নেয়া হয়েছে। গ্যাসের তুলনায় তেলের খরচ অনেক বেশি হওয়াতে সরকারকে প্রচুর ভর্তুকি দিতে হয়েছে।
৩. কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র
গ্যাস নির্ভরতা কমিয়ে স্বস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার পায়রা, রামপাল সহ কয়েকটা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র ন্যাশনাল গ্রিডে যোগ করে।
এছাড়া সরকার ভারত থেকে বিদ্যুতের প্রায় নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ তো ছিলই।
এই সময়ে এসে সমস্যা হয়েছে ইউনুস এবং বিএনপি-জামাত-সেনাবাহিনীর সরকার ঠিক যেখানে আওয়ামী লীগ সফল ছিল সেখানে ব্যার্থ হয়েছে।
গ্রীষ্মকালে যে বিদ্যুৎ এর চাহিদা বাড়বে এবং এজন্য এলএনজি, তেল, কয়লা কিনে রাখতে হবে পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে তা এ সরকারের হিসাবেই ছিল না।
তারা হানিমুন পিরিওড গায়ে বাতাস লাগিয়ে পার করেছেন। তারেক রহমান সহ সবাই লোক দেখানো কাজ, চটুল কথাবার্তায় ব্যাস্ত ছিলেন।
ফলাফলে মধ্যপ্রাচ্যে একটা যুদ্ধ চললেও এটা যে ইউক্রেন যুদ্ধের মতই জ্বালানি সংকট তৈরি করতে পারে তা তারা আমলে নেন নাই।
একইভাবে পর্যাপ্ত কয়লা কেনা হয় নাই কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য।
ফলাফলে দেশে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ দরকার তা উৎপাদনের সামর্থ্য থাকলেও মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না।
তবে আওয়ামী লীগের আমলে অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হলেও এর একটা দূর্বলতা ছিল জ্বালানি খাত আমদানি নির্ভর হয়ে পড়ায়।
এই পার্টটুকুর জন্য আমাকে একজন ভূ-বিজ্ঞানীর আশ্রয় নিতে হয়েছে। টেকনিক্যাল তথ্যের জন্য তার কাছে কৃতজ্ঞতা।
আওয়ামী লীগ সরকার দেশে দ্রুত শিল্পায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। শিল্পখাত জ্বালানী এবং বিদ্যুৎ ছাড়া অচল। এছাড়া মানুষের জীবনমানের উন্নতির সাথেও বিদ্যুৎ কনজাম্পশনের সরাসরি ভূমিকা আছে।
অসংখ্য গবেষনা আছে যেখানে দেখা গেছে যেসব দেশের মাথাপিছু বিদ্যুৎ কনজাম্পশন বেশি তারা তত উন্নত। এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার বাড়ার সাথেও একটা দেশের ক্রমাগত উন্নতির সরাসরি সম্পর্ক আছে।
এই বিষয়টা উপলব্ধি করে আওয়ামী লীগ সরকার যত দ্রুত সম্ভব বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয়। এখানে কুইক রেন্টাল প্ল্যান্ট নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে অতি দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকারের হাতে এর চাইতে ভালো সমাধান ছিল না।
আবার যারা বিরোধিতা করেছেন তারাও বলতে পারেন নাই এত স্বল্প সময়ে আর কোন বিকল্প ব্যাবস্থা থেকে এত দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
সেই সাথে আওয়ামী লীগের দেশের জ্বালানি খাত থেকে আমদানি নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগও ছিল।
এখানে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে মাটির তল থেকে তেল-গ্যাস উৎপাদন কারিগরি দিক থেকে খুব জটিল এবং স্পর্শকাতর একটা ব্যাপার।
নুন থেকে চুল খসলে বড় দূর্ঘটনা ঘটতে পারে। এটা এমন না যে পাইপ আর নলকূপ বসিয়ে দুটো চাপ দিলাম পানি পড়া শুরু হলো।
এই তেল উত্তোলনে জরিপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মাইনিং, এবং সর্বশেষ উত্তোলনের জন্য অবকাঠামো তৈরি করা বছর নয়, দশকের কাজ। বিশেষত যদি এ কাজে কোন দেশের অভিজ্ঞতা না থাকে বা কম থাকে।
আওয়ামী লীগ যে যে উদ্যোগ এই ক্ষেত্রে নিয়েছিল—
১. BAPEX-এর drilling capacity বাড়ানো হয়েছিল
সরকার BAPEX-এর জন্য নতুন drilling rig ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করেছিল। ২০২২ সালের সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০০৯-এর পর BAPEX-এর technical capacity বাড়াতে ৪টি drilling rig সংগ্রহ করা হয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২১ পর্যন্ত BAPEX/Petrobangla-এর অধীনে ১৯টি exploration, ৫০টি development এবং ৩৯টি workover well করা হয়েছিল।
একই সময়ে BAPEX সুন্দালপুর, শ্রীকালী, রুপগঞ্জ , উত্তর ভোলা এবং জাকিগঞ্জ—এই পাঁচটি নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছিল।
২. Seismic survey করা হয়েছিল
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শুধু কূপ খুঁড়লেই exploration হয় না। আগে seismic survey করে underground geological structure সম্পর্কে ধারণা নিতে হয়।
সরকারি নথি অনুযায়ী BAPEX Blocks 7 ও 9-এ 2D seismic survey করেছে এবং offshore exploration-এর জন্যও seismic data acquisition-এর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এমনকি BAPEX-এর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় 11,000 line-km 2D seismic এবং 3,500 sq km 3D seismic survey করার কথা ছিল।
৩. সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের উদ্যোগ
এখানেও আওয়ামী লীগ সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল।
Bangladesh Offshore Model PSC 2019 তৈরি করে বিদেশি কোম্পানিকে offshore oil/gas exploration-এ আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে।
পরে Offshore Model PSC 2023 করা হয় এবং ২০২৪ সালে ২৪টি offshore block—৯টি shallow-water এবং ১৫টি deep-water block—আন্তর্জাতিক bidding-এর জন্য দেওয়া হয়।
২০১২-২০১৩ সালে Bangladesh gas fields company ltd (BGFCL) মাধ্যমে বাপেক্স তিতাস গ্যাস ফিল্ডে ৩৩০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক জরিপ কাজ সম্পন্ন করে ১১ টি কূপের নতুন কূপ খনন করার লোকেশন প্রদান করে তন্মধ্যে ৮ টি কূপ ২০১৮ সালে মধ্যে সম্পন্ন হয় মোট প্রায় ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করা হয় এবং একই সময়ে একই প্রকল্পের আওতায় বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ডে ২১০ বর্গকিলোমিটার ৩-ডি সাইসমিক জরিপ সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে তিতাস ফিল্ডে জরিপকৃত ৩ডি সাইসমিক ফলাফল আধুনিক পদ্ধতিতে চায়না কোম্পানি দিয়ে ২০২২ review করার পর আরও ১৬ টি কূপ খনন করার প্রস্তাব করে যার মধ্যে ইতিমধ্যে ১টি কূপ খনন করা হয়েছে প্রতিদিন ১২ মিলিয়ন গ্যাস জাতীয় গ্রীডে সরবরাহ করা হচ্ছে এবং এ ফলাফল এর ভিত্তিতে তিতাস ফিল্ডে ১টি গভীর কূপ খনন (৫৬০০ মিটার) বর্তমানে চলমান রয়েছে।
সর্বশেষ, ৫ মার্চ ২০২৪-এ রয়টার্সের এক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় বাংলাদেশের গ্যাস রিজার্ভে কমছিল এবং নতুন বড় আবিষ্কার না হলে রিজার্ভ ২০৩৩ সালের মধ্যে শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই সে সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৫–২৮ সময়ে ১০০টি নতুন গ্যাস কূপ খনন করার উদ্যোগ গ্রহন করেছিল।
তবে শেষ পর্যন্ত দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেয়া উদ্যোগগুলো চালু থাকার সম্ভাবনা কম।
কারন আমরা ইতিমধ্যে বিশ্ব মুরুব্বির সাথে এক চুক্তি করে বসে আছি। আমাদের হয়তো বেশি দামে তাদের কোম্পানিগুলো থেকে এলএনজি কিনে যেতে হবে।
