সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বারবার তথ্য ফাঁসের পুরোনো প্রশ্ন—দেশের সাইবার নিরাপত্তা কতটা ঠুনকো?
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের অন্যতম শীর্ষ চাকরির প্ল্যাটফর্ম বিডিজবস থেকে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি চাকরিপ্রার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য ও সিভি হাতিয়ে নেওয়ার দাবি করেছে একটি হ্যাকার গোষ্ঠী। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের সার্ভার থেকে তথ্য ফাঁসের এই দাবি অস্বীকার করলেও, ঘটনাটি নতুন করে সামনে এনেছে একটি পুরোনো ও উদ্বেগজনক প্রশ্ন—বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো কতটা প্রস্তুত।
যা ঘটেছে
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে ‘ডার্ক ফোরামস ডট আর ইউ’ নামের একটি ওয়েবসাইটে ‘ম্যাডর্যাক্স’ পরিচয়ধারী হ্যাকার গোষ্ঠী এ সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে। পোস্টে তারা দাবি করে, তাদের কাছে বিডিজবসের ডেটাবেজ থেকে নেওয়া লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীর সিভি রয়েছে, যাতে নাম, ফোন নম্বর, ঠিকানা, ইমেইল, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দাবির সপক্ষে হ্যাকাররা ১৪৮টি সিভির নমুনা প্রকাশ করে, যেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে বেশির ভাগই ২০১১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে হালনাগাদ করা পুরোনো তথ্য।
বিডিজবস কর্তৃপক্ষ দাবিটি অস্বীকার করে জানিয়েছে, নিবন্ধিত নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের তথ্য দেখতে পারে, তবে শুধু নিজেদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রয়োজনে। কোনো নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান তা তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।

এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এনআইডি ফাঁসের দীর্ঘ ইতিহাস
বিডিজবসের ঘটনাটিই সাইবার সিকিউরিটির দুর্বলতার একমাত্র ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সার্ভার থেকে নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)-সংক্রান্ত তথ্য ফাঁস হওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে, যা প্রশ্ন তোলে দেশের সামগ্রিক তথ্য-সুরক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
- ২০২৩ সালের জুলাই: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চ এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশের একটি সরকারি সংস্থার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে লাখ লাখ নাগরিকের নাম, ফোন নম্বর, ইমেইল ঠিকানা ও জাতীয় পরিচিতি নম্বর ফাঁস হয়েছে। এ নিয়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির সতর্ক করে বলেছিলেন, এমন তথ্য ফাঁসের কারণে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয়ই পরিচয় চুরির (আইডেন্টিটি থেফট) ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে নির্বাচন কমিশনের সিস্টেম ম্যানেজার তখন দাবি করেছিলেন যে, এনআইডির মূল সার্ভার হ্যাক হয়নি, বরং সেবা নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্ভার হ্যাক হয়ে থাকতে পারে।
- ২০২৩ সালের অক্টোবর: টেলিগ্রাম চ্যানেলে ফাঁস হওয়া এনআইডি তথ্য পাওয়া যাওয়ার পর ইসি জানায়, এনআইডি সার্ভারে অ্যাক্সেস থাকা ১৭৪টি সংস্থার মধ্যে যেকোনো একটির মাধ্যমে এই তথ্য ফাঁস হয়ে থাকতে পারে, যদিও নির্দিষ্ট সংস্থার নাম প্রকাশ করা হয়নি। তখন জানা যায় যে এনআইডি সার্ভারে সাড়ে ১২ কোটি নাগরিকের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে।
- ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি: নির্বাচন কমিশনের সচিব জানান, যাচাইয়ের সুযোগপ্রাপ্ত অন্তত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান থেকে এনআইডির তথ্য ফাঁস হয়েছে এবং কীভাবে তা ঘটেছে তা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে। তিনি এও বলেন যে এটি ইচ্ছাকৃত নাকি অসতর্কতাবশত হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
- ২০২৫ সালের মে: এনআইডি ফাঁসের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ার পর নির্বাচন কমিশন আনসার-ভিডিপি বাহিনী ও ব্র্যাক ব্যাংকের তথ্য যাচাই সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। সংস্থাটির এক কর্মকর্তা জানান, নিয়মিত মনিটরিংয়ে এই দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে ডেটা লিকের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
লক্ষনীয় প্যাটার্নটি
এই ঘটনাগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে: প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল সরকারি ডেটাবেজ নিজে সরাসরি হ্যাক হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে; বরং যেসব তৃতীয় পক্ষ প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা) সেই তথ্যে অ্যাক্সেস পায়, তাদের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই তথ্য বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। বিডিজবসের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি একই যুক্তি দিয়েছে—নিবন্ধিত নিয়োগকারীদের অ্যাকাউন্ট থেকে তথ্য বেহাত হতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই প্যাটার্ন বাংলাদেশের সামগ্রিক ডিজিটাল অবকাঠামোর একটি কাঠামোগত দুর্বলতা তুলে ধরে:
- থার্ড-পার্টি ঝুঁকি: একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজে (এনআইডি, বিডিজবস) শত শত বা হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানকে অ্যাক্সেস দেওয়া হলে, প্রতিটি সংযোগ একটি সম্ভাব্য দুর্বল পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়।
- জবাবদিহিতার ঘাটতি: কোন নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে ফাঁস হয়েছে তা শনাক্ত করতে দীর্ঘ সময় লাগে, এবং প্রায়ই তা প্রকাশ্যে জানানো হয় না।
- পুরোনো তথ্যও ঝুঁকিপূর্ণ: বিডিজবস ঘটনায় যেমন দেখা গেছে, ২০১১-১৭ সালের পুরোনো সিভিও ফিশিং, প্রতারণা বা পরিচয় চুরির জন্য ব্যবহারযোগ্য—তথ্য পুরোনো হলেই তা নিরাপদ, এমন ধারণা ভুল।
- তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে না আসা: ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত একাধিক ফাঁসের ঘটনায় তদন্ত শুরুর কথা বলা হলেও, নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল বা দায় নির্ধারণ প্রকাশ্যে আসেনি বলেই সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যাচ্ছে।
এখনো অমীমাংসিত প্রশ্ন
বিডিজবস-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক দাবির ক্ষেত্রে এখনো স্পষ্ট নয়:
- তথ্যভাণ্ডারটি সত্যিই বিডিজবসের মূল সার্ভার থেকে চুরি হয়েছে, নাকি কোনো নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ফাঁস হয়েছে
- দাবিকৃত ৬০ লাখ রেকর্ডের পুরোটাই বাস্তব কিনা, নাকি শুধু প্রকাশিত ১৪৮টি নমুনাই প্রকৃত অস্তিত্বশীল
- “ম্যাডর্যাক্স” নামের হ্যাকার গোষ্ঠীর প্রকৃত পরিচয় বা কার্যক্রমের ইতিহাস
সরকারি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা বা বিডিজবসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশ পেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা প্রয়োজন হবে।
