জ্বালানি খাতে সিন্ডিকেট সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ, সংকট ‘কৃত্রিম’ বলছেন সমালোচকরা
বিশেষ প্রতিবেদক
দেশজুড়ে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে—বাসাবাড়ির চুলা জ্বলছে না, সিএনজি স্টেশনে লাইন কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত লম্বা হচ্ছে, লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন। অথচ পত্রপত্রিকায় প্রায় প্রতিদিনই এলএনজি কার্গো ক্রয়ের খবর প্রকাশিত হচ্ছে।
এই বৈপরীত্যের মধ্যেই জানা যাচ্ছে, দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল—এক্সিলারেট এনার্জি ও সামিটের টার্মিনাল—গত ছয় দিন ধরে খালি পড়ে আছে। কোনো এলএনজিবাহী জাহাজ ভিড়েনি সেখানে। এই সময়ে টার্মিনাল দুটির ভাড়া বাবদ সরকারকে প্রতিদিন প্রায় ৬ কোটি টাকা গুনতে হচ্ছে।
একই সময়ে এলএনজি কার্গো ক্রয় প্রক্রিয়ায় বড় অঙ্কের কমিশন লেনদেনের তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন সুত্র থেকে

২০২৪ সালের পর কেন হঠাৎ এই পরিবর্তন?
পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন—২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও দুই বছরের মাথায় হঠাৎ কেন এমন সংকট তৈরি হলো। সমালোচকদের একাংশের ধারণা, এই সংকট মূলত কৃত্রিমভাবে তৈরি এবং বর্তমান সরকারের ব্যর্থতার প্রতিফলন।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ‘হাওয়া ভবন’-কেন্দ্রিক সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্তদের একাংশ বর্তমান সরকার গঠনের পর ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লন্ডন-ফেরত একদল ব্যবসায়ী-পরিচয়ধারী ব্যক্তি। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রথমে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে, পরে সেই সংকট মোকাবিলার নামে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে কার্যাদেশ পাইয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
এলএনজি সরবরাহকারী তালিকায় রদবদল
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ি, বাংলাদেশ পেট্রোবাংলার অঙ্গ প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) আগে তালিকাভুক্ত ১৭টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এলএনজি সংগ্রহ করত। বর্তমান সরকার গঠনের পর পূর্বতন তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জায়গায় নতুন কিছু পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে ঢোকানো হয়েছে।
এলএনজি দামের আকাশপাতাল ব্যবধান
পূর্ববর্তী আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ওমানের সঙ্গে একটি এবং কাতারের সঙ্গে দুটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করা হতো। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ড ইউনূসের বন্ধু পিটার হাসের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং বর্তমানে বিএনপি সরকারের স্পট মার্কেট থেকে আগের তুলনায় বহুগুণ বেশি দামে এলএনজি কেনা হচ্ছে। ২০২৪ সালে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম ছিল প্রায় ১২ ডলার, যা এখন বেড়ে প্রায় ২৪ ডলারে পৌঁছেছে।
জ্বালানী সিন্ডিকেটের হোতা হিসাবে যাদের নাম উঠে আসছে
জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে যাদের নাম আলোচনায় আসছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন জ্বালানি মন্ত্রীর ছেলে আবিদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদের ছেলে সাঈদ এবং মন্ত্রী টুকুর দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সহযোগী এফ কে মো. এমদাদ খান রিংকু। অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, চলতি আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে একটি এলএনজি ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর ব্যবসায়ী এমদাদ খান রিংকু জ্বালানি মন্ত্রীর ছেলে আবিদের কাছে প্রায় ১৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পৌঁছে দিয়েছেন। মালয়শিয়াতে এই লেনদেন মধ্যস্থতা করা হয়েছে বখতিয়ার নামে এক ব্রোকারে মাধ্যমে।
জ্বালানি তেল আমদানিতেও একই ধরনের সিন্ডিকেট সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সুত্র বলছে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তেল আমদানিতে আন্দালিব রহমান পার্থ তার ছোট ভাই শান্তকে যুক্ত করেছেন।
২০০১-০৬ মেয়াদের হাওয়া ভবন-সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের যেসব ব্যক্তি নাইকো-সংক্রান্ত ঘুষ কেলেঙ্কারিতে জড়িত ছিলেন বলে তখন অভিযোগ উঠেছিল, তাদের একাংশও এখন জ্বালানি খাতে সক্রিয় হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে—এই তালিকায় নাম আসছে গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, বাবুল কাজী, মঈন হাসান ও গোর্কীর মতো ব্যক্তিদের।
উদ্বেগ: জ্বালানী খাতের বেসরকারিকরণ
সমালোচকদের আশঙ্কা, এই তৎপরতার লক্ষ্য শুধু ক্রয়াদেশ নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং পুরো জ্বালানি খাতকে ধীরে ধীরে বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা। বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা বেসরকারিকরণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে, এবং একচেটিয়াভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা জ্বালানি আমদানি ও বিপণন খাতও কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা চলছে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—ভবিষ্যতে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহ নীতি নির্ধারণ করবে কে: গুটিকয়েক করপোরেট গোষ্ঠী, নাকি জনস্বার্থ। তাদের মতে, এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রকাশ জরুরি।
