লন্ডন প্রতিনিধি
লন্ডন, ২৩মে ২০২৬: যুক্তরাজ্যের সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতন ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। ২১ মে লন্ডনে “মিডিয়া ফ্রিডম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি” শীর্ষক সংলাপে বক্তারা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে মিডিয়া দমন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বক্তারা আটক সাংবাদিকদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে অবিলম্বে তাদের মুক্তির দাবি জানান। তারা বলেন, ২০২৪ সালের অস্থিরতার পর গ্রেপ্তারকৃত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে।
কী বললেন বক্তারা?
সংলাপের মূল বক্তা, বিবিসির সাবেক সিনিয়র সাংবাদিক এবং কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত উইলিয়াম হর্সলি বলেন,
“শ্যামল দত্ত, মোজাম্মেল হক বাবু, ফারজানা রূপা এবং শাকিল আহমেদের মতো সম্মানিত সাংবাদিকদের ১৮ মাস ধরে আটকে রাখা এবং মিথ্যা অভিযোগে তাদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তাদের মুক্তি না দেওয়া এবং অভিযোগ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত সরকারকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে জিম্মি করার এবং ফেব্রুয়ারি ২০২৫ নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগের মুখোমুখি হতে হবে।”
বিবিসির সাবেক সাউথ এশিয়া প্রধান এবং কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের (ইউকে) নির্বাহী সদস্য রিতা পেইন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ইউনুসের সমালোচনা করে বলেন, তিনি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছেন।
ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর মিডিয়া আইন, আইনি ব্যাখ্যা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন,
সাংবাদিকদের আটক রাখা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বিরোধী মত, স্বাধীন চিন্তা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতাকে দমন করার পদ্ধতিগত প্রচেষ্টার অংশ। আইনের শাসন ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না করলে সরকার পরিবর্তন হলেও এই দমন চলতে থাকবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
কমনওয়েলথ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সৈয়দ বদরুল আহসান বলেন,
২০২৪-এর অস্থিরতার পর বাংলাদেশকে “অবৈধ শাসন” চালিত করেছে যা দেশের ঐক্যের প্রতীকগুলো ধ্বংস করেছে। তিনি বাংলাদেশের সাংবাদিক সংগঠনের বর্তমান নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেন, তারা আটক সহকর্মীদের মুক্তির দাবিতে কোনো ভূমিকা রাখছেন না।
জনমত সম্পাদক ও সিজেএ ভাইস প্রেসিডেন্ট নাহাস পাশা সকল আটক সাংবাদিকের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন। নিউইয়র্ক থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার সাংবাদিকদের পেশাগত অ্যাক্রেডিটেশন কেড়ে নিয়েছে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়েছে।
সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল অস্ট্রেলিয়া থেকে ভার্চুয়ালি যোগ দেওয়া শ্যামল দত্তের মেয়ে শুষ্মা শশী দত্তের বক্তব্য। তিনি বলেন, তার বাবাকে শৈশবের আদর্শ থেকে নির্যাতিত বন্দিতে পরিণত করা হয়েছে। ৬০০ দিনের বেশি সময় ধরে বিচার ছাড়া আটক রাখা হয়েছে। তার জীবনঘাতী স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হচ্ছে না। এই নির্যাতন শুধু পেশাগত নয়, পুরো পরিবারের মানসিক ও সামাজিক জীবনকে ধ্বংস করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
লন্ডন-বাংলা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আকরামুল হোসেন বলেন, বাংলাদেশে সাংবাদিকরা বছরের পর বছর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও বর্তমান পরিস্থিতি আরও জটিল ও উদ্বেগজনক। কর্তব্য পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে।
প্রটেক্ট বাংলাদেশের লিড অ্যাডভাইজার ও সাবেক মন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী ধন্যবাদসূচক বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ সরকারকে গণতন্ত্রের প্রতি আন্তরিকতা প্রমাণ করতে হলে এসব দাবি মেনে নিতে হবে।অনুষ্ঠানের আয়োজক ও উপস্থিত ব্যক্তিরাপ্রটেক্ট বাংলাদেশ এই সংলাপের আয়োজন করে। সহযোগিতায় ছিল লন্ডনের টেলিভিশন চ্যানেল আইমিডিয়া ও ব্রিজ বাংলা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিনিয়র সাংবাদিক ও বাংলাদেশ হাইকমিশনের সাবেক প্রেস মন্ত্রী আশেকুন নবী চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নিউ ডন ইনিশিয়েটিভের সভাপতি মুহাম্মদ হারমুজ আলী, ব্যারিস্টার মাসুদ আক্তার, রবিন পল, সৈয়দ এনাম, সৈয়দ এহসানসহ ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি ও অন্যান্য ডায়াসপোরা প্রতিনিধি, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী এবং মানবাধিকারকর্মীরা।
অংশগ্রহণকারীরা প্রটেক্ট বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অবনতি নিয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরির আহ্বান জানান।
Visited 5 times, 1 visit(s) today
