শুধু জ্বালানি তেল ক্রয়ে ইউনূস-তারেক সরকারের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অতিরিক্ত ব্যয় ৫.৪৯ বিলিয়ন ডলার

শুধু জ্বালানি তেল ক্রয়ে ইউনূস-তারেক সরকারের ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অতিরিক্ত ব্যয় ৫.৪৯ বিলিয়ন ডলার
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


জ্বালানি তেল আমদানিতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিল গুনতে হয়েছে বাংলাদেশকে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (জুলাই ২০২৫–জুন ২০২৬) শুধু অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতেই দেশের ব্যয় হয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার—যা এই খাতে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১০ বিলিয়ন ডলারের গণ্ডি অতিক্রম করল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই ব্যয়বহুল অর্থবছরের প্রায় পুরোটা সময়জুড়েই দেশ পরিচালিত হয়েছে দুই ধাপে গঠিত সরকারের অধীনে। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্বে ছিল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার, আর নির্বাচনের পর ওই দিন থেকে দায়িত্ব নেয় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার। ফলে অর্থবছরের প্রথমার্ধের জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের দায় ইউনূস সরকারের এবং শেষের কয়েক মাসের দায় তারেক রহমানের সরকারের ওপর বর্তায়—দুই সরকার মিলিয়েই এই রেকর্ড অঙ্কের বিল তৈরি হয়েছে।

এক বছরেই ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, এর ঠিক আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল ৫ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার। এক বছরের ব্যবধানে সেই ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে—অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৫ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার, শতাংশের হিসাবে যা প্রায় ১০৭ শতাংশ বৃদ্ধি।

শুধু পরিশোধিত জ্বালানি তেল (রিফাইনড পেট্রোলিয়াম পণ্য) আমদানিতেই খরচ হয়েছে প্রায় ৯৪৪ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১০৯ শতাংশ বেশি এবং এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বাড়তি ব্যয়ের প্রধান কারণ আমদানির পরিমাণ বাড়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়া। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ে।

কী পরিমাণ জ্বালানি তেল কেনা হয়েছে

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে গড়ে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত (ক্রুড) তেল এবং বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত জ্বালানি তেল।

অপরিশোধিত তেল:

প্রধানত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন আমদানি হয় দুই গ্রেডে—এরাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল (এএলসি) ও মারবান ক্রুড। এই তেল চট্টগ্রামের একমাত্র রাষ্ট্রীয় শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধিত হয়ে ডিজেল, পেট্রোল-অকটেন ও ফার্নেস অয়েলে রূপান্তরিত হয়।

যদিও এই অত্থবছরের শেষ ৩-৪ মাস ক্রুড ওয়েলের ওভাবে ইস্টার্ন রিফাইনারি বন্ধ ছিল, অর্থাৎ গত অর্থ বছরে ১২ লাখ টন ক্রুড ওয়েল আমদানি করা হয়েছে।

পরিশোধিত জ্বালানি তেল:

সরকার-টু-সরকার (জি টু জি) চুক্তির আওতায় থাইল্যান্ডের ওকিউটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইএনওসি, চীনের পেট্রোচায়না ও ইউনিপেক, ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি এবং ভারতের আইওসিএল—এই ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, পেট্রোল-অকটেন, জেট ফুয়েল ও বেস অয়েল আমদানি করা হয়।

যেমন, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে একই ধরনের চুক্তিতে ১২ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন বিভিন্ন গ্রেডের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে, আর জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ সময়ের জন্য নতুন করে ১৫ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাতে ব্যয় হবে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট জ্বালানি তেল বিক্রি হয়েছিল ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার ৩৪১ টন, যার মধ্যে ৪৬ লাখ ৮ হাজার টন এসেছিল সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির মাধ্যমে, বাকিটা দেশীয় শোধনাগার থেকে।

অর্থনীতিতে বাড়তি চাপের শঙ্কা

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরে জ্বালানী খাতে গড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ বাংলাদেশের অর্থনিতির জন্য অশানি সংকেত, বিষেষ করে যখন দেশের ফরেন ইনভেস্টমেন্ট আর বৈদেশিক ঋণ একেবারে শূন্যের কোটায়।

জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা বর্তমানে ৬০ শতাংশের বেশি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া আমদানিনির্ভর এই চাপ থেকে সহসা মুক্তির সম্ভাবনা কম।

Visited 6 times, 1 visit(s) today