❐ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ একসময় সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারত। কিন্তু বাস্তবে ইরানের হামলা গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলের সমীকরণ উল্টে দিয়েছে—পর্যটন, তেল শিল্প এবং সেখানকার জীবনযাত্রায় আঘাত হেনে দুই দেশকে আগের চেয়েও বেশি বিভক্ত করে তুলেছে।
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং আমিরাতের নেতা মোহাম্মদ বিন জায়েদ একসময় ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, এমনকি তাদের মধ্যে ছিল একধরনের মেন্টর-ছাত্র সম্পর্ক। দুজনই কর্তৃত্ববাদী রাজতান্ত্রিক শাসক এবং তেলসম্পদে দুই দেশই বিত্তশালী হয়েছে।
মানচিত্রে সৌদি আরব আকারে অনেক বড় এবং জনসংখ্যার দিক থেকেও এগিয়ে, ফলে দেশটি নিজেকে অঞ্চলের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। অন্যদিকে আমিরাত আকারে অনেক ছোট হলেও দশকের পর দশক ধরে পুঁজি ও সম্পদ গড়ে তুলে নিজেকে একটি মাঝারি শক্তিতে রূপান্তরিত করেছে।
এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন বেশ তীব্র রূপ নিয়েছে। আমিরাত বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন নির্মাণ করার পর সৌদি আরব এখন তার চেয়েও উঁচু ভবন বানাতে চায়। আমিরাতের রাজপরিবারের এক সদস্য ফুটবল ক্লাব কিনে নেওয়ার পর সৌদিরাও একই পথে হেঁটেছে।
দুবাইকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও ব্যবসার কেন্দ্র এবং বিলাসিতার প্রতীকে পরিণত করেছে আমিরাত—মূলত তেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতি বহুমুখী করার কৌশলের অংশ হিসেবে। সৌদি আরবও এখন রিয়াদকে এমন কেন্দ্র বানাতে চায় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সেখানে স্থানান্তরিত হতে উৎসাহ দিচ্ছে। মূলত সৌদিরা আমিরাতিদের সমান হওয়ার চেষ্টা করছে।
কিন্তু ইরান-যুদ্ধ পুরো পরিস্থিতি ওলটপালট করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর ইরানের পাল্টা জবাবের অংশ হিসেবে দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালানো হয়। যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা স্থাপনা রয়েছে সেগুলোই মূলত লক্ষ্যবস্তু হয়, তবে ইরান বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানে। এর মধ্যে আমিরাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই হামলার পর আমিরাতে একধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়—তাদের প্রত্যাশা ছিল সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্র তাদের পাশে আরও সক্রিয়ভাবে দাঁড়াবে, কিন্তু তেমন সংহতি তারা দেখতে পায়নি। এরপর আমিরাত নিজের পথে এগোতে শুরু করে এবং তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর বৈশ্বিক জোট ওপেক থেকে বেরিয়ে যায়, যাতে ওপেকের সীমাবদ্ধতা ছাড়াই বেশি তেল বিক্রি করতে পারে এবং ইরানি হামলার পর পুনর্গঠনের খরচ মেটাতে পারে।
এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ওপেক মূলত সৌদি আরবের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সংগঠন—এতে দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে এবং অন্য সদস্য দেশগুলোও এই পথ অনুসরণ করতে পারে, যা সৌদি আরবের নেতৃত্বকে দুর্বল করে দিতে পারে।
সৌদি আরবের আঞ্চলিক নেতৃত্বের দাবি শুধু অর্থনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং ধর্মীয় ভিত্তিও রয়েছে—মক্কা ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র শহর এবং সৌদি আরব নিজেকে আরব মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে দেখে। ইরানও একই ধরনের ধর্মীয় নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে, যদিও দেশটি ইসলামের ভিন্ন একটি শাখা অনুসরণ করে।
রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জন্য ইরান বিভিন্ন মিলিশিয়া ও প্রক্সি বাহিনীর একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যারা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এই কারণেই ইরান সৌদি আরব ও আমিরাত উভয়েরই সাধারণ শত্রু, এবং ইয়েমেনের মতো জায়গায় ইরানের প্রভাব ঠেকাতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করে এসেছে।
ইয়েমেন সরাসরি সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী এবং লোহিত সাগরের প্রবেশপথে অবস্থিত। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি উপসাগরীয় জোট ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে, আর এই লড়াইয়ে সৌদি আরবের প্রধান সহযোগী ছিল আমিরাত। বছরের পর বছর দুই দেশ ইয়েমেনে বিমান হামলা চালায়, যাতে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারায়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়েমেন ইস্যুতে দুই দেশ কখনোই প্রকৃত অর্থে একমত ছিল না—এটি ছিল কেবলই একটি বিভ্রম। সৌদি আরব যখন ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন অব্যাহত রাখে, তখন ২০১৭ সালে আমিরাত দক্ষিণাঞ্চলের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন দিতে শুরু করে, যদিও আমিরাতের কর্মকর্তারা এই সমর্থনের কথা অস্বীকার করেছেন।
দক্ষিণ ইয়েমেনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা আমিরাতের জন্য মূলত বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক সুযোগের বিষয় ছিল, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চেয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সৌদি আরব বুঝতে পারে যে উত্তরে হুথিদের বিরুদ্ধে তারা একাই লড়ছে।
২০২৫ সালের শেষদিকে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়, যখন সৌদি বাহিনী আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বন্দরে হামলা চালায়। এই সংঘর্ষ স্পষ্ট করে দেয় যে সৌদি আরব ও আমিরাত এখন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে।
আমিরাতের বৃহত্তর কৌশল বোঝার জন্য নজর দিতে হবে ইয়েমেনের সোকোত্রা দ্বীপপুঞ্জের দিকে। ২০১৮ সালে আমিরাত এখানে সেনা মোতায়েন করে, এরপর থেকে আমিরাত-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, দ্বীপে একটি বিমান অবতরণ পথসহ সামরিক অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আমিরাতের কর্মকর্তারা অবশ্য জানিয়েছেন, তারা ইয়েমেন থেকে সব সেনা প্রত্যাহার করেছে এবং সেখানে আর জড়িত নেই; এর আগে তারা দাবি করেছিল সোকোত্রায় তাদের উপস্থিতি শুধুই মানবিক সহায়তার জন্য। তবে বিশেষজ্ঞরা এই দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।
সোকোত্রা দ্বীপপুঞ্জ এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরের প্রবেশপথে অবস্থিত—একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। ভৌগোলিকভাবে এই দ্বীপকে অনেকটা “ভাসমান বিমানবাহী রণতরী”-র মতো গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে দেখা হয়। আমিরাতের জন্য এটি নিজেদের প্রভাব বলয়ের বাইরে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ভূমিকা রাখার একটি সুযোগ।
কৌশলগত জলপথের প্রশ্নে সৌদি আরবের ভৌগোলিক সুবিধা আমিরাতের চেয়ে অনেক বেশি—সৌদি আরবের হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগর উভয়েতেই প্রবেশাধিকার আছে, অথচ আমিরাতের প্রবেশাধিকার শুধু হরমুজ প্রণালীতে সীমাবদ্ধ। আর ইরান-যুদ্ধ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে শুধু একটিমাত্র জলপথের ওপর নির্ভর করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
লোহিত সাগরে পা রাখার কৌশল আমিরাত ইয়েমেনের বাইরেও প্রসারিত করেছে। সুদানে আমিরাত বিদ্রোহী আধাসামরিক বাহিনী আরএসএফকে সমর্থন দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যদিও আমিরাত এই অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে—লক্ষ্য মূলত সেখানকার সমুদ্র উপকূলে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
সোমালিয়ায় আমিরাত সমর্থন দিচ্ছে বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডকে, যেটিও সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত। বিচ্ছিন্নতাবাদী সোমালিল্যান্ডের অনুমতি নিয়ে আমিরাত সেখানে একটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করেছে, গড়ে তুলেছে সামরিক জাহাজের উপযোগী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং আধুনিকায়ন করেছে একটি বিমান অবতরণ পথ।
এই স্থাপনাগুলো আমিরাতের সামরিক বাহিনী ঠিক কীভাবে ব্যবহার করছে তা স্পষ্ট নয়, আর এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও আমিরাত সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গেছে।
তবে সামগ্রিকভাবে আফ্রিকার শৃঙ্গ অঞ্চলে (হর্ন অব আফ্রিকা) আমিরাত রাজনৈতিক জোট, বিনিয়োগ ও সামরিক সহায়তার মাধ্যমে একটি প্রভাবশালী শক্তি হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমিরাত মূলত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রিক—তারা রাষ্ট্র-বহির্ভূত সশস্ত্র গোষ্ঠীর একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে তারা বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এতে করে দেশগুলোর ভৌগোলিক অখণ্ডতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং বিভাজনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অন্যদিকে সৌদি আরব মনে করে, রাষ্ট্র-বহির্ভূত গোষ্ঠীগুলোকে ক্ষমতাশালী করে তোলা এক প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল, কারণ এসব গোষ্ঠী শেষপর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসার চেষ্টা করতে পারে—তাই সৌদি আরব সাধারণত প্রতিষ্ঠিত সরকারকেই সমর্থন করে, যেখানে আমিরাত সমর্থন দেয় রাষ্ট্র-বহির্ভূত গোষ্ঠীগুলোকে। এই ভিন্নমুখী কৌশলই সুদানসহ বিভিন্ন গৃহযুদ্ধ ও আঞ্চলিক সংঘাতে দুই দেশকে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে।
সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যে বিভাজন তৈরির আরেকটি বড় কারণ ইসরায়েল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, লোহিত সাগর অঞ্চলে আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে, এমনকি সোমালিল্যান্ডের সেই সম্ভাব্য সামরিক স্থাপনাতেও। সোমালিল্যান্ডকে বিচ্ছিন্ন অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশ ছিল ইসরায়েল।
এমনকি সোকোত্রা দ্বীপেও ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতি ছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই বিষয়ে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলেও তারা সাড়া দেয়নি।
এছাড়া বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইরান-যুদ্ধের সময় আমিরাত ইসরায়েলি আয়রন ডোম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছিল—ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে এই প্রযুক্তির এটাই প্রথম জানা ব্যবহার।
এই সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে, যা ইসরায়েল ও আমিরাতের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা ঘটায়। আমিরাত মূলত ইসরায়েলি প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে প্রবেশাধিকার চেয়েছিল। সৌদি আরবও একসময় ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা ভেবেছিল, কিন্তু হামাসের অক্টোবরের সন্ত্রাসী হামলার পর ইসরায়েলের পদক্ষেপ—গাজা যুদ্ধ, লেবাননে সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে হামলা—সেই প্রক্রিয়া থমকে দেয়।
ফলে এখন সৌদি আরব ও আমিরাত ইসরায়েলকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখছে। সৌদি আরব মনে করে ইসরায়েল ও ইরান উভয়কেই নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন, অন্যদিকে আমিরাত ইসরায়েলের কাছাকাছি এসে বলছে, ইরান ও ইসরায়েলকে একই কাতারে ফেলা যায় না—কারণ একটি দেশ বারবার তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে, আর অন্যটি বরং তাদের সুরক্ষা দিয়েছে।
আব্রাহাম চুক্তির মধ্যস্থতা যুক্তরাষ্ট্রই করেছিল, যা আবার আলোচনায় নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রকেই এই অঞ্চলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনার কারণেই ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই যুদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বড় রূপান্তরকারী ঘটনা—যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাই নিরাপত্তা দেবে, দীর্ঘদিন ধরে লালিত এই বিশ্বাস অনেকটাই ভেঙে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এখন আর আগের মতো আঞ্চলিক নিরাপত্তা দিতে সক্ষম বা ইচ্ছুক নয় বলে মনে করা হচ্ছে, এবং ধীরে ধীরে একটি বহু-মেরুকেন্দ্রিক আঞ্চলিক ব্যবস্থার দিকে পরিস্থিতি এগোচ্ছে, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমশ সরে যাচ্ছে।
