❐ আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এই বছরের এল নিনো নিয়ে জোরালো সতর্কবার্তা দিয়েছেন। প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট এই আবহাওয়া পরিস্থিতি স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র রূপ নিতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা। এর ফলে ২০২৭ সালে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা রেকর্ড ভাঙতে পারে এবং গত এক শতাব্দীতে দেখা যায়নি এমন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।
চরম আবহাওয়ার পূর্বাভাস
এই বছরের এল নিনো খরা ও বন্যা—উভয় ধরনের চরম আবহাওয়াকে আরও তীব্র করে তুলবে। আবহাওয়াবিদরা এটি বর্ণনা করতে সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দ ব্যবহার করছেন। যুক্তরাজ্যের মেট অফিস জানিয়েছে, এই আবহাওয়া পরিস্থিতি হবে নজিরবিহীন এবং গত একশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী।
এল নিনো একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা, যা তখন শুরু হয় যখন সাধারণত পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে যাওয়া বাতাস সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে সাধারণত পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে ঠেলে দেওয়া উষ্ণ পানি পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
সাধারণত যখন প্রশান্ত মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে ০.৫ ডিগ্রি বেশি হয়, তখনই বিজ্ঞানীরা এল নিনো ঘোষণা করেন। কিন্তু এই বছর জুলাই মাসের মধ্যেই তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে ২ ডিগ্রি বেশি হয়ে গিয়েছিল।
মেট অফিসের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরের শেষদিকে এই উষ্ণতা ৩ ডিগ্রিও ছাড়িয়ে যেতে পারে। কেউ কেউ আবার ধারণা করছেন, তাপমাত্রা গড়ের চেয়ে ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে—যা হলে এটি হয়ে উঠতে পারে “সহস্রাব্দের এল নিনো”।
বৈশ্বিক প্রভাব: খরা, বন্যা ও দাবানল
প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে সারা বিশ্বের আবহাওয়ায়—কোথাও বৃষ্টি কমবে, কোথাও বাড়বে। এর ফলে দেখা দিতে পারে তীব্র খরা, দাবানল এবং ভয়াবহ বন্যা।
অতীতে এমন পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে। পূর্বাভাস সঠিক প্রমাণিত হলে, এবারের এল নিনোর পরিণতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভয়াবহ হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মিটিওরোলজিক্যাল সোসাইটির প্রধান নির্বাহী এবং ইউরোপীয় মিটিওরোলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি লিজ বেন্টলি বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি জানান, এটিকে যথাযথভাবেই “সুপার এল নিনো” নামকরণ করা হয়েছে, কারণ গড়ের তুলনায় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে কিছু গবেষণা কেন্দ্র জানাচ্ছে। তার ভাষ্যে, ১৮৭৭ সালের পর এমন তীব্র এল নিনো দেখা যায়নি।
বেন্টলি ব্যাখ্যা করেন, ১৮৭৭ সালে বিশ্বের জলবায়ু এখনকার চেয়ে অনেক শীতল ছিল। সেই সময়কার এল নিনোর কারণে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে ফসল নষ্ট হয়ে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হয়।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এবার ঠিক একই মাত্রার দুর্ভিক্ষ হবে বলে তিনি মনে করছেন না, তবে বর্তমানে বিশ্বের জলবায়ু ইতিমধ্যে ১.৫ ডিগ্রি উষ্ণ হয়ে গেছে বলে এই এল নিনো সেই উষ্ণতাকে আরও বাড়িয়ে দেবে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেখা প্রভাবগুলোকে সাময়িকভাবে আরও তীব্র করে তুলবে।
তিনি আরও বলেন, এবারের এল নিনো একরকম “সুপারচার্জড”—অর্থাৎ প্রশান্ত মহাসাগরের ওই অংশে অতিরিক্ত তাপ জমা হয়েছে, যার ফলে স্থানীয়ভাবে চরম আবহাওয়াজনিত ঘটনা ঘটবে।
দক্ষিণ আমেরিকার পূর্বাঞ্চলে বন্যা এবং প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিমাঞ্চলে খরা দেখা দেবে। অস্ট্রেলিয়ায় ফের দাবানলের ঘটনা দেখা যাবে, যা আগের এল নিনোর তুলনায় আরও ভয়াবহ হবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বেন্টলির মতে, বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে এবং ২০২৭ সাল রেকর্ড সর্বোচ্চ উষ্ণতম বছর হতে যাচ্ছে বলে প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায়—বছর শুরুর আগেই এটা বলা সম্ভব, কারণ এই এল নিনো বায়ুমণ্ডলে প্রচুর অতিরিক্ত তাপ ও শক্তি যোগ করবে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনোর প্রভাবের মধ্যে সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ইতিমধ্যে প্রায় ১.৫ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে—এটাই মূল চালিকাশক্তি। এর সঙ্গে সুপার এল নিনো যুক্ত হয়ে আরও প্রায় দশমিক কয়েক ডিগ্রি (সাময়িকভাবে সামগ্রিক উষ্ণতাকে প্রায় ১.৭-১.৮ ডিগ্রিতে ঠেলে দিতে পারে) যোগ হবে।
তবে এই বাড়তি উষ্ণতা সাময়িক—এল নিনো এই বছরের শেষদিকে চূড়ায় পৌঁছাবে এবং ২০২৭ সালে গিয়ে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে। তবে আগামী ৬ থেকে ১২ মাসে এর প্রভাব হবে ব্যাপক ও তাৎপর্যপূর্ণ।
ভারতের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে বর্ষা মৌসুম দুর্বল হয়ে পড়েছে, ফলে বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে। যেহেতু ভারত ধান চাষের জন্য মূলত বর্ষার পানির ওপর নির্ভরশীল, তাই সেখানে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহেও।
এছাড়া পানামা খালেও ইতিমধ্যে খরার কারণে সমস্যা দেখা দিয়েছে—পানির স্তর কমে যাওয়ায় খাল কর্তৃপক্ষকে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে, খরা, বন্যা কিংবা তাপপ্রবাহ—যে আকারেই হোক না কেন, আগামী ছয় থেকে বারো মাসে এর প্রভাব হবে বহুমুখী, যা মানুষ ও অর্থনীতি উভয়কেই ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।
প্রশান্ত মহাসাগরের কাছাকাছি হওয়ায় সেই অঞ্চলগুলো এল নিনোর সরাসরি প্রভাবে বেশি ভুগবে। অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র খরা এবং আগের বছরগুলোর তুলনায় আরও ভয়াবহ দাবানল দেখা দিতে পারে। ভারতের বর্ষা ইতিমধ্যে প্রভাবিত হয়েছে।
এছাড়া বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রশান্ত মহাসাগর থেকে দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতেও এর প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
ইউরোপেও এর প্রভাব থেকে বাদ যাবে না। শীতের শুরুতে আরও বৃষ্টিবহুল ও ঝড়ো আবহাওয়া দেখা দিতে পারে। শক্তিশালী এল নিনো সাধারণত শীতের শেষ ভাগে ঠান্ডার তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়, ফলে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ নাগাদ প্রচণ্ড ঠান্ডা, তুষারময় ও বরফাচ্ছাদিত পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে।
এরপর আগামী বছর আবার উচ্চ তাপমাত্রা ফিরে আসবে—অর্থাৎ এই গ্রীষ্মে যে তাপপ্রবাহ দেখা গেছে, আগামী গ্রীষ্মে তা আরও তীব্র আকারে ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
সাক্ষাৎকারের শেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা কী, জানতে চাইলে বেন্টলি বলেন, এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এল নিনো একটি প্রাকৃতিক ঘটনা এবং সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই, যদিও জলবায়ু পরিবর্তন এটিকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ রয়েছে।
তবে গত কয়েক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের যে প্রভাব দেখা গেছে, এল নিনো তাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। তাই দুটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন—
১. যতটা সম্ভব বৈশ্বিক উষ্ণতা সীমিত রাখা, অর্থাৎ যত দ্রুত সম্ভব জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ করে আরও উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধ করা।
২. জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় আরও বেশি সহনশীলতা গড়ে তোলা—বিশেষত এই গ্রীষ্মে দেখা প্রভাবগুলো, যা সুপার এল নিনো আরও তীব্র করে তুলবে।
