এএফপিকে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা: পরিণতি জানি, তবুও দেশে ফিরতে চাই, দেশের মানুষ আমাকে ডাকছে

এএফপিকে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা: পরিণতি জানি, তবুও দেশে ফিরতে চাই, দেশের মানুষ আমাকে ডাকছে
শেয়ার করুন

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


বাংলাদেশের দীর্ঘ সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, নিজের জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ সচেতন। গ্রেপ্তার, কারাবন্দি হওয়া এমনকি হত্যার শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও তিনি আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফিরতে চান।

বার্তা সংস্থা এএফপিকে ই-মেইলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আমাকে হত্যা করা হতে পারে। আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। আমাকে কারাগারেও পাঠানো হতে পারে। আমি আমার পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। তারপরও দেশে ফিরতে চাই, কারণ আমার দেশের মানুষ আমাকে ডাকছে।”

২০২৪ সালের আগস্টে সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংঘাতে প্রাণ সংশয়ে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে বাংলাদেশে। বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ঘিরে ফেলে তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে। শেখ হাসিনাকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যায় সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার। তিনি ভারতে আতিথ্যবরণ করেন।

জাতিসংঘের একটি প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সরকারবিরোধী সংঘাত-সহিংসতা দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে সর্বোচ্চ ১,৪০০ জন পর্যন্ত নিহত হতে পারেন। যদিও ইউনূস সরকারের সময় গেজেটে উল্লেখ করা হয়েছে এই সংখ্যা ৮৪৩ জন। আবার পরবর্তীতে অনেক নিহতকে জীবিত দেখা গেছে বিভিন্ন স্থানে।

গত নভেম্বরে ঢাকার একটি আদালত ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলায় শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। তবে তিনি এই রায়কে “আইনের পোশাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ” বলে উল্লেখ করেছেন সাক্ষাৎকারে।

ভারত সরকারের নির্ধারিত একটি অজ্ঞাত স্থানে অবস্থান করছেন বলে জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, দেশে ফেরার বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে তার ওপর কোনো চাপ নেই।

বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার পক্ষ শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের আবেদন করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি এখনও পর্যালোচনায় রয়েছে।

একইসাথে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হযেছে, শেখ হাসিনা ভারতে একজন প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে অবস্থান করছেন।

এ বিষয়ে শেখ হাসিনার ভাষ্য, দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের সঙ্গে প্রত্যর্পণ ইস্যুর কোনো সম্পর্ক নেই। তাঁর ভাষায়, “আমি ভারতে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে আছি। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে প্রত্যর্পণ নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি। দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নিয়েছি।”

মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথিত অভিযোগ প্রসঙ্গে

দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন, বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা, বিরোধীদের হত্যা এবং একতরফা নির্বাচন আয়োজনের মতো কিছু অভিযোগ তুলে আসছে।

এসব অভিযোগ সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে শেখ হাসিনা বলেন, “অনেক অভিযোগই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার অংশ। অভিযোগ উঠলেই তদন্ত হয়েছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”

২০২৪ সালের সরকারবিরোধী বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘অতিরিক্ত শক্তি’ প্রয়োগের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “আমার সরকার সর্বোচ্চ ধৈর্য দেখিয়েছে এবং আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করেছে।”

শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে জানান, এটি শুধুমাত্র একটি সাধারণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। বরং এটি ছিল “পরিকল্পিত সহিংসতা, অপপ্রচার এবং সরকার উৎখাতের উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি সংগঠিত অভিযান।”

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম কার্যত নিষিদ্ধ থাকার প্রেক্ষাপটে দেশে ফিরে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “ক্ষমতা আমার লক্ষ্য নয়। মানুষের সেবা করাই আমার উদ্দেশ্য।”

আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানালেও শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাননি। তিনি বলেন, “যারা তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, প্রতিটি পরিবারের প্রতি আমার সহানুভূতি রয়েছে।”

তবে আন্দোলনের সময় নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অনুশোচনা আছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত একজন ব্যক্তির একার সিদ্ধান্ত নয়। পুরো সংকটের প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে একটি মুহূর্তকে আলাদা করে বিচার করা সঠিক হবে না।”

সূত্র: এনডিটিভি

Visited 2 times, 2 visit(s) today