❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক
দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বড় অংশই এখন উচ্চমূল্যের ঋণে কেন্দ্রীভূত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, ৫০ কোটি টাকার বেশি অঙ্কের ঋণের ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ এখন খেলাপি। বিপরীতে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার মাত্র ১৫ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঋণের অঙ্ক যত বড়, খেলাপির ঝুঁকিও তত বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু ব্যবসায়িক ব্যর্থতার ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং জবাবদিহির অভাবের প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের খেলাপির হার ছিল ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০২৬ সালের মার্চে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে এ ধরনের ঋণের স্থিতিও বেড়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।
২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি ঋণের মানও অবনতি হয়েছে। অন্যদিকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের স্থিতি ৪ লাখ ৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা হলেও খেলাপির হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম, মাত্র ১৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ১০ থেকে ২০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার সবচেয়ে বেশি, ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার ঋণে খেলাপির হার ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণে ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ, ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকায় ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ১ থেকে ১০ কোটি টাকার ঋণে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদনের সময় অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং অপর্যাপ্ত তদারকির কারণে বিতরণ করা এসব ঋণের একটি বড় অংশ এখন আদায়-সংকটে পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, ব্যাংকগুলো সাধারণত বড় ঋণ দিতে আগ্রহী, কারণ এতে ব্যবস্থাপনা ব্যয় কম। অনেক ছোট গ্রাহকের পরিবর্তে একজন বড় গ্রাহককে ঋণ দেওয়া ব্যাংকের জন্য তুলনামূলক সহজ।
তবে তার মতে, বড় ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে খেলাপির প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে, যা ব্যাংকিং খাতে একটি নেতিবাচক ঋণ সংস্কৃতি তৈরি করছে।
তিনি বলেন, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতারা অনেক সময় পুনঃতফসিল, বিশেষ সুবিধা বা অন্যান্য উপায়ে চাপ এড়ানোর সুযোগ পান। ফলে প্রকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ঋণ পুনঃতফসিল বা রাইট-অফের ওপর বেশি নির্ভরতা দেখা যাচ্ছে। এতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, ছোট ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নেয়। সামান্য কিস্তি বকেয়া হলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু বড় ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে নানা কারণে আদায় প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়, যার প্রভাব পড়ে পুরো ব্যাংকিং খাতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে মোট খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। একই বছরের ডিসেম্বরে তা বেড়ে ৩১ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের মার্চে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছায়।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর রিয়াজ বলেন, অনেক ব্যাংকের বর্তমান আর্থিক অবস্থা থেকেই বোঝা যায়, বড় ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের প্রকৃত পরিশোধ সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। তার মতে, ভবিষ্যতে বড় ঋণ অনুমোদনের সময় ব্যবসার নগদ প্রবাহ, প্রকল্পের সম্ভাবনা এবং ঝুঁকি মূল্যায়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই ঋণ পরিশোধে বেশি সচেষ্ট থাকেন। অন্যদিকে অনেক বড় ঋণগ্রহীতার মধ্যে ঋণ পরিশোধে অনীহা তৈরি হয়েছে, যা এখন ব্যাংকিং খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে অধিকাংশ ব্যাংক বড় ঋণ বিতরণে আরও সতর্ক হচ্ছে। এর পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত ছোট অঙ্কের ঋণ বিতরণে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
