‘বড্ড ছন্নছাড়া ছিলাম আমরা’, বিদায়ের সব দায় নিজের কাঁধেই নিলেন এমবাপে

‘বড্ড ছন্নছাড়া ছিলাম আমরা’, বিদায়ের সব দায় নিজের কাঁধেই নিলেন এমবাপে
শেয়ার করুন

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মঞ্চে স্পেনের বিপক্ষে এভাবে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হবে, তা হয়তো চরম নাটকীয়তার ফুটবলও ভাবেনি। টেক্সাসের আর্লিংটনে স্পেনের কাছে ২-০ গোলে হেরে টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে ফ্রান্সের। আর এই বিদায়ের পর দলের পারফরম্যান্স নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা লুকাতে পারেননি ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে। দলের এমন ছন্নছাড়া পারফরম্যান্সকে সোজা সাপটা ভাষায় ‘ট্যাকটিক্যাল ও টেকনিক্যাল ব্যর্থতা’ হিসেবেই দেখছেন তিনি।

খেলার মাঠে ফরাসিদের পরিকল্পনার অভাব আর মাঠে তার বাজে বাস্তবায়নই যে এই পরাজয়ের মূল কারণ, তা ম্যাচ শেষে অকপটে স্বীকার করেছেন এমবাপে। বিশেষ করে মিডফিল্ডে স্পেনের নিয়ন্ত্রণ রুখতে না পারাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন এই রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড।

তার কথায়, মিডফিল্ডে তারা তিনজন ফরাসি খেলোয়াড়কে একা করে দিচ্ছিল। স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে এমন পজিশনে পড়া মানেই ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়া। ফ্যাবিয়ান ও রদ্রি মাঝমাঠে বল নিয়ে খেলার জন্য প্রচুর সময় ও ফাঁকা জায়গা পাচ্ছিলেন। প্রেসিং করার সময় ফরাসি ফুটবলারদের মধ্যে যোগাযোগের স্পষ্ট অভাব ছিল। এমবাপের মতে, তাদের উচিত ছিল ম্যান টু ম্যান প্রেসিং করা এবং স্পেনকে তাদের সঙ্গে দৌড়াতে বাধ্য করা।

চলতি বিশ্বকাপে টানা ছয় ম্যাচ জিতে এবং ১৬টি গোল করে উড়তে থাকা ফ্রান্স স্পেনের রক্ষণভাগের সামনে এসে যেন খেই হারিয়ে ফেলে। ম্যাচের ২২ মিনিটে লুকাস দিনিয়ে স্প্যানিশ তারকা লামিন ইয়ামালকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় স্পেন। স্পট কিক থেকে দলকে এগিয়ে নেন মিকেল ওয়ারজাবাল। এরপর ম্যাচের এক ঘণ্টা পার হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে পেদ্রো পোরোর গোলে ব্যবধান দ্বিগুণ করে স্পেন।

এমবাপে জানান, তাদের মূল পরিকল্পনা ছিল স্পেনের ওপর শুরু থেকেই হাই-প্রেস করা, যাতে তারা নিজেদের স্বাভাবিক পজিশন গেম খেলতে না পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো চিত্র। ফরাসিদের প্রেসিং ভেঙে স্পেন সহজেই বল বের করে নিয়েছে, আর ফ্রান্স বলের নিয়ন্ত্রণ পেলেও তা ধরে রাখতে পারছিল না।

কিলিয়ান এমবাপে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘কৌশলগত কিংবা টেকনিক্যাল—কোনো দিক থেকেই আমরা যেমন চেয়েছিলাম, তেমন খেলতে পারিনি। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো মঞ্চে যখন আপনি নিজের কাজটা ঠিকঠাক করতে পারবেন না, তখন জয় পাওয়া অসম্ভব।’

বল পায়ে ফ্রান্সের এমন নড়বড়ে পারফরম্যান্সের কড়া সমালোচনা করে ফরাসি অধিনায়ক বলেন, প্রথমার্ধে বলের ফার্স্ট টাচগুলো খুবই বাজে ছিল, যার ফলে সহজ কিছু সুযোগ তৈরি হলেও সেগুলো কাজে লাগানো যায়নি। টেকনিক্যালি তারা এতটাই ‘ছন্নছাড়া’ ছিলেন যে, সুযোগ পেয়েও স্পেনকে কোনো রকম চাপে ফেলা সম্ভব হয়নি।

ম্যাচের ভাগ্য বদলাতে প্রথমার্ধের বিরতির পরই আদ্রিয়েন রাবিওকে তুলে নেন কোচ দিদিয়ের দেশম। পরে মাঠে নামানো হয় দেজিরে দুয়ে এবং রায়ান চেরকিকে। কিন্তু স্পেনের জমাট রক্ষণে ফাটল ধরাতে পারেনি এই পরিবর্তনগুলো। টুর্নামেন্টে ইতিমধ্যে ৮টি গোল করা এমবাপেকেও পুরো ম্যাচে বোতলবন্দি করে রাখে স্প্যানিশ ডিফেন্ডাররা।

অবশ্য এই গোল খরা সত্ত্বেও আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে এখনও শীর্ষে আছেন এমবাপে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও ৮টি গোল করেছিলেন তিনি, যদিও সেবার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল তাদের।

দলের এই মহাবিপর্যয়ের সব দায় নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন ফরাসি অধিনায়ক। তিনি বলেন, ‘দলের অধিনায়ক হিসেবে সব দায় আমার। এটা মেনে নিতে আমার কোনো দ্বিধা নেই। আমরা ফাইনালে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারলাম না। এটাই বাস্তবতা।’

ফাইনালে ওঠার স্বপ্নভঙ্গের পর ফ্রান্সকে এখন মাঠের লড়াইয়ে নামতে হবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের জন্য। আগামী শনিবার ফ্লোরিডার মিয়ামি গার্ডেন্সে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার দ্বিতীয় সেমিফাইনালের পরাজিত দলের সঙ্গে দেখা হবে ফরাসিদের।

একটি দুর্দান্ত টুর্নামেন্ট কাটানোর পর এভাবে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়াটা ফরাসি ফুটবলের জন্য নিঃসন্দেহে এক বড় ধাক্কা, আর অধিনায়কের এই অকপটের স্বীকারোক্তিই বলে দিচ্ছে—দলের অন্দরমহলে আত্মসমীক্ষার সময় এসেছে।

Visited 3 times, 1 visit(s) today