পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় মাজার-দরগায় হামলার শতাধিক ঘটনায় মাত্র ১৩ মামলা, নেই অগ্রগতি: ক্ষুব্ধ সুফি সমাজ

পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় মাজার-দরগায় হামলার শতাধিক ঘটনায় মাত্র ১৩ মামলা, নেই অগ্রগতি: ক্ষুব্ধ সুফি সমাজ
শেয়ার করুন

❐ বিশেষ প্রতিবেদক


২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের পর সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে পীর-ফকিরদের খানকা, দরগাহ ও মাজারে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় প্রাণহানির পাশাপাশি কবর থেকে দেহাবশেষ তুলে পোড়ানোর মতো ঘটনাও সামনে এসেছে। ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় দেড় বছরে অধিকাংশ ঘটনার ক্ষেত্রেই মামলা হয়নি, আর যেগুলো হয়েছে সেগুলোর তদন্তেও তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি।

হামলার পর থেকে অনেক খানকা ও মাজার বন্ধ রয়েছে। সহিংসতা কিছুটা কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

পুলিশের উপস্থিতিতেই কুষ্টিয়ায় উগ্রবাদী-তৌহিদি হামলায় পীর নিহত: আস্তানায় ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ-লুটপাট

পুলিশ ও সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৬ই এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মাজার, দরগাহ, খানকা এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠান—যেমন ওরস, লালন মেলা ও পালাগানে—মোট ১৩৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৯৯টি হামলা হয়েছে মাজার ও দরগায়।

ময়মনসিংহ: মাজারে হামলা, ওরস বন্ধ

হামলার সময় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, মারধর ও লুটপাট চালানো হয়। হামলার আগে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড চলছে—এমন অপপ্রচার চালানো হয়। এসব ঘটনায় এক পীরসহ অন্তত চারজন নিহত এবং প্রায় দেড় হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। কোনো কোনো মাজারে একাধিকবার হামলার ঘটনাও ঘটেছে।

অনেক ক্ষতিগ্রস্ত মাজার এখনো পুনরায় চালু করা যায়নি; এমনকি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পরও নতুন হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ইউনূস সরকারের আমলে দেশের ১১৩টি মাজারে তৌহিদি-উগ্রবাদীদের হামলা

ঠাকুরগাঁওয়ে চার মাজারে উগ্র তৌহিদী জনতার হামলা

ময়মনসিংহে শতবর্ষী মাজারে তৌহিদি জনতার হামলা-ভাঙচুর ও মলমূত্র নিক্ষেপ

সর্বশেষ ১১ই এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একটি দরবার শরিফে পীর আবদুর শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের গুজব ছড়িয়ে এ হামলা চালানো হয়।

এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ফজলুর রহমান একটি মামলা করেন, যেখানে কুষ্টিয়া জেলা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি খাজা আহম্মেদকে হুকুমের আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ১৯ জনকে শনাক্ত করলেও ১৬ এপ্রিল রাত পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদের দাবি, ঘটনা তদন্তে একটি বিশেষ টিম কাজ করছে।

কুমিল্লা: চারটি মাজারে একদিনে অগ্নিসংযোগ-ভাঙচুর

সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞজনদের মতে, দেশের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত সংখ্যক মাজারে হামলার নজির নেই। তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও বিচারহীনতার কারণেই এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। হামলার পর অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না হওয়াও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

মাজারসংশ্লিষ্টরা জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয়দের বাধার কারণে অনেক স্থানে সংস্কার বা পুনরায় কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। ফলে দর্শনার্থীর সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত ২৪ জেলায় এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি হামলা হয়েছে ঢাকা বিভাগে, এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে—যেখানে পাঁচ জেলায় ২৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যে মাত্র ১৩টি মামলা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত একটি মামলার অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।

এবার ফেসবুক পোস্টের অজুহাতে কুমিল্লায় মাইকিং করে ৪টি মাজারে হামলা-ভাঙচুরের পর আগুন

সরকারের প্রশ্রয়ে উগ্রপন্থীরা মাজার ও খানকা টার্গেট করেছে: অভিযোগ সুফি নেতাদের

সারাদেশে মাজার-খানকায় হামলা, ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা

অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লায় ১৩টি মাজারে হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র দুটি। হোমনা উপজেলার আসাদপুরে চারটি মাজারে হামলার ঘটনায় চারজন গ্রেপ্তার হলেও তদন্তে অগ্রগতি নেই।

হোমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তমাস বড়ুয়া বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের অনীহা ও সামাজিক চাপের কারণে অনেকে সাক্ষ্য দিতে এগিয়ে আসছেন না, ফলে তদন্ত ধীরগতির।

ময়মনসিংহে হজরত শাহ সুফি সৈয়দ কালু শাহ (রহ.), খাজা বাবার দায়রা শরিফ এবং শাহজাহান উদ্দিন (রহ.) আউলিয়ার মাজার ও খানকায় হামলার ঘটনায় তিনটি মামলা হলেও এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, এসব মামলার তদন্তও এগোয়নি।

এ বিষয়ে সৈয়দ কালু শাহ (রহ.) মাজার কমিটির অর্থ সম্পাদক মো. খলিলুর রহমান বলেন, পুলিশ কোনো তদন্ত বা গ্রেপ্তার কার্যক্রম চালায়নি, যা এ ধরনের হামলা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

অন্যদিকে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ-প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, মামলার বাদীরা নির্দিষ্ট আসামির পরিচয় দিতে না পারায় তদন্ত এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

উগ্রবাদীদের ভয়ে ৭০০ বছরের ইতিহাসে প্রথম শাহপরান মাজারের শিরনি বিতরণ বন্ধের নির্দেশ প্রশাসনের

ইউনূস আমলে মাজারে হামলা ও সরকারের রহস্যজনক নীরবতা: ধর্মীয় সহিংসতার উদ্বেগজনক উত্থান

ওরশ চলাকালে মাজারে তৌহিদি জনতার হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগে আহত ৩৫

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সবচেয়ে আলোচিত হামলাগুলোর একটি ঘটে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরুল হক ওরফে নুরাল পাগলার মাজারে। সেখানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি কবর থেকে তার মরদেহ তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। মৃত্যুর পর তাকে দাফন নিয়ে এলাকায় অপপ্রচার চালানো হয়েছিল বলেও জানা যায়।

এ ঘটনায় একাধিক মামলায় ২৬ জনের বেশি গ্রেপ্তার হলেও সাত মাস পার হলেও তদন্ত শেষ হয়নি।

রাজশাহীর পবা উপজেলার ‘হক বাবা গাউছুল আজম মাইজভান্ডারি গাউছিয়া পাক দরবার শরিফে’ গত বছরের ৫ই সেপ্টেম্বর হামলা হয়। তবে এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি এবং হামলার পর থেকেই খানকার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

পীর আজিজুর রহমান জানান, ঈদুল ফিতরের পরদিন একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের চেষ্টা করলে পবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তা বন্ধ করে দেন।

এ বিষয়ে ওসি আব্দুল মতিন বলেন, ‘ওই অনুষ্ঠান বন্ধ না করলে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারত। তাই বন্ধ করতে বলা হয়েছে।’

বন্ধ করে দেওয়া হয় ওরস

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিলেটে অন্তত তিনটি মাজারে হামলা ও সংঘর্ষ হলেও কোনো মামলা হয়নি; স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে। একইভাবে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে পীর রহিম শাহ ভাণ্ডারির মাজার এবং পাবনার দোগাছী ইউনিয়নের কায়েমকোলা গ্রামের মাজারে হামলার ঘটনাতেও মামলা করা হয়নি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নিরাপত্তাহীনতার কারণে তারা মামলা করতে পারছেন না এবং পুলিশও যথাযথ সহযোগিতা করছে না।

দিনাজপুরে মাজারের ওরসে উগ্রবাদীদের হামলার পর ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ

ধামরাইয়ে মাজার ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে তৌহিদী জনতা

উগ্রবাদী হামলার ভয়ে ময়মনসিংহে মাজারের ৭৫৫তম ওরস বন্ধের নির্দেশ দিল প্রশাসন

তবে নোয়াখালীর একটি ঘটনায় ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুধারাম থানার শাহ সুফি আইয়ুব আলী দরবেশের মাজারে হামলার ঘটনায় ৪৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ১৫০–২০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। পুলিশ এ ঘটনায় ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল ইসলাম বলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইতোমধ্যে ৪২ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছেন।

দুই বছর ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাজারে হামলার ফলে ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে গেছে এবং অনুষ্ঠান আয়োজনও হ্রাস পেয়েছে। অনেক ক্ষতিগ্রস্ত মাজার এখনো পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি।

২০২৪ সালের নভেম্বরে শেরপুরের খাজা বদরুদ্দোজা হায়দার (রহ.) ওরফে দোজা পীরের দরবারে দুই দফা হামলার পর সেটি এখনো ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে আছে। .

খাদেম মাহমুদান মাসুদ বলেন, ‘মাজারে কেউ ঢুকতে পারছে না। প্রশাসন থেকে কোনো ক্লিয়ারেন্স মেলেনি।’

নাটোর: মাজারে হামলা, ওরস বন্ধ

নারায়ণগঞ্জ, রাজবাড়ী, সিলেট ও চট্টগ্রামের অনেক মাজার ও দরগাহ এখনো বন্ধ রয়েছে।

মাজারে হামলার প্রভাব পড়েছে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী মাজারগুলোতেও। দেখা গেছে, এসব স্থানে দর্শনার্থী ও ধর্মীয় কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

মিরপুরের সুলতানুল আউলিয়া হযরত শাহ আলী বাগদাদী (রহ.) মাজারে গিয়ে দেখা যায়, দর্শনার্থী হাতে গোনা।

ময়মনসিংহে ২০০ বছরের পুরোনো মাজারে মাদ্রাসা ছাত্রদের হামলা

বিএনপি নেতাকে ২ লাখ টাকা না দেওয়ায় মাজার ভাঙচুর, বাউল উৎসব পণ্ড

কুষ্টিয়ায় পীর হত্যায় নিন্দা, জড়িতদের বিচারের দাবি ‘মাকাম’-এর

সেখানে উপস্থিত সাভারের বাসিন্দা শফিকুর রহমান বলেন, ‘মাজারে এখন নিরাপদ লাগে না। মানুষ আসে না। ভক্ত পাগল-ফকিররা এখন মাজারে না এসে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে।’

ঢাকার হাইকোর্ট এলাকার হযরত হাজি খাজা শাহবাজ (রহ.) মাজার, রমনার খাজা শরফুদ্দীন চিশতি (রহ.) মাজার, আজিমপুরের দায়রা শরিফ, পুরানা পল্টন মোড়ে পীর ইয়ামেনি (রহ.) মাজার, গুলিস্তানের গোলাপশাহ্ মাজার, চকবাজারের শাহ নেয়ামত উল্লাহ বুরাইন চিশতি (রহ.) মাজার এবং মিরপুর-১-এর হযরত মুসা শাহ (রহ.) মাজারেও আগের তুলনায় দর্শনার্থী ও অনুষ্ঠান কমে গেছে।

আগে এসব মাজারে দুস্থদের খাবার বিতরণ করা হলেও এখন অনেক জায়গায় তা বন্ধ রয়েছে।

সম্প্রতি সোলায়মান ল্যাংটার ওরস এবং মেলা বন্ধ

সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ জানিয়েছে, এসব হামলায় দেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের ইন্ধন থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

উগ্রবাদীদের চাপে ভুয়া অজুহাতে সোলায়মান লেংটার ১০৭তম ওরস-মেলা বন্ধ ঘোষণা

৭০০ বছরে এবারই প্রথম ‘নিরাপত্তার অজুহাতে’ হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে খাজা চিশতির ওরশে নিষেধাজ্ঞা

মাজারে হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার।

তিনি বলেন, ‘কারো মতাদর্শ পছন্দ না হলে, তাদের ওপর হামলা করার এ ঘৃণ্য অপরাধ বন্ধ করতে হবে। বিচার হলে এ ধরনের হামলা বারবার হতো না। তাই বিচার হতেই হবে। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। পাশাপাশি জন-আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

Visited 52 times, 1 visit(s) today