ঐতিহাসিক আর্তেমিস-২ চন্দ্র অভিযান: মহাকাশ যাত্রায় নতুন তথ্য প্রাপ্তির আশা বিজ্ঞানীদের

ঐতিহাসিক আর্তেমিস-২ চন্দ্র অভিযান: মহাকাশ যাত্রায় নতুন তথ্য প্রাপ্তির আশা বিজ্ঞানীদের
শেয়ার করুন

❐ ফিচার ডেস্ক


দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর মানুষবাহী মহাকাশযান আবার চাঁদের কাছাকাছি পাঠাতে যাচ্ছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা।

‘আর্তেমিস-২’ মিশনটি মানবজাতির মহাকাশ অভিযানের নতুন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে শুধু প্রযুক্তিগত পরীক্ষা নয়, মানুষের শরীর ও মহাকাশ পরিবেশ নিয়ে বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হবে।

প্রায় ১০ দিনের এই অভিযানে চারজন মহাকাশচারী ওরিয়ন মহাকাশযানে করে চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মহাকাশযানটি চাঁদের অদৃশ্য অংশ অতিক্রম করে প্রায় ৭ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত যাবে, যা মানব ইতিহাসে সবচেয়ে দূরবর্তী মানব ভ্রমণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই মিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মহাকাশে মানুষের শরীরের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ।

পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে বিকিরণের মাত্রা অনেক বেশি, ফলে অস্থিমজ্জা, রক্তকোষ উৎপাদন এবং রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব বোঝার জন্য বিশেষ পরীক্ষা চালানো হবে। মানুষের কোষ দিয়ে তৈরি ক্ষুদ্র কৃত্রিম টিস্যু মহাকাশে পাঠানো হচ্ছে, যা বাস্তব অঙ্গের মতো আচরণ করে।

মিশন শেষে এসব টিস্যুর জিনগত পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে দেখা হবে মহাকাশ পরিবেশে হাজারো জিন কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।

একই সঙ্গে মহাকাশচারীদের দৈনন্দিন জীবনযাপন, মানসিক চাপ ও কর্মক্ষমতার ওপরও গবেষণা করা হবে। তারা হাতে পরিধানযোগ্য যন্ত্র ব্যবহার করবেন, যা তাদের ঘুমের ধরন, চলাফেরা, হৃদস্পন্দন, মনোযোগ ও মানসিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহ করবে।

সীমিত জায়গার মধ্যে দীর্ঘ সময় বসবাস করলে দলগত কাজ ও মানসিক স্থিতিশীলতার ওপর কী প্রভাব পড়ে, সেটিও বিশ্লেষণ করা হবে।

রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের জন্য মহাকাশচারীরা নিয়মিত লালা ও রক্তের নমুনা সংগ্রহ করবেন। এসব নমুনা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নির্ণয় করবেন, মহাকাশে চাপ ও বিকিরণের কারণে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা দুর্বল বা পরিবর্তিত হয়।

বিশেষভাবে লক্ষ্য করা হবে এমন ভাইরাসগুলোর আচরণ, যেগুলো সাধারণত সুপ্ত থাকে কিন্তু মহাকাশে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

এই মিশনে বিকিরণ পরিমাপ একটি বড় লক্ষ্য। মহাকাশচারীদের সঙ্গে থাকবে ব্যক্তিগত বিকিরণ পরিমাপক যন্ত্র, যা তাৎক্ষণিকভাবে বিকিরণের মাত্রা নির্ণয় করবে। পাশাপাশি মহাকাশযানের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত সেন্সরগুলো বিকিরণের বিস্তার ও তীব্রতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেবে।

সৌরঝড় বা আকস্মিক বিকিরণ বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতিতে এসব তথ্য ভবিষ্যৎ অভিযানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

চাঁদের পর্যবেক্ষণও এই মিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মহাকাশযানটি চাঁদের যে অংশ দিয়ে অতিক্রম করবে, তা পৃথিবী থেকে সরাসরি দেখা যায় না। মহাকাশচারীরা সেখানে প্রাচীন উল্কাপাতের চিহ্ন, আগ্নেয়গিরির লাভা প্রবাহের অবশেষ এবং বিভিন্ন ভূতাত্ত্বিক গঠন পর্যবেক্ষণ করবেন।

বিশেষ করে বিশাল আঘাতজনিত গহ্বরসমূহ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চাঁদের গঠন ও ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

বিজ্ঞানীরা আরও আশা করছেন, মহাকাশচারীরা চাঁদের পৃষ্ঠে উল্কাপিণ্ডের আঘাতে সৃষ্ট ক্ষণস্থায়ী আলোর ঝলক বা দিগন্তের কাছে ভাসমান সূক্ষ্ম ধূলিকণার মেঘের মতো বিরল ঘটনাও দেখতে পারেন, যা এখনো পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি।

এই মিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য ভবিষ্যতে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মানুষের অবতরণ, দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশবাস এবং মঙ্গল গ্রহে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্তেমিস-২ শুধু একটি মহাকাশ ভ্রমণ নয়, বরং মানবজাতির মহাকাশে স্থায়ী উপস্থিতির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Visited 10 times, 1 visit(s) today