৩আই/অ্যাটলাস: ভিনগ্রহের দূত নাকি মহাজাগতিক বরফগোলক? আন্তঃনাক্ষত্রিক রহস্য

৩আই/অ্যাটলাস: ভিনগ্রহের দূত নাকি মহাজাগতিক বরফগোলক? আন্তঃনাক্ষত্রিক রহস্য
শেয়ার করুন

২০২৫ সালের ১ জুলাই চিলির অ্যাটলাস পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের টেলিস্কোপে প্রথম দেখা যায় এক অদ্ভুত আলোকোজ্জ্বল বস্তু—যার গতিপথ ও গতি তৎক্ষণাৎ বিজ্ঞানীদের হতবাক করে দেয়। বস্তুটির নাম দেওয়া হয় ৩আই/অ্যাটলাস, অর্থাৎ তৃতীয় আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু। এটি ʻওউমুয়ামুয়াʼ ও ʻবোরিসভʼ-র পর আমাদের সৌরজগতে প্রবেশ করা তৃতীয় অতিথি। জুলাই মাসে নাসা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার হাবল টেলিস্কোপ এটি ধারণ করে, যখন এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ২৭৭ মিলিয়ন মাইল দূরে অবস্থান করছিল। ছবিতে দেখা যায়, বরফে মোড়ানো এক কেন্দ্রীয় অংশের চারপাশে গ্যাস ও ধূলিকণার উজ্জ্বল মুকুট—একটি ধূমকেতুর মতো চেহারা, কিন্তু এতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

প্রথম থেকেই বোঝা যায় যে এটি সূর্যের মহাকর্ষে আবদ্ধ নয়। অর্থাৎ এটি এসেছে অন্য এক নক্ষত্রমণ্ডল থেকে, বহু লক্ষ বছর ধরে মহাশূন্যে ঘুরে বেড়িয়ে একেবারে কাকতালীয়ভাবে আমাদের সৌরজগতে প্রবেশ করেছে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার হিসেবে এর আয়তন প্রায় বিশ কিলোমিটার, যা এখন পর্যন্ত দেখা সবচেয়ে বড় আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতু। বিজ্ঞানীরা আরও জানান, এটি পৃথিবীর একদম কাছে আসবে না—সবচেয়ে নিকটবর্তী দূরত্ব হবে প্রায় ষোলো কোটি মাইল।

অক্টোবর মাসে, যখন ৩আই/অ্যাটলাস সূর্যের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে আসে, তখন এর আচরণ বদলে যায়। হঠাৎ উজ্জ্বলতা বেড়ে যায়, গতিপথে পরিবর্তন ঘটে এবং এটি প্রত্যাশিত অবস্থান থেকে প্রায় চার আর্কসেকেন্ড সরে যায়। সাধারণ ধূমকেতু সূর্যের তাপে বরফ গলে গ্যাস নির্গত করলে সামান্য বিচ্যুতি ঘটে, কিন্তু এই ত্বরণ ছিল অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী। আরও আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এর রঙ লালচে আভা থেকে ধীরে ধীরে গাঢ় নীলে পরিবর্তিত হয়—যা ধূমকেতুর জন্য একেবারেই অস্বাভাবিক। সাধারণত সূর্যালোকের বিকিরণে ধূমকেতু আরও লালচে হয়ে ওঠে।

নাসার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ৩আই/অ্যাটলাসের কোমা বা গ্যাসমণ্ডলে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও জলবরফ রয়েছে। এর রাসায়নিক গঠন অনেকাংশে আমাদের সৌরজগতের ধূমকেতুগুলোর সঙ্গে মিলে যায়, যা ইঙ্গিত দেয় যে অন্য নক্ষত্রমণ্ডলেও ধূমকেতুর সৃষ্টি সম্ভবত একই প্রক্রিয়ায় হয়। তবু কিছু তথ্য বিজ্ঞানীদের বিভ্রান্ত করছে—বিশেষ করে এর অতিরিক্ত ত্বরণ, রঙ পরিবর্তনের ধরন এবং গ্যাস নির্গমনের অনিয়মিত হার। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাভি লোয়েব বলেছেন, যদি এর চারপাশে কোনো বিশাল গ্যাসমেঘ না দেখা যায়, তবে এই ত্বরণ হয়তো কোনো প্রযুক্তিগত ইঞ্জিনের কারণে হতে পারে। তার মতে, এটি এমনও হতে পারে যে কোনো উন্নত সভ্যতা এটি পাঠিয়েছে তথ্য সংগ্রহ বা অনুসন্ধানের জন্য।

এই বক্তব্য ঘিরে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন পড়ে যায়। সামাজিক মাধ্যমে মানুষের আগ্রহের পাশাপাশি, পপ সংস্কৃতির তারকারাও এতে অংশ নেন। মার্কিন তারকা কিম কার্দাশিয়ান সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন, “৩আই/অ্যাটলাস নিয়ে কী হচ্ছে?” নাসার প্রশাসক শন ডাফি উত্তরে জানান, “এটি আমাদের সৌরজগতে আসা তৃতীয় আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতু, কোনো ভিনগ্রহী যান নয় এবং পৃথিবীর জন্য কোনো হুমকি নেই।” একই সময়ে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এলন মাস্ক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “এটি যদি কখনো পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসত, এর আকার ও গঠন এত বিশাল যে মহাদেশজুড়ে ধ্বংস ডেকে আনতে পারত।” তিনি অবশ্য যোগ করেন, “এখন পর্যন্ত এর কোনো সংঘর্ষের সম্ভাবনা নেই।”

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ডিসেম্বর মাস নাগাদ ৩আই/অ্যাটলাস সূর্যের প্রভাববলয় ছেড়ে ধীরে ধীরে সৌরজগত থেকে বেরিয়ে যাবে এবং আবার মহাশূন্যের অনন্ত অন্ধকারে মিলিয়ে যাবে। তার আগে বিভিন্ন টেলিস্কোপ এর গতিপথ ও গঠন নিয়ে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাবে। মঙ্গলগ্রহের কক্ষপথে থাকা ইউরোপীয় মহাকাশযান মার্স এক্সপ্রেস ও এক্সোমার্স ট্রেস গ্যাস অরবিটার ইতিমধ্যেই প্রস্তুতি নিচ্ছে, কারণ নভেম্বরে এটি মঙ্গলের কাছ দিয়ে অতিক্রম করবে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, সেখান থেকে তারা এর রাসায়নিক ও আলোকীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন।

৩আই/অ্যাটলাস আজ কেবল একটি ধূমকেতু নয়, এটি মানবকৌতূহলের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, মহাবিশ্ব কত বিশাল, কত অজানা। এই ধূমকেতুর যাত্রা হয়তো প্রমাণ করবে যে আমাদের মতো সভ্যতা অন্য কোথাও নেই, কিংবা হয়তো ইঙ্গিত দেবে—আমরা একা নই। বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত কোনো উত্তর পাননি, কিন্তু এই রহস্যময় অতিথি ইতিমধ্যেই মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লিখে ফেলেছে।

Visited 4 times, 1 visit(s) today