জুলাই আন্দোলনে বিদেশী অর্থায়ন, পর্ব-১ || “ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের” নামে বরাদ্দ ৫১ মিলিয়ন ডলার

জুলাই আন্দোলনে বিদেশী অর্থায়ন, পর্ব-১ || “ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের” নামে বরাদ্দ ৫১ মিলিয়ন ডলার
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


বিডি ডাইজেস্ট-এর হাতে আসা নথি মোতাবেক, বাংলাদেশে ২০১৭ সাল থেকে ৩২৫ মিলিয়ন ডলার মার্কিন অর্থায়নের তথ্য রয়েছে।

এসব তহবিল জাগো, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন, গ্লোবাল ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইন্সটিটিউট, গ্লোবাল সেন্টার অন কো-অপারেটিভ সিকিউরিটি, বিসিসিপি, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেয়া হয়েছে।

এই তহবিলের মাঝে কিছু লেনদেন সন্দেহের আওতায় পড়ে। এই প্রতিবেদন ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের প্রাপ্ত তহবিল আর অর্থায়ন নিয়ে।

২০২৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, সাবেক মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক কর্মকর্তা মাইক বেঞ্জ ও  বিখ্যাত টক শো হোস্ট টাকার কার্লসন উল্লেখিত বাংলাদেশের ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সন্দেহজনক প্রতিষ্ঠানে USAID-এর ২৯ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের একটি তথ্য দিয়েছিলেন ।

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের আরও কয়েকটি বড় অঙ্কের লেনদেন শনাক্ত হয়েছে বিডি ডাইজেস্ট-এর প্রাপ্ত নথি মোতাবেক। এসব তহবিলকে ‘ফিশি’ বা অত্যন্ত সন্দেহজনক বলে মনে করা হচ্ছে।

শনাক্ত হওয়া অন্যন্য তহবিলসমূহ:

  • স্ট্রেথনিং পলিটিক্যাল ল্যান্ডস্কেপ: Strengthening Political Landscape (SPL) প্রোগ্রাম: ২৯ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৯.০১ মিলিয়ন)। সময়কাল: ২০১৭ থেকে ২০২৪/২০২৫।
  • প্রমোটিং এডভোকেসি এন্ড রাইটস (Promoting Advocacy and Rights (PAR) প্রোগ্রাম: ১০.৫ মিলিয়ন ডলার। সময়কাল: ২০১৮-২০২৪।
  • প্রমোটিং পিস এন্ড জাস্টিস-নিউ রুল অব ল প্রোগ্রাম (Promoting Peace and Justice (PPJ) – New Rule of Law Program): ১১ মিলিয়ন ডলার। সময়কাল: ২০১৮-২০২৩।
  • ইউএসএআইডি-এর রেস্পন্সিভ লোকাল গভর্নমেন্ট এক্টিভিটি (USAID’s Responsive Local Governance Activity): ১.১ মিলিয়ন ডলার। শুরু: অক্টোবর ২০২৪, সমাপ্তির সম্ভাব্য সময়: ২০২৯।

এছাড়া USAID-এর বিদেশে কর্মসূচির জন্য বৈদেশিক সহায়তা (Foreign Assistance for Programs Overseas) প্রোগ্রামের অধীনে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া তহবিলের কিছু অংশ সাব-অ্যাওয়ার্ডি বা সহায়ক প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সাব-আওয়ার্ডিদের মধ্যে রয়েছে:

  • M/S Beatnik — ১,০০,০০০ ডলার
  • The Global Hunger Project — ৯,৫১,০০০ ডলার
  • Samakal (সমকাল পত্রিকা) — ২৯,০০০ ডলার

২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের তদন্তের পর উঠে এসেছিল, এই অর্থ বাংলাদেশের নির্বাচিত শেখ হাসিনার সরকারকে অস্থিতিশীল করতে এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সরকার উৎখাতে ব্যবহৃত হয়েছে।

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে নিবন্ধিত একটি সংস্থা, যার বাংলাদেশে মাত্র ২-৩ জন কর্মী রয়েছে বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন।

তবুও এই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানকে USAID বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়েছে, যা ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন DOGE (Department of Government Efficiency) তদন্তের সময় সামনে এসেছে।

ফেব্রুয়ারি ২০২৫-এ ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন সরকারি দক্ষতা বিভাগের (DOGE) সুপারিশে USAID-এর বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রকল্প বাতিলের প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প বলেন,

“বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি শক্তিশালী করতে ২৯ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছিল। সেই টাকা গেছে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে, যার নাম কেউ শোনেনি। কল্পনা করতে পারেন! একটি ছোট ফার্ম। এখান-ওখান থেকে ১০ হাজার ডলার করে পাওয়ার পর হঠাৎ যুক্তরাষ্ট্র সরকার থেকে ২৯ মিলিয়ন ডলার! ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছিল মাত্র দুজন। তারা এখন নিশ্চয়ই ধনী হয়ে এখন খুব খুশি।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, এই অর্থ “উগ্র বামপন্থি কমিউনিস্টদের”সমর্থন করতে ব্যবহৃত হয়েছে।

জনপ্রিয় টক শো হোস্ট টাকার কার্লসন সেই সময় তাঁর টক শোতে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাবেক কর্মকর্তা মাইক বেঞ্জ-এর সঙ্গে আলোচনায় USAID-কে “rent-a-riot operation” (ভাড়া করা দাঙ্গা অপারেশন) বলে বর্ণনা করেন।

মাইক বেঞ্জ উক্ত আলোচনায় বলেছিলেন, শেখ হাসিনা সরকারকে উৎখাতের পেছনে USAID এবং International Republican Institute (IRI) সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।

তিনি অভিযোগ করেন, বাংলাদেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের বিরোধিতা করায় শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

বেঞ্জ আরও বলেন, USAID ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের অর্থায়নে বাংলাদেশি র‍্যাপ সঙ্গীত গ্রুপগুলোকে অর্থ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা সরকারবিরোধী গান ও মিউজিক ভিডিও তৈরি করে রাস্তায় প্রতিবাদ উস্কে দেয়।

লিক হওয়া নথিতে সরাসরি “destabilize Bangladesh politics” (বাংলাদেশের রাজনীতি অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা) উল্লেখ রয়েছে। তারা এলজিবিটি সম্প্রদায়, দুটি জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, শিক্ষার্থী, ১৭০ জন “প্রো-ডেমোক্রেসি অ্যাক্টিভিস্ট” এবং ৩০৪ জন ইনফরম্যান্টের সঙ্গে কাজ করেছে।

একটি গানের উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি জন-অসন্তোষ তৈরি করা এবং বিপুল জনপ্রিয়তায় ধস নামানো।

সমালোচকদের মতে, এই “ডেমোক্রেসি প্রমোশন” ও “রাজনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি” নামের প্রোগ্রামগুলো আসলে বিদেশি হস্তক্ষেপের আড়ালে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।

মার্কিন আস্থাভাজন ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল, অর্থটি যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালকে দেওয়া হয়েছে, কোনো স্থানীয় ২-৩ জনের প্রতিষ্ঠানকে নয়।

যদিও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ বিষয়ক প্রোগ্রামগুলোতে এসব কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ওয়েবসাইট থেকে উক্ত প্রকল্প সম্পর্কে বলা আছে, “ইউএসএআইডি এবং ডিএফআইডি-এর অর্থায়নে পরিচালিত ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল শক্তিশালীকরণ’ (এসপিএল) কর্মসূচিটি রাজনৈতিক সহিংসতা হ্রাস করার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দল ও জনকল্যাণমূলক গোষ্ঠীর মধ্যে সম্পর্ক শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করে।

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল এর আদ্যপান্ত খোজ করে মাত্র দুইজন বাংলাদেশী ব্যাক্তির অস্তিত্ব খুজে পাওয়া যায়। তারা হলেনঃ
১। মো আব্দুল হালিম
প্রিন্সিপাল ডিরেক্টর (Principal Director) — Democracy International বাংলাদেশ।
তিনি একজন প্রখ্যাত নির্বাচন বিশেষজ্ঞ (elections expert)। বর্তমানে Democracy International-এর USAID-funded Strengthening Political Landscape (SPL) প্রোগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশের Electoral System Reform Commission-এর সদস্য এবং International IDEA-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সংস্কার বিষয়ে নিয়মিত মতামত দেন।
২। আমিনুল এহসান 
ডেপুটি চিফ অফ পার্টি (Deputy Chief of Party) — Democracy International বাংলাদেশ।
তিনি রাজনৈতিক দল ও যুব নেতৃত্ব উন্নয়ন বিষয়ক প্রোগ্রামে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। প্রিন্সিপাল ডিরেক্টর ড. আব্দুল আলিমের সাথে বিভিন্ন হাই-লেভেল মিটিং, ফেলোশিপ প্রোগ্রাম এবং রাজনৈতিক নেতাদের সাথে আলোচনায় নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন।

এই দুজন Democracy International-এর বাংলাদেশ অফিসের মূল দুই ব্যক্তি। ড. আব্দুল আলিম প্রধানত নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দেখাশোনা করেন, আর আমিনুল ইহসান ডেপুটি হিসেবে প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন ও যুব/রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাজে সহায়তা করেন।

এসপিএল কর্মসূচিটি ডিআই-এর সফল পূর্ববর্তী কর্মসূচি ‘গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও সংস্কার’-এর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।এসপিএল-এর অধীনে, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল রাজনৈতিক দলের কর্মী ও নাগরিকদের কার্যকর নেতা হিসেবে গড়ে উঠতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির পক্ষে কথা বলতে এবং সংঘাত নিরসনে একে অপরের সাথে গঠনমূলকভাবে যুক্ত হতে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে যাবে।

এসপিএল কর্মসূচির লক্ষ্য হলো, রাজনৈতিক দলের কর্মী ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নাগরিকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করা এবং পর্যায়ক্রমে সকল স্তরের দলীয় কাঠামোতে অন্তর্ভুক্তি ও সর্বোত্তম অনুশীলনকে আত্মস্থ করা; এবং রাজনৈতিক দলের কর্মী ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নাগরিকদের সংঘাতের প্রভাব নিরসনে গঠনমূলকভাবে যুক্ত হওয়ার দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা।

এসপিএল-এর অধীনে, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে সাতটি বিভাগীয় কার্যালয় পরিচালনা করে, যার মাধ্যমে গ্রামীণ ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো যায় এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারী, যুব ও তৃণমূল কর্মীদের অন্তর্ভুক্তিকে আরও ভালোভাবে সমর্থন করা হয়।”

বিডি ডাইজেস্ট থেকে আওয়ামীলীগ সহ আরও কিছু রাজনৈতিক দল এর সাথে এই বিষয়ে যোগাযোগ করে জানতে চাওয়া হয় যে, উক্ত দল সমুহের কোন রাজনৈতিক কর্মীকে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের এই সকল প্রোগ্রামে যুক্ত করা হয়েছিল কিনা। সব জায়গা থেকে উত্তর এসেছে “না” বোধক।

বিডি ডাইজেস্ট-এর প্রাপ্ত নথি মতে, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের নামে মোট ৫১.৬ মিলিয়ন ডলারের তহবিল বরাদ্দ হয়েছে ২০১৭ সালে থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে।

যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রসাশন ২০২৫ এ DOGE এর তদন্তের পরে কিছু তহবিল জব্দ করে। তবুও, এটা নিশ্চিত বলা যায়, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের নামে বরাদ্দকৃত তহবিলের বেশিরভাগই বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, এবং জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ও সরকার পতন আন্দোলনে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারকে সংগঠিত করতে, পরিচালিত করতে আর সহযোগীতা করতে ব্যাবহুত হয়েছে।

(পরবর্তি পর্বে থাকবে জাগো ফাউন্ডেশনে অর্থায়নের বিস্তারিত)

Visited 208 times, 1 visit(s) today