বিশ্লেষণ || জ্বালানি খাতে অস্থিরতা: ভর্তুকি, আমদানি ব্যয় ও বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে বাংলাদেশ?

বিশ্লেষণ || জ্বালানি খাতে অস্থিরতা: ভর্তুকি, আমদানি ব্যয় ও বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে বাংলাদেশ?
শেয়ার করুন

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশসহ তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে।

বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার পর ৯ই মার্চ, সোমবার একদিনেই তেলের দাম প্রায় ১৩ শতাংশ বেড়ে যায়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মাত্র এক সপ্তাহে তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে।

যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইরান পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে। এই সংঘাতের ফলে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই পথ ঝুঁকির মুখে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের কয়েকটি তেল ডিপো ধ্বংস হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের কিছু তেল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াল

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং ইকোনমকিস-এর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার মার্কিন ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দাম ১৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২.৯৮ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১৩.৪৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি ১০৫.১৬ ডলারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন আরও ব্যাহত হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের জন্য কেন উদ্বেগজনক

বাংলাদেশ একটি জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ। বছরে প্রায় ৬ থেকে ৭ মিলিয়ন টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়, যার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।

সরকারি সূত্র জানায়, বর্তমানে বিশ্ববাজারের দরে দেশে আসা ডিজেলের আমদানি খরচ লিটারপ্রতি প্রায় ১৪২ টাকা। কিন্তু বাংলাদেশ পেট্রুোলিয়াম কর্পোরেশন-বিপিসি দেশে তা বিক্রি করছে প্রতি লিটার ১০০ টাকায়।

দেশে প্রতি মাসে প্রায় ১৫টি জাহাজে জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। যদি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে প্রতি মাসে অতিরিক্ত প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে সরকার দাম সমন্বয় না করলে পুরো অর্থ ভর্তুকি দিয়ে বহন করতে হবে।

বিদ্যুৎ খাতেও বাড়ছে চাপ

জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বাংলাদেশে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র ফার্নেস অয়েলনির্ভর হওয়ায় তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বৃদ্ধি পায়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-বিপিডিবি-এর কাছে দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎ উৎপাদক কোম্পানিগুলোর পাওনা ইতোমধ্যে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড-আইএমএফ-এর শর্ত অনুযায়ী সরকারকে জ্বালানি ভর্তুকি কমাতে হচ্ছে। ফলে একদিকে ভর্তুকির চাপ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ঋণ কর্মসূচির শর্ত—এই দুইয়ের মধ্যে পড়ে নীতিনির্ধারকদের জন্য পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

এলএনজি আমদানিতে বাড়ছে ব্যয়

দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি বাড়ানো হয়েছে।

২০১৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এলএনজি আমদানিতে গত সাত অর্থবছরে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়লে শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতেও বড় চাপ তৈরি হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে পড়তে শুরু করেছে। এর প্রভাবে ইতিমধ্যে ভিয়েতনাম পেট্রোল ও ডিজেলের দাম ২১ শতাংশ বাড়িয়েছে। পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম বেড়ে লিটারপ্রতি ৩২০ রুপিতে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রে এক সপ্তাহে পেট্রলের দাম বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।

সেইসাথে ইউরোপেও নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চীন, জাপান, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

দেশে আতঙ্কে বাড়ছে জ্বালানি কেনা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ফলে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোলপাম্পে জ্বালানি কিনতে অতিরিক্ত ভিড় দেখা যাচ্ছে।

তবে সরকারি সূত্র বলছে, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে এবং তাৎক্ষণিক সংকটের আশঙ্কা নেই।

বিপিসি সূত্র বলছে, দেশে ডিজেলের মজুদ আছে প্রায় ১৪ দিনের, পেট্রোল মজুদ আছে ১৫ দিনের, অকটেনের মজুদ ২৮ দিনের এবং ফার্নেস অয়েল মজুদ প্রায় ৯৩ দিনের।

কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে বাজারে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

যুদ্ধ দীর্ঘ হলে অর্থনীতির ঝুঁকি

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ১৫০ ডলার ছাড়াতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আমদানি বিল কয়েক বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে। এতে— বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ যেমন বাড়বে, তেমনি বিদ্যুৎ খাতেও ভর্তুকি বাড়বে। জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বাড়বে, পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। আর সার্বিকভাবে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা তো রয়েছেই।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং বিকল্প জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করা জরুরি।

Visited 16 times, 1 visit(s) today