সম্পাদকীয় || মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির শর্ত: শ্রমিকের হাতে কারখানা ও মালিকদের জিম্মি করার বন্দোবস্ত!

সম্পাদকীয় || মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির শর্ত: শ্রমিকের হাতে কারখানা ও মালিকদের জিম্মি করার বন্দোবস্ত!
শেয়ার করুন

সম্পাদকীয় 

যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ স্বাক্ষরিত Agreement on Reciprocal Trade-এর শ্রম-সংক্রান্ত শর্তগুলো বাংলাদেশের গার্মেন্টস ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পে স্বল্পমূল্যের শ্রম-নির্ভর উৎপাদন মডেলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।

চুক্তির Article 2.9 (Labor) এবং Annex III-এর Article 1.19-এ বিস্তারিত বর্ণিত এই বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতিগুলো আন্তর্জাতিক শ্রম মান (ILO Fundamental Principles and Rights at Work) অনুসরণ করে শ্রমিকদের সংগঠনের স্বাধীনতা, যৌথ দরকষাকষি এবং ধর্মঘটের অধিকারকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধিরা।

তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে—যেখানে অধিকাংশ শ্রমিক স্বল্পশিক্ষিত, দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের প্রতি দায়বদ্ধহীনতা এবং অনেক ক্ষেত্রে বাহ্যিক প্রভাব বা আবেগপ্রবণতায় সহজেই প্রভাবিত হয়—এই পরিবর্তনগুলো উৎপাদনশীলতা, খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক স্থিতিশীলতার উপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

মার্কিন বানিজ্য চুক্তির সাধারণ শর্ত

  • বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার রক্ষা করবে, যার মধ্যে শ্রমিকদের সংগঠনের স্বাধীনতা (freedom of association) এবং যৌথ দরকষাকষির অধিকার (collective bargaining) পূর্ণভাবে সুরক্ষিত করা অন্তর্ভুক্ত।
  • শ্রম আইন সংশোধন করে এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে হবে।
  • শ্রম আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ (enforcement) করতে হবে এবং লঙ্ঘনের জন্য যথেষ্ট শাস্তি নির্ধারণ করতে হবে।
  • শ্রম আইন দুর্বল বা হ্রাস করা যাবে না, বিশেষ করে বাণিজ্য বা বিনিয়োগের সুবিধার জন্য।
  • রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (EPZs) সহ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এই অধিকারগুলো প্রযোজ্য হবে।

বাংলাদেশে শ্রম আইন (BLA) সংশোধনের নির্দিষ্ট দাবি

“মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি”র শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশকে বিদ্যমান “বাংলাদেশ শ্রম আইন” (Bangladesh Labor Act (BLA)) সংশোধন এবং বাস্তবায়নের জন্য কার্যকারি বাধ্যবাধকতা জারি করতে হবে যাতে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অধিকার সুরক্ষিত থাকে। এছাড়াও আরো যে সকল বিধিমালা বাংলাদেশ শ্রম আইনে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে ‘মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি”তেঃ

  • শ্রমিক ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য ২০% কর্মী সমর্থনের ন্যুনতম বাধ্যবাধকতা  কমিয়ে এমন স্তরে নামাতে হবে যাতে শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন বাধাগ্রস্ত না হয়।
  • শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (Director General) যে কোন শ্রমিক ইউনিয়নের নিবন্ধন বাতিল করতে হলে শ্রম আদালতের অনুমোদন নিতে হবে।
  • শ্রমিক ইউনিয়ন সদস্যদের ব্যক্তিগত তথ্যের প্রয়োজনীয়তা সীমিত করতে হবে। শুধু ফ্যাক্টরি আইডি কার্ড নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সনদ গ্রহণযোগ্য করতে হবে।
  • শ্রমিক ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য শুধু একটি সাধারণ সভা এবং সভার মিনিটস জমা দিলেই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে।
  • শ্রমিক ইউনিয়ন বিরোধী (Anti Labor Union) বৈষম্য এবং অন্যায় এর বিপরীতে শ্রম অনুশীলন (Unfair Labor Practices – ULPs)-এর জন্য জরিমানা বাড়াতে হবে যাতে নিয়োগকর্তারা শ্রমিক ইউনিয়ন এর বিরুদ্ধে বৈষম্য করতে নিরুৎসাহিত হয়।
  • কারখানা মালিকদের শ্রমিক/কর্মীদের কালো তালিকাকরণ (Black List)  নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে, এবং ULPs-এর মামলা সরাসরি লেবার কোর্টে দায়ের করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
  • শ্রমিক ধর্মঘটের অধিকারে অযৌক্তিক বিধিনিষেধ অপসারণ করতে হবে। যেমন: প্রতিষ্ঠান চালু হওয়ার পর ধর্মঘটের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ধর্মঘট নিষিদ্ধকরণ ধারা বাতিল করা ও শ্রমিকদের অবৈধ ধর্মঘটের জন্য কঠোর শাস্তি (কারাদণ্ড সহ) অপসারণ করতে হবে।

শ্রমিক ইউনিয়ন নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজতর করা:

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি দাবি করে Bangladesh Labor Act (BLA) সংশোধন করে ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য ২০% কর্মী সমর্থনের ন্যুনতম বাধ্যবাধকতা কমাতে হবে যাতে ইউনিয়ন গঠন বাধাগ্রস্ত না হয়। যাতে ২০% শ্রমিক বা কর্মি ছাড়াই শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করতে পারে। শুধুমাত্র একটি সাধারণ সভা এবং মিনিটস জমা দিলেই নিবন্ধন হবে; ব্যক্তিগত তথ্যের প্রয়োজনীয়তা সীমিত (যেমন: ফ্যাক্টরি আইডি কার্ড, NID বা জন্ম নিবন্ধন)।

নেতিবাচক প্রভাব: স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আনুগত্যের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি লাভ (অতিরিক্ত বেতন, বোনাস) বা বাহ্যিক প্ররোচনার প্রতি প্রবণতা বেশি। ফলে একই কারখানায় একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইউনিয়ন গড়ে উঠতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ সংঘাত, গ্রুপিং এবং অস্থিরতা সৃষ্টি করবে, যা কারখানার উৎপাদন ব্যাহত করবে।

উৎপাদন প্রক্রিয়া—যা লাইন-ভিত্তিক এবং সময়সীমা-নির্ভর—বারবার বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের মতবিরোধে যা ব্যাহত হয়ে পড়বে, খরচ বাড়বে এবং ক্রেতাদের অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।

শ্রমিক ইউনিয়ন বিরোধী শ্রম অনুশীলনের জরিমানা বৃদ্ধি এবং কালো তালিকাভুক্তি নিষিদ্ধকরণ

মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির শর্ত মোতাবেক বাংলাদেশ শ্রম আইনে কারখানা গুলোর উপর জরিমানা বাড়াতে হবে যাতে নিয়োগকর্তারা শ্রমিক ইউনিয়ন বিরোধী বৈষম্য ও অন্যায় এবং কালো তালিকাভুক্তি বা শ্রমিকদের নিষিদ্ধকরণে নিরুৎসাহিত হয়; ব্ল্যাকলিস্টিং বা কালো তালিকাভুক্তিকরণকে অন্যায় শ্রম অনুশীলন (ULP) হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং শ্রমিক/ইউনিয়নকে সরাসরি লেবার কোর্টে মামলা দায়েরের অধিকার দেওয়ার শর্ত দেয়া হয়েছে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিতে।

নেতিবাচক প্রভাব: মালিকদের শ্রমিক নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যাবে। স্বল্পমূল্যের শ্রম-নির্ভর মডেলে, যেখানে উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে কঠোর শৃঙ্খলা ও দ্রুত সমন্বয়ের উপর, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়া পরিবর্তনগুলো শ্রমিকদের অযৌক্তিক দাবি-দাওয়া বাড়াতে পারে। শ্রমিকরা বিচার-বিবেচনাহীন ভাবে অভিযোগ বা অজুহাত সৃষ্টি করে উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে, ফলে খরচ (জরিমানা, আইনি লড়াই) বাড়বে এবং কর্মপরিবেশে অবিশ্বাস ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হবে।

ধর্মঘটের অধিকারে অযৌক্তিক বিধিনিষেধ অপসারণ

কারখানা চালু হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত শ্রমিক ধর্মঘট নিষিদ্ধকরণ ধারা বা শ্রমিকদের অবৈধ ধর্মঘটের জন্য কারাদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি অপসারণ করার কথা বলা হয়েছে “মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি”তে।

নেতিবাচক প্রভাব: গার্মেন্টস সেক্টরে যেখানে প্রতিদিনের কঠোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা থাকে। গার্মেন্টস বা কারখানাগুলোতে দেখা যায় ছোটখাটো অসন্তোষ (বা বাহ্যিক উস্কানি) সহজেই ছড়িয়ে পড়ে, এবং খুব সহজেই ধর্মঘটের অজুহাত সৃষ্টি করে ফেলে। শ্রমিকদের ধর্মঘট করার এই সহজতর অধিকার, উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বারবার বাধাগ্রস্থ করতে পারে।

এতে উৎপাদনশীলতা ৩০-৫০% কমতে পারে, এতে ডেলিভারি বিলম্ব হবে এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্যতা ক্ষুন্ন হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের স্বল্পমূল্যের শ্রমের সুবিধা—যা কম খরচে দ্রুত উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল—এভাবে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে।

এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (EPZ)- শ্রম অধিকারের সম্প্রসারণ

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি তে এই শর্ত যুক্ত করা হয়েছে যে, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হওয়ার ২ বছরের মধ্যে EPZ-কে পরিবর্তিত “বাংলাদেশ শ্রম আইন”-এর আওতায় আনতে হবে বা EPZ শ্রম আইন এর ব্যাপক সংস্কার করে এক্সপোর্ট প্রোসেসিং জোন (Export Processing Zone)-এ স্বাধীন শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন ও শ্রমিকদের ধর্মঘটের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

EPZ শ্রম আইনে বাংলাদেশ শ্রম আইন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধন করতে হবে যাতে ধর্মঘটের অধিকারে অযৌক্তিক বিধিনিষেধ না থাকে (যেমন: প্রতিষ্ঠান চালু হওয়ার পর ধর্মঘট নিষিদ্ধ বা কারাদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি)।

নেতিবাচক প্রভাব: EPZ-গুলো এতদিন তুলনামূলক শান্ত ও উচ্চ উৎপাদনশীল ছিল কারণ এক্সপোর্ট প্রোসেসিং জোণ এলাকায় শ্রমিক ইউনিয়ন নিষিদ্ধ ছিল। এখন মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী স্বাধীন শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শ্রমিক অস্থিরতা সৃষ্টির ভয়ে সরে যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিকরা সহজে প্রভাবিত হওয়ার কারণে ছোটখাট ইস্যুতে বড় ধর্মঘট হয়ে উৎপাদন থেমে যাবে, যা EPZ-এর প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নষ্ট করবে।

অন্যান্য শর্ত:

গার্মেন্টস শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি মামলা (বিশেষ করে ২০২৩ সালের মজুরি আন্দোলন-সংক্রান্ত) যথাযথভাবে নিষ্পত্তি বা প্রত্যাহার করতে হবে। শ্রম আইন প্রয়োগের জন্য বাজেট বাড়ানো, আরও লেবার ইন্সপেক্টর নিয়োগ, অপ্রত্যাশিত পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া ইত্যাদি।

নেতিবাচক প্রভাব: এগুলো শ্রমিকদের আস্থা বাড়ালেও, অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। বাহ্যিক শক্তি, যেমন রাজনৈতিক গ্রুপ, প্রতিযোগী, স্থানীয় অধিবাসী, শ্রমিকদের ব্যবহার করে কারখানা অচল করে দিতে পারে, যা উৎপাদন খরচ বাড়াবে এবং অনেক কারখানা বন্ধ বা স্থানান্তরের দিকে নিয়ে যাবে।   এই চুক্তি পূর্বের GSP সাসপেনশন (২০১৩ সাল থেকে) বা TICFA-এর আলোচনার চেয়ে আরও বিস্তারিত ও বাধ্যতামূলক।

এটি বাংলাদেশের শ্রম আইন সংস্কারের জন্য সরাসরি প্রভাব ফেলবে, বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরে। মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির শ্রম শর্তগুলো ট্যারিফ সুবিধা (১৯% রেট) দিয়ে স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি দিলেও, বাংলাদেশের স্বল্পমূল্যের শ্রম-ভিত্তিক উৎপাদন মডেলকে দীর্ঘমেয়াদে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এতে উৎপাদনশীলতা হ্রাস, খরচ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ঝুঁকি বাড়বে—যা লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জীবিকা ও অর্থনীতির জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।

Visited 19 times, 1 visit(s) today