নিজস্ব সংবাদদাতা
চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান কর্মবিরতি এখন আর শুধু একটি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা নয়; এটি দ্রুত জাতীয় সরবরাহব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দেওয়া এক অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় আমদানি–রপ্তানি প্রবাহে ধীরগতি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব শিল্প, ব্যবসা ও ভোক্তা—সবখানেই পড়ার আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।
কন্টেইনার ওঠানামা ও খালাস কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় বন্দরে পণ্যজট বাড়ছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য ছাড় করা যাচ্ছে না, ফলে আমদানিকারকদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি স্টোরেজ চার্জ। জাহাজ নির্ধারিত সময়ের বেশি অপেক্ষা করায় শিপিং লাইনগুলোকে দিতে হচ্ছে ডেমারেজ। অন্যদিকে, বন্দরের ভেতরে ও আশপাশে আটকে থাকা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের জন্য পরিবহন মালিকদের গুনতে হচ্ছে দৈনিক জরিমানা।
এই পুরো ব্যয়চক্র শেষ পর্যন্ত বাজারে পণ্যের দামের ওপর চাপ তৈরি করবে—এমন আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।
বিশেষ করে রমজান সামনে থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হলে মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি আরও বাড়বে। ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকেরা বলছেন, বন্দরে এক দিনের দেরি মানেই প্রতিটি কন্টেইনারে অতিরিক্ত খরচ, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হয়।
রপ্তানিখাতও ঝুঁকিতে পড়েছে। তৈরি পোশাকসহ সময়নির্ভর রপ্তানি চালান নির্ধারিত জাহাজ ধরতে না পারলে ক্রেতারা অর্ডার বাতিল বা মূল্যছাড় দাবি করতে পারেন। বিকল্প হিসেবে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হলে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা অনেক রপ্তানিকারকের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন।
ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোতেও এর প্রভাব পড়েছে। রপ্তানি ও আমদানি—দুই ক্ষেত্রেই ডেলিভারি কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে, ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকস চেইনেও চাপ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতির সূত্রপাত নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) লিজ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত ঘিরে। শ্রমিক সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, দেশের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল বিদেশি ব্যবস্থাপনার হাতে তুলে দেওয়া অযৌক্তিক। এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবিতে তারা টানা কর্মসূচি দিচ্ছে এবং দাবি আদায় না হলে আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, আংশিক বিঘ্ন থাকলেও কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ নয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের চিত্রে টার্মিনাল কার্যক্রম অস্বাভাবিকভাবে ধীর—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে বদলি নিয়ে উত্তেজনায়। আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে, যা শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে। শ্রমিক নেতারা একে ‘শাস্তিমূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে দেখছেন এবং সংলাপ ছাড়া সমাধান সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহল বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন মানে পুরো অর্থনীতিতে ধাক্কা। কারণ দেশের অধিকাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য এই বন্দরনির্ভর। কয়েক দিনের জটও সরবরাহব্যবস্থায় ঢেউ তুলতে পারে, যার প্রতিফলন দেখা যায় বাজারদরে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে দ্রুত সংলাপ ও নীতিগত স্বচ্ছতা ছাড়া সংকট নিরসন কঠিন। নয়তো বন্দরের অচলাবস্থা খুব শিগগিরই জাতীয় অর্থনীতির ওপর আরও বড় চাপ হিসেবে ফিরে আসতে পারে।
